শ্রীলঙ্কার উত্তরাঞ্চলের জাফনার চেম্মানি এলাকায় একটি গণকবর থেকে শিশু ও নবজাতকসহ ৫৭২ জনের কঙ্কালাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে। দেশটিতে এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত গণকবরগুলোর মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড় বলে মনে করা হচ্ছে।
গত ফেব্রুয়ারিতে শ্মশান সম্প্রসারণের জন্য খননকাজের সময় শ্রমিকরা প্রথম মানবদেহের অবশিষ্টাংশ দেখতে পান। পরে কয়েক ধাপে প্রত্নতাত্ত্বিক ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা খনন চালিয়ে এসব কঙ্কালাবশেষ উদ্ধার করেন। সেখানে চুড়ি, স্কুলব্যাগ ও দুধের বোতলের মতো ব্যক্তিগত সামগ্রীও পাওয়া গেছে।
চেম্মানি এলাকায় শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধের সময় গণকবর থাকার অভিযোগ বহুদিনের। নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজন ও মানবাধিকারকর্মীদের ধারণা, উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষের কিছু যুদ্ধের সময় নিহত বেসামরিক মানুষের হতে পারে। তবে এখনো এসব দেহাবশেষের পরিচয় ও মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
দেহাবশেষগুলো বর্তমানে জাফনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেনসিক বিভাগের হেফাজতে রয়েছে। পরিচয় শনাক্ত করতে ডিএনএ পরীক্ষা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে কিছু নমুনা বিদেশেও পাঠানো হতে পারে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের কাছ থেকেও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
১৯৮৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত চলা শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধে প্রায় এক লাখ মানুষ নিহত এবং প্রায় ২৩ হাজার মানুষ নিখোঁজ হন বলে বিভিন্ন হিসাবে উল্লেখ করা হয়। নিহত ও নিখোঁজদের বড় একটি অংশ ছিলেন তামিল। নিরাপত্তা বাহিনী ও তামিল টাইগার—উভয় পক্ষের বিরুদ্ধেই গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে।
চেম্মানি এলাকায় ১৯৯৬ সালে তামিল স্কুলছাত্রী কৃষান্তি কুমারস্বামীকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করেও গণকবরের অভিযোগ সামনে আসে। ওই মামলায় পাঁচ সেনাসদস্যের মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল। পরে এক দণ্ডিত সেনাসদস্য দাবি করেন, চেম্মানি এলাকায় কয়েক শ মানুষের মরদেহ সমাহিত করা হয়েছিল। ১৯৯৯ সালে সেখানে খনন চালিয়ে ১০টির বেশি কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়।
শ্রীলঙ্কার মানবাধিকার কমিশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন করে পাওয়া দেহাবশেষগুলোর বেশিরভাগই অগভীর ও ঘনভাবে সমাহিত ছিল। কমিশন এসব সমাহিতকরণ অবৈধ হওয়ার এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য আরও ফরেনসিক তদন্ত প্রয়োজন।
নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারগুলো দ্রুত ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছে। তাদের আশা, ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ স্বজনদের পরিচয় জানা যাবে। একই সঙ্গে তারা দায়ীদের শনাক্ত করে জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছেন।
শ্রীলঙ্কার সরকার জানিয়েছে, চেম্মানির তদন্তে সহযোগিতা করা হচ্ছে এবং খননকাজ অব্যাহত থাকবে। তবে দেশটির সেনাবাহিনী যুদ্ধের সময় বেসামরিক মানুষকে চেম্মানিতে গণহারে কবর দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
যুদ্ধকালীন নিখোঁজ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সমালোচনা রয়েছে। ২০১৮ সালে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে অফিস অব দ্য মিসিং পারসন্স (ওএমপি) গঠন করা হলেও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, এখনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
চেম্মানির নতুন গণকবরের ঘটনায় তাই শুধু দেহাবশেষের পরিচয় শনাক্ত করাই নয়, তাদের মৃত্যুর কারণ ও সম্ভাব্য দায়ীদের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিও জোরালো হয়েছে।
সন্ধানী বার্তা/এসএ