চট্টগ্রামে হামে আক্রান্ত জমজ দুই সন্তানকে নিয়ে দেড় মাস ধরে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটছেন এক দম্পতি। সন্তানদের চিকিৎসায় ইতোমধ্যে প্রায় সাত লাখ টাকা খরচ হয়েছে। জমানো টাকা শেষ হওয়ার পাশাপাশি গয়না বিক্রি এবং স্বজনদের কাছ থেকে তিন লাখ টাকা ধার করেও চিকিৎসা চালিয়েছেন তারা। এখন হাতে কোনো টাকা না থাকায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে সন্তানদের নিয়ে দিশেহারা বাবা-মা।
চট্টগ্রাম নগরীর কাপ্তাই রাস্তার মাথা এলাকার গার্মেন্টসকর্মী মিজানুর রহমান ও ইয়াসমিন বেগম দম্পতির জমজ দুই ছেলে ইয়াসিন ও ইয়ামিনের জন্ম চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি। জন্মের পর সাত মাস মোটামুটি সুস্থই ছিল তারা। আগস্টের প্রথম সপ্তাহে দুই শিশুর জ্বর ও শ্বাসকষ্ট শুরু হলে শুরু হয় হাসপাতালে ছোটাছুটি।
প্রথমে ইয়াসিনকে চমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাকে বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে নেওয়া হয়। চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফেরার কয়েক দিন পর আবারও ১০৪ ডিগ্রি জ্বর, মুখে ঘা ও চোখে সংক্রমণ দেখা দেয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তার শরীরে হাম শনাক্ত হয়। পরে শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেলে তাকে আবার আইসিইউতে ভর্তি করা হয়।
এদিকে হাসপাতালে থাকা ইয়াসিনের জমজ ভাই ইয়ামিনও হামে আক্রান্ত হয়। সম্প্রতি চমেক হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, ইয়াসিন ৯ নম্বর শিশু ওয়ার্ডে অন্য একটি শিশুর সঙ্গে একই শয্যায় চিকিৎসা নিচ্ছে। আর ইয়ামিন চিকিৎসাধীন রয়েছে হাম ওয়ার্ডে।
ইয়াসমিন বেগম বলেন, দেড় মাস ধরে তিনি হাসপাতালে রয়েছেন। মাঝখানে মাত্র এক রাত বাসায় থাকতে পেরেছেন। সন্তানদের চিকিৎসায় প্রায় সাত লাখ টাকা খরচ হয়েছে। গায়ের সব অলংকার বিক্রি করেছেন এবং বোন ও বোনের জামাইয়ের কাছ থেকে তিন লাখ টাকা ধার করেছেন। এখন আর কোনো টাকা নেই।
তিনি জানান, তার স্বামী একটি পোশাক কারখানায় মাসে সাড়ে ১২ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করেন। সন্তানদের চিকিৎসার জন্য দেড় মাস ধরে হাসপাতালে থাকায় তিনিও নিয়মিত কর্মস্থলে যেতে পারছেন না।
চট্টগ্রামে বাড়ছে হামের সংক্রমণ
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলা ও মহানগর মিলিয়ে সন্দেহজনক হাম আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ১২২ জন। এর মধ্যে নগরীতে আক্রান্ত হয়েছেন ৭ হাজার ৭৫২ জন এবং জেলার ১৫ উপজেলায় আক্রান্ত হয়েছেন ৩৭০ জন।
বর্তমানে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ২৭৬ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। পরীক্ষায় এখন পর্যন্ত ৭৪৩ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। নিশ্চিত হামে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া সন্দেহজনক হামে আক্রান্ত হয়ে আরও ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।
চমেকের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও হাম গবেষক ডা. কামরুন নাহার বলেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির কাছ থেকে ১২ থেকে ১৫ জনের মধ্যে রোগটি ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই আক্রান্ত রোগীকে আইসোলেশনে রাখা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা জরুরি।
তিনি বলেন, হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংকটের কারণে একই শয্যায় একাধিক শিশুকে চিকিৎসা দেওয়ায় হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে।
চমেক হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুসা মিয়া বলেন, হাম শনাক্ত হওয়ার আগেই অনেক রোগী বিভিন্ন উপসর্গ নিয়ে সাধারণ ওয়ার্ডে চিকিৎসা নেন। এতে তাদের সংস্পর্শে এসে অন্য রোগীরাও আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। আক্রান্ত রোগীদের জন্য আলাদা হাসপাতালের ব্যবস্থা করা গেলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি চিকিৎসাও সহজ হবে।
সন্ধানী বার্তা/এম/এসআইপি