দেশজুড়ে

ব্যবসায়ীর পরামর্শে কীটনাশক, বাড়ছে খরচ কমছে ফলন

নড়াইলে ফসলের রোগবালাই ও কীটপতঙ্গ দমনে কৃষি কর্মকর্তার পরিবর্তে স্থানীয় কীটনাশক ব্যবসায়ী ও কোম্পানির প্রতিনিধিদের পরামর্শ নিচ্ছেন অনেক কৃষক। রোগ বা পোকার ধরন না জেনেই তাদের পরামর্শ অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক প্রয়োগ করছেন তারা। এতে বাড়ছে উৎপাদন খরচ, আবার অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত ফলনও মিলছে না।

নড়াইল সদর উপজেলার বিছালী ইউনিয়নের বিছালী গ্রামের কৃষক জিয়াউর রহমান এ বছর দুই বিঘা জমিতে শসার চাষ করেছেন। স্থানীয় দোকান থেকে কীটনাশক কিনে ক্ষেতে প্রয়োগ করলেও কাঙ্ক্ষিত ফলন পাননি তিনি। জিয়াউরের দাবি, আগে যে ওষুধে পোকামাকড় দমন হতো, এখন একই ওষুধে তেমন কাজ হচ্ছে না। ফলে খরচ বাড়লেও ফলন কমেছে।

তিনি জানান, আগে দুই বিঘা জমি থেকে ১৫ থেকে ১৬ মণ শসা পাওয়া গেলেও এবার দুই মণও তুলতে পারেননি। তার মতে, ফলন কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ কীটনাশকের কার্যকারিতা না থাকা।

সদর উপজেলার কলোড়া ইউনিয়নের আগদিয়া গ্রামের কৃষক ইমন খন্দকারও ফসলে পোকামাকড়ের আক্রমণ দেখা দিলে স্থানীয় কীটনাশকের দোকানে যান। তিনি সমস্যার কথা দোকানিকে জানান এবং তার পরামর্শ অনুযায়ী কোন কীটনাশক কতটুকু ও কতবার ব্যবহার করবেন, তা ঠিক করেন।

ইমন বলেন, কৃষি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে কীটনাশক প্রয়োগের বিষয়ে তেমন পরামর্শ না পাওয়ায় তিনি স্থানীয় দোকানিদের পরামর্শেই ওষুধ ব্যবহার করেন।

মঙ্গলবার সকালে নড়াইল জেলা শহরের রূপগঞ্জ এলাকার একটি কীটনাশকের দোকানে গিয়ে দেখা যায়, কৃষকদের ভিড়। কেউ বীজ, কেউ কীটনাশক কিনছেন। কৃষকরা জমির রোগবালাই ও পোকার আক্রমণের কথা দোকানিকে জানাচ্ছেন এবং দোকানি সে অনুযায়ী কীটনাশক দিচ্ছেন। সেখানে কীটনাশক কোম্পানির দুই প্রতিনিধিকেও অবস্থান করতে দেখা যায়।

দোকানটির মালিক ছোটন মোল্যা বলেন, কৃষি অফিস থেকে তাদের কীটনাশক বিক্রি ও ব্যবহারবিধি বিষয়ে বছরে দুই-তিনবার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কোম্পানির প্রতিনিধিরাও বিভিন্ন পণ্যের বিষয়ে তাদের ধারণা দেন। অনেক কৃষক নিজেরাই নির্দিষ্ট ওষুধ চেয়ে নেন।

বিছালী ইউনিয়নের আরেক কীটনাশক ব্যবসায়ী জানান, কোম্পানির প্রতিনিধিরা তাদের কাছে বিভিন্ন ওষুধ সরবরাহ করেন। কৃষকরা চাইলে তারা সেগুলো বিক্রি করেন এবং অনেক সময় কোম্পানির প্রতিনিধিদের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ দেন।

লারসেল কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ প্রাইভেট লিমিটেডের আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক মো. মিশন হোসেন বলেন, তাদের কীটনাশক পাইকারি সরবরাহকারীর মাধ্যমে কৃষকের কাছে পৌঁছে। কোম্পানির প্রতিনিধিরাও কৃষকদের বিভিন্ন পরামর্শ দেন। এ ছাড়া কৃষকদের নিয়ে সভা-সমাবেশের মাধ্যমে কীটনাশক ব্যবহারের বিষয়ে ধারণা দেওয়া হয়।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নড়াইলে ৩৯ জন কীটনাশক পাইকারি ব্যবসায়ী ও ৪৩২ জন খুচরা ডিলার রয়েছেন। এর মধ্যে নড়াইল সদর উপজেলায় ২৭ জন পাইকারি ও ১৯৫ জন খুচরা ডিলার, লোহাগড়ায় তিনজন পাইকারি ও ১০০ জন খুচরা ডিলার এবং কালিয়ায় নয়জন পাইকারি ও ১৩৭ জন খুচরা ডিলার রয়েছেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্ভিদ সংরক্ষণ) সৌতম কুমার শীল বলেন, নড়াইলে বিপুলসংখ্যক কোম্পানি কীটনাশক বাজারজাত করছে। ভেজাল কীটনাশক প্রতিরোধে কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হয় এবং বিভিন্ন কীটনাশকের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়।

তিনি বলেন, কৃষকের ভুল হচ্ছে—মাঠপর্যায়ে থাকা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে পরামর্শ না নিয়ে অনেকেই ব্যবসায়ী ও কোম্পানির মাঠপর্যায়ের প্রতিনিধিদের পরামর্শ নেন। তাদের কথায় কীটনাশক ব্যবহার করায় অনেক সময় তা নির্দিষ্ট পোকার বিরুদ্ধে কার্যকর হয় না। কৃষকদের সচেতন করতে মাঠপর্যায়ে কাজ চলছে।

সন্ধানী বার্তা/ডিএইচ/এমএসআইপি 


সম্পর্কিত খবর