দেশজুড়ে

কুয়াকাটার জিরো পয়েন্টে সমুদ্রের টানে পর্যটকের ঢল

দেশের দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র পটুয়াখালীর কুয়াকাটা। প্রায় ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সমুদ্রসৈকতে পর্যটকদের বড় অংশের ভ্রমণ শুরু হয় জিরো পয়েন্ট থেকে। সমুদ্রের বিশালতা, ঢেউয়ের ছন্দ, বালুচর, সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের দৃশ্য দেখতে প্রতিদিনই এখানে ভিড় করেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পর্যটক-দর্শনার্থীরা।

কুয়াকাটা শুধু জিরো পয়েন্টকেন্দ্রিক নয়। এই সৈকতকে ঘিরে রয়েছে লেম্বুরবন, ঝাউবন, গঙ্গামতি, কাউয়ারচর ও মিশ্রীপাড়া বৌদ্ধবিহারসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক পর্যটন স্পট। ফলে জিরো পয়েন্ট অনেকটা কুয়াকাটার পর্যটনের প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করছে।

সমুদ্রের প্রথম দর্শন

কুয়াকাটায় পৌঁছানোর পর সমুদ্রের গর্জন আর নীল জলরাশি পর্যটকদের টেনে নেয় সৈকতের দিকে। কেউ ঢেউয়ের পানিতে নেমে আনন্দ করেন, কেউ বালুচরে বসে সমুদ্র উপভোগ করেন। আবার অনেকে পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলে স্মৃতি ধরে রাখেন।

বিশেষ করে শুক্র ও শনিবারসহ ছুটির দিনে জিরো পয়েন্টে পর্যটকের ভিড় বেড়ে যায়। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখতে ভোর ও বিকেলে সৈকতে জমে ওঠে আলাদা আয়োজন।

পর্যটনের সঙ্গে জীবিকা

জিরো পয়েন্টের পর্যটনকে ঘিরে গড়ে উঠেছে স্থানীয় অর্থনীতির নানা কর্মকাণ্ড। হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, খাবারের দোকান, শামুক-ঝিনুক ও বিভিন্ন স্থানীয় পণ্যের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বহু মানুষ।

রেস্তোরাঁ মালিক আলমগীর হোসেন বলেন, ছুটির দিন ও শীত মৌসুমে পর্যটক বাড়লে বেচাকেনাও বেড়ে যায়। একই কথা জানান শামুক-ঝিনুক ব্যবসায়ী মো. রাকিব হাসান। পর্যটকের সংখ্যা বাড়লে নতুন ও আকর্ষণীয় পণ্য রাখার সুযোগও তৈরি হয় বলে জানান তিনি।

সৈকত-লাগোয়া হোটেল সিকুইনের মালিক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন হাওলাদার বলেন, পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর কুয়াকাটায় পর্যটক বেড়েছে। আগের মতো লোকসানও এখন হয় না।

কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুল মোতালেব শরীফ জানান, কুয়াকাটায় দুই শতাধিক আবাসিক হোটেল রয়েছে। সাপ্তাহিক ছুটিতে অনেক হোটেলের কক্ষ পূর্ণ হয়ে যায়। শীত মৌসুমে পর্যটকের চাপ আরও বেড়ে যাওয়ায় থাকার জায়গার সংকট তৈরি হয়।

নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতার চ্যালেঞ্জ

পর্যটক বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জিরো পয়েন্টে বাড়ছে মানুষের চাপ। ছুটির দিনে যানবাহনের চাপ, অতিরিক্ত ভিড় ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতি সৈকতের পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। প্লাস্টিক ও খাবারের প্যাকেটসহ বিভিন্ন বর্জ্য সৈকতের সৌন্দর্য নষ্ট করছে।

কুয়াকাটা পৌর প্রশাসক ও কলাপাড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইয়াছিন ছাদেক বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তায় ট্যুরিস্ট পুলিশের পাশাপাশি মহিপুর থানা পুলিশ ও নৌপুলিশ কাজ করছে। খাবারে অনিয়ম, অতিরিক্ত দাম এবং পর্যটক হয়রানি বন্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে।

সমুদ্রে গোসলের সময়ও পর্যটকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। জোয়ার-ভাটা, পানির গভীরতা ও আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই সৈকতে সতর্কবার্তা, লাইফগার্ড, নজরদারি ও জরুরি সহায়তার ব্যবস্থা কার্যকর রাখা জরুরি।

পরিকল্পিত উন্নয়নের প্রয়োজন

জিরো পয়েন্ট থেকে পর্যটকেরা কুয়াকাটার অন্যান্য দর্শনীয় স্থানে ছড়িয়ে পড়েন। তাই এ এলাকার উন্নয়নকে শুধু একটি সৈকতের উন্নয়ন হিসেবে না দেখে পুরো পর্যটন ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।

পর্যটকদের জন্য পরিচ্ছন্ন হাঁটার জায়গা, বসার ব্যবস্থা, নির্দিষ্ট খাবারের স্থান, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ গোসলের এলাকা, তথ্যকেন্দ্র ও জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা গেলে কুয়াকাটার পর্যটন আরও বিকশিত হতে পারে। তবে উন্নয়নের নামে সৈকতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিবেশ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও নজর দিতে হবে।

কুয়াকাটার জিরো পয়েন্ট তাই শুধু সমুদ্র দেখার জায়গা নয়; এটি পর্যটকদের আনন্দ, স্মৃতি ও স্থানীয় মানুষের জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করা গেলে জিরো পয়েন্টকে ঘিরে পুরো কুয়াকাটার পর্যটনশিল্প আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

সন্ধানী বার্তা/এমএসআইপি 


সম্পর্কিত খবর