বুলডোজার আসে। দোকান ভাঙে। মালামাল জব্দ হয়। জরিমানা হয়। ফুটপাথ খালি হয়ে যায়। কিন্তু সেই দৃশ্য টেকে না। কয়েক দিন পরই ফিরে আসে দোকান, ভ্যান, চেয়ার-টেবিল, পণ্যসামগ্রী। কোথাও আবার গাড়ি-মোটরসাইকেল। পথচারীর জায়গা দখল হয়ে গেলে মানুষ নেমে যায় সড়কে। ঝুঁকি বাড়ে, যানজট বাড়ে। এরপর আবার অভিযান। ঢাকার ফুটপাথ দখলের গল্প যেন একই জায়গায় ঘুরপাক খাচ্ছে। বছরের পর বছর উচ্ছেদ চলছে। তবু দখল ফিরছে। প্রশ্ন এখন তাই একটাই—দখল উচ্ছেদ করা হচ্ছে, নাকি শুধু দখলদার বদলাচ্ছে?
- ফুটপাথ দখলমুক্ত করতে অভিযান, খরচ কোটি টাকা
- জরিমানা-মামলা-গ্রেপ্তারেও বন্ধ হচ্ছে না পুনর্দখল
- কয়েক দিন পরই আগের চিত্র—পেছনে জীবিকা, চাঁদাবাজি ও প্রভাবের জট
পাঁচ দিনের অভিযান, ফের দখল
গত ১ থেকে ৫ এপ্রিল রাজধানীর আটটি ট্রাফিক বিভাগে সমন্বিত অভিযান চালায় ঢাকা মহানগর পুলিশ ও সিটি করপোরেশন। মামলা হয়েছে, জরিমানা হয়েছে, গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাথ আবার দখলে যায়। গত ৩০ সেপ্টেম্বর মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর ও হোপ মার্কেটসংলগ্ন এলাকায় উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে হকার ও পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। অর্থাৎ অভিযান যতটা নিয়মিত, পুনর্দখলও ততটাই নিয়মিত। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের হিসাবে, গত জুন থেকে ৩৫১টি অভিযানে প্রায় ১৬৬ কিলোমিটার ফুটপাথ দখলমুক্ত করা হয়েছে। এত অভিযান, এত ব্যয়, এত জনবল—তার পরও যদি একই জায়গায় আবার দোকান বসে, তাহলে প্রশ্ন ওঠে ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা নিয়ে।
ফুটপাথের নিচে টাকার খেলা
রাজধানীতে প্রায় আড়াই লাখ হকার রয়েছে বলে দাবি হকার সংগঠনগুলোর। তাদের হিসাবে, জায়গা ও ব্যবসার ধরন অনুযায়ী ১০০ থেকে ১২০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা নেওয়া হয়। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের ২০১৬ সালের গবেষণায় ঢাকার দুই সিটির ফুটপাথ থেকে বছরে ১ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা চাঁদা আদায়ের তথ্য উঠে আসে।
হকার সংগঠনগুলোর দাবি, বর্তমানে তা ৩ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। চাঁদা আদায়ের সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা-কর্মী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্যের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। কিন্তু ফুটপাথ দখলকে ঘিরে বড় অর্থনৈতিক স্বার্থ থাকলে শুধু দোকান উচ্ছেদ করে সমস্যার শিকড় কাটা সম্ভব নয়।
হকারের বাইরে আরও দখলদার
ফুটপাথ দখলের দায় শুধু হকারের নয়। রেস্তোরাঁ, শোরুম, ওয়ার্কশপ ও স্থায়ী দোকানও অনেক জায়গায় ফুটপাথ গিলে নিয়েছে। কোথাও চেয়ার-টেবিল। কোথাও গ্রিল-ওভেন। কোথাও পণ্যসামগ্রী। কোথাও নির্মাণসামগ্রী। আর বহু ফুটপাথ এখন গাড়ি ও মোটরসাইকেলের পার্কিং। ফলে একজন হকারকে সরিয়ে দিলেই ফুটপাথ পথচারীর হয়ে যায় না। দখলের ধরন বদলায়, দখল থেকে যায়।
উচ্ছেদে হকার যায়, জীবিকা যায়
হকারদের বক্তব্যও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। অনেকের প্রধান আয়ের উৎস ফুটপাথের ব্যবসা। স্থায়ী দোকানের ভাড়া দেওয়ার মতো পুঁজি নেই। ফুটপাথে অল্প পুঁজিতে ব্যবসা করা যায়। ক্রেতাও পাওয়া যায় হাতের কাছে। তাই বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া উচ্ছেদ করলে তারা আবার ফিরবেন—এটাই বাস্তবতা। কিন্তু সেই বাস্তবতা ফুটপাথ দখলের বৈধতা দেয় না। সমাধান হতে পারে ফুটপাথের বাইরে পরিকল্পিত বিকল্প বাজার। সেখানে শুধু জায়গা দিলেই হবে না। ক্রেতা কোথায়, নিরাপত্তা কী, বিদ্যুৎ-পানি আছে কি না, বর্জ্য যাবে কোথায়—এসবও নিশ্চিত করতে হবে। না হলে পুনর্বাসন হবে কাগজে, ব্যবসা থাকবে ফুটপাথেই।
১.৫ মিটার জায়গা কি বাস্তবে থাকবে?
ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আবদুস সালাম জানিয়েছেন, পথচারীর চলাচলের জন্য ফুটপাথে ন্যূনতম ১.৫ মিটার জায়গা উন্মুক্ত রাখা বাধ্যতামূলক। হকারদের জীবিকা বন্ধ করার লক্ষ্য নেই। তবে মূল সড়কে হকার বসতে দেওয়া হবে না। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আকতার মাহমুদের বক্তব্যও স্পষ্ট—হকার ব্যবস্থাপনা আর ফুটপাথ দখল এক বিষয় নয়। ফুটপাথের মূল কাজ পথচারী চলাচল নিশ্চিত করা। এখন প্রশ্ন, এই নীতি বাস্তবে মানানো হবে কীভাবে?
দরকার দখলের মানচিত্র
প্রথম কাজ হওয়া উচিত রাজধানীর প্রতিটি ফুটপাথের ডিজিটাল ম্যাপ তৈরি। কোথায় ফুটপাথ কত চওড়া, পথচারীর জন্য ন্যূনতম কতটুকু জায়গা অবশ্যই খোলা থাকবে—তা নির্ধারণ করতে হবে। এরপর তৈরি করতে হবে প্রকৃত হকারের তালিকা। একই ব্যক্তি একাধিক জায়গায় ব্যবসা করছেন কি না, অন্যের নামে জায়গা নিচ্ছেন কি না—তা যাচাই করতে হবে। পাশাপাশি স্থায়ী দোকান, রেস্তোরাঁ, পার্কিং ও নির্মাণসামগ্রীর দখলও আলাদাভাবে চিহ্নিত করতে হবে। সবচেয়ে জরুরি উচ্ছেদের পর নজরদারি। কারণ অভিযান শেষ হওয়ার পরই শুরু হয় পুনর্দখনের প্রতিযোগিতা।
আসল সমস্যা বুলডোজারে নয়
আইপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেছেন, শুধু উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। ফুটপাথ দখলের পেছনে থাকা প্রভাবশালীদের চিহ্নিত করতে হবে এবং হকারদের বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে। অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক উচ্ছেদ অভিযান ঘিরে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় মাঠপর্যায়ে পুলিশের সক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতার প্রশ্ন তুলেছেন। ঢাকার ফুটপাথের সংকট তাই শুধু হকার উচ্ছেদের নয়। এটি জীবিকা, নগর পরিকল্পনা, চাঁদাবাজি, ব্যবসায়িক স্বার্থ, পার্কিং ও প্রশাসনিক জবাবদিহির সংকট।
এমএইচ/এমকে