বিনোদন

কেন থেমে গিয়েছিল ভাগ্যশ্রীর ক্যারিয়ার?

বলিউডে অনেক অভিনেত্রীর গল্প শুরু হয় স্বপ্নের মতো—প্রথম ছবিতেই সাফল্য, দর্শকের ভালোবাসা আর একের পর এক বড় ছবির প্রস্তাব। কিন্তু সেই সাফল্যের পথ সবসময় দীর্ঘ হয় না। কখনো কখনো ব্যক্তিগত জীবনের কোনো সিদ্ধান্তই বদলে দেয় পুরো ক্যারিয়ারের গতিপথ। অভিনেত্রী ভাগ্যশ্রীর জীবনও যেন তেমনই এক গল্প।

সালমান খানের বিপরীতে ‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’ ছবিতে অভিনয় করেই রাতারাতি তারকা বনে গিয়েছিলেন ভাগ্যশ্রী। ১৯৮৯ সালে মুক্তি পাওয়া ছবিটি বক্স অফিসে বড় সাফল্য পাওয়ার পাশাপাশি ‘প্রেম-সুমন’ জুটিকে দর্শকের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় করে তোলে। স্বাভাবিকভাবেই এরপর ভাগ্যশ্রীর সামনে খুলে যায় বলিউডের বড় বড় দরজা।

কিন্তু যে সময় ক্যারিয়ারকে আরও উঁচুতে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল, ঠিক তখনই জীবনের অন্য এক অধ্যায়কে অগ্রাধিকার দেন তিনি। প্রেম, বিয়ে, সংসার ও মাতৃত্বের সিদ্ধান্তে বদলে যায় তার অভিনয়জীবনের গতিপথ।

ছবি>সংগৃহীত

অভিনয়ে আসার পরিকল্পনাই ছিল না

মহারাষ্ট্রের সাংলির পট্টবর্ধন রাজপরিবারে জন্ম ভাগ্যশ্রীর। ছোটবেলা থেকেই তিনি বেড়ে উঠেছেন বেশ নিয়ন্ত্রিত ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে। অভিনয় যে একদিন তার পেশা হবে, এমন পরিকল্পনা কখনোই ছিল না। বরং পড়াশোনা শেষ করে বিদেশে যাওয়ার ইচ্ছাই ছিল তার। কিন্তু ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায় হঠাৎ করেই।

টেলিভিশন সিরিয়াল ‘কাচ্ছি ধূপ’-এর মাধ্যমে ক্যামেরার সামনে অভিনয়ের শুরু। ২০২৬ সালের এক সাক্ষাৎকারে ভাগ্যশ্রী জানান, সিরিয়ালের মূল অভিনেত্রী শেষ মুহূর্তে সরে যাওয়ার পর পরিচালক-অভিনেতা অমল পালেকর তাকে অভিনয়ের সুযোগ দেন। সেই সুযোগ থেকেই শুরু হয় তার অভিনয়যাত্রা।

‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’ বদলে দিল সবকিছু

টেলিভিশনের পর বড় পর্দায় সুযোগ আসে সূরজ বরজাতিয়ার ‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’ ছবিতে। সালমান খানের বিপরীতে সুমনের চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের হৃদয়ে জায়গা করে নেন ভাগ্যশ্রী। ছবির প্রেমের গল্প, গান এবং সালমান-ভাগ্যশ্রীর পর্দার রসায়ন তখন ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। ভাগ্যশ্রীও হয়ে ওঠেন বলিউডের আলোচিত নতুন মুখ।

ছবিটির অভাবনীয় সাফল্যের পর তার কাছে একের পর এক বড় ছবির প্রস্তাব আসতে থাকে। ভাগ্যশ্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, সে সময় বড় পরিসরে নির্মিত কিংবা পরবর্তী সময়ে সফল হওয়া অনেক ছবির প্রস্তাবই প্রথমে তার কাছে এসেছিল।

অর্থাৎ বলিউডে নিজের অবস্থান শক্ত করার জন্য তার সামনে তখন ছিল বিশাল সুযোগ।

ছবি>সংগৃহীত

ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দিল প্রেম

কিন্তু ঠিক এই সময়েই ব্যক্তিগত জীবনের সিদ্ধান্তকে সামনে নিয়ে আসেন ভাগ্যশ্রী। স্কুলজীবন থেকেই হিমালয় দাসানির সঙ্গে তার পরিচয় ছিল। সময়ের সঙ্গে সেই সম্পর্ক প্রেমে রূপ নেয়। তবে পরিবারের পক্ষ থেকে শুরুতে এই সম্পর্ক মেনে নেওয়া হয়নি। পরিবারের আপত্তি সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত হিমালয়কেই বিয়ে করেন ভাগ্যশ্রী।

বিয়ের সময় বয়সও ছিল খুব কম। ‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’র সাফল্যের পর যে সময়ে একজন নতুন অভিনেত্রীর ক্যারিয়ারে একের পর এক বড় সুযোগ আসার কথা, ঠিক তখনই তিনি সংসার ও পরিবারের দিকে মনোযোগ দেন।

একের পর এক ছবি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন

ভাগ্যশ্রী বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, সেই সময়কার সামাজিক বাস্তবতায় একই সঙ্গে সংসার, সন্তান এবং অভিনয়জীবন সামলানো তার কাছে কঠিন মনে হয়েছিল। ফলে অনেক ছবির প্রস্তাব পেয়েও তিনি সেগুলো গ্রহণ করেননি। তারকা হওয়ার পরও কেন তিনি নিজেকে বলিউড থেকে সরিয়ে নিলেন—এ প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে ভাগ্যশ্রী বারবার নিজের পারিবারিক অগ্রাধিকারের কথাই বলেছেন। তার কাছে তখন ক্যারিয়ারের চেয়ে প্রেম, বিয়ে এবং পরিবার বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। আর এই সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত তার অভিনয়জীবনের গতি অনেকটাই থামিয়ে দেয়।

ছবি>সংগৃহীত

পর্দায় ঘনিষ্ঠ দৃশ্য নিয়েও ছিল বিশেষ শর্ত

বিয়ের পর ভাগ্যশ্রীর ক্যারিয়ারে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত প্রভাব ফেলে। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, পর্দায় অন্য কোনো নায়কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ দৃশ্যে অভিনয় করবেন না। এমন দৃশ্য থাকলে তার বিপরীতে স্বামী হিমালয় দাসানিকেই রাখতে হবে। এরপর ‘কাইদ মে হ্যায় বুলবুল’, ‘পায়েল’ এবং ‘ত্যাগী’-এর মতো ছবিতে দুজনকে একসঙ্গে দেখা যায়। কিন্তু এসব ছবি ‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’র মতো সাফল্য পায়নি।

পরে ভাগ্যশ্রী নিজেই স্বীকার করেছেন, সেই সময় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ক্যারিয়ারে এর কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, তা তিনি খুব একটা ভেবে দেখেননি।

‘ফোন থামত না’, তবু পরিবারকেই বেছে নিয়েছিলেন

‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’র পর ভাগ্যশ্রীর জনপ্রিয়তা কতটা ছিল, তা বোঝাতে গিয়ে তিনি এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, কাজের প্রস্তাবে তার ফোন প্রায় থামতই না।

কিন্তু সেই জনপ্রিয়তার সময়টাকে ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ হিসেবে দেখার পরিবর্তে তিনি পরিবারকে সময় দেওয়াকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

দীর্ঘ বিরতির পর যখন আবার দর্শকদের সামনে ফিরতে শুরু করেন, তখনই নাকি তিনি উপলব্ধি করেন—প্রথম ছবির সাফল্য কতটা বড় ছিল এবং সেই সময় তার সামনে কতটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল।

অভিনয় থেকে পুরোপুরি হারিয়ে যাননি

তবে ভাগ্যশ্রীর গল্প পুরোপুরি বিরতির নয়। দীর্ঘ সময় মূলধারার ছবির বাইরে থাকলেও তিনি অভিনয় থেকে একেবারে সরে যাননি।

পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ভাষার সিনেমায় কাজ করেছেন। হিন্দি ছবিতেও ধীরে ধীরে ফিরে আসেন। ‘থালাইভি’-সহ বেশ কিছু ছবিতে দেখা গেছে তাকে।

তার সন্তানরাও পরবর্তী সময়ে তাকে আবার অভিনয়ে ফিরতে উৎসাহ দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন অভিনেত্রী।

২০২৬ সালে রিতেশ দেশমুখের ‘রাজা শিবাজি’ ছবিতে জিজাবাইয়ের চরিত্রে অভিনয় করেও নতুন করে আলোচনায় আসেন তিনি।

ছবি>সংগৃহীত

অতীতের সিদ্ধান্ত নিয়ে নেই অনুশোচনা

ভাগ্যশ্রীর ক্যারিয়ারের গল্প তাই শুধু একজন অভিনেত্রীর সাফল্য কিংবা ব্যর্থতার গল্প নয়। এটি একই সঙ্গে ব্যক্তিগত পছন্দ, পারিবারিক অগ্রাধিকার এবং পেশাগত সম্ভাবনার গল্প। প্রথম ছবিতেই রাতারাতি তারকা হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। সামনে ছিল অসংখ্য বড় সুযোগ। কিন্তু সেই সময় ক্যারিয়ারের বদলে তিনি বেছে নিয়েছিলেন ভালোবাসা, বিয়ে, সংসার ও মাতৃত্বকে। সময়ের বিচারে সেই সিদ্ধান্ত তার অভিনয়জীবনের গতিপথ বদলে দিয়েছে—এ কথা বলাই যায়। তবে ভাগ্যশ্রী নিজে অতীতের সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে অনুতপ্ত নন।

ছবি>সংগৃহীত

বরং তার কাছে জীবনের সেই সময়ের অগ্রাধিকারগুলোই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রাজপরিবারে বেড়ে ওঠা থেকে হঠাৎ অভিনয়ে আসা, প্রথম ছবিতেই তুমুল সাফল্য, তারপর প্রেম-বিয়ে-মাতৃত্বের কারণে দীর্ঘ বিরতি—সব মিলিয়ে ভাগ্যশ্রীর বলিউডযাত্রা নিঃসন্দেহে অন্যরকম।

তার ক্যারিয়ার হয়তো অন্য পথে এগোতে পারত। কিন্তু ভাগ্যশ্রী যে পথ বেছে নিয়েছিলেন, সেটিই শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠেছে তার জীবনের গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, টাইমস অব ইন্ডিয়া, এনডিটিভি

সন্ধানী বার্তা/জেএন


সম্পর্কিত খবর