জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া এখন শেষ পর্যায়ে। সংগঠনটির নতুন নেতৃত্ব নিয়ে বিএনপির অভ্যন্তরে আলোচনা যেমন তুঙ্গে, তেমনি পদপ্রত্যাশীদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে ব্যাপক অপেক্ষা। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, নতুন কমিটির একটি খসড়া ইতোমধ্যে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে রয়েছে। তাঁর চূড়ান্ত অনুমোদন মিললেই যেকোনো সময় ঘোষণা আসতে পারে।
তবে বিষয়টি নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক অবস্থান স্পষ্ট করেনি বিএনপি। দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী শুক্রবার (১৪ আগস্ট) জানিয়েছেন, ছাত্রদলের নতুন কমিটি সংক্রান্ত কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা নির্দেশনা এখনো তাঁর কাছে আসেনি। ফলে কমিটি ঘোষণার সময় নিয়ে দলীয় পর্যায়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও অভ্যন্তরীণ তৎপরতা যে শেষ পর্যায়ে, তা সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে স্পষ্ট হচ্ছে।
বিদায়ী নেতৃত্বের সাক্ষাৎ, বাড়ছে জল্পনা
নতুন কমিটি নিয়ে আলোচনার মধ্যেই বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর গুলশানে বিএনপির রাজনৈতিক কার্যালয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে ছাত্রদলের বর্তমান শীর্ষ পাঁচ নেতার বিদায়ী সাক্ষাৎ বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। সাধারণ রাজনৈতিক সৌজন্য সাক্ষাৎ হলেও এর সময়কাল এবং প্রেক্ষাপটের কারণে ঘটনাটি নতুন নেতৃত্ব ঘোষণার সম্ভাবনাকে আরও জোরালো করেছে।
সাক্ষাতের পর ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব এবং সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন বিদায়ী বার্তা দেওয়ায় সেই জল্পনা আরও বেড়েছে। দলীয় সূত্র বলছে, বৈঠকে সাম্প্রতিক আন্দোলন-সংগ্রামে ছাত্রদলের ভূমিকা, ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব, নতুনদের সুযোগ দেওয়া এবং বিদায়ী নেতাদের বিএনপির মূল রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করার বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। অর্থাৎ, এটি শুধু একটি বিদায়ী সাক্ষাৎ নয়; বরং ছাত্রদলের নেতৃত্ব পরিবর্তনের ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ একটি ইঙ্গিত হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
মেয়াদ শেষ, নতুন নেতৃত্বের অপেক্ষা
২০২৪ সালের ১ মার্চ রাকিবুল ইসলাম রাকিবকে সভাপতি এবং নাছির উদ্দীন নাছিরকে সাধারণ সম্পাদক করে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। পরে একই বছরের ১৫ জুন ২৬০ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়।
সংগঠনের খসড়া গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কেন্দ্রীয় সংসদের মেয়াদ দুই বছর। সেই হিসাবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। ফলে সাংগঠনিক বাস্তবতায় নতুন কমিটি গঠন এখন আর কেবল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়; বরং দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর একটি স্বাভাবিক নেতৃত্ব-রূপান্তরের প্রয়োজনীয়তাও তৈরি হয়েছে। এ কারণে নতুন কমিটি ঘোষণা হলে তা ছাত্রদলের সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাসের পাশাপাশি বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক নেতৃত্ব তৈরির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করবে।
সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় একাধিক নাম
নতুন কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে একাধিক নেতার নাম আলোচনায় রয়েছে। তাদের মধ্যে বিদায়ী কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি ইজাজুল কবির রুয়েল, ১ নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মমিনুল ইসলাম জিসান, সাংগঠনিক সম্পাদক আমান উল্লাহ আমান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবিদুল ইসলাম খানের নাম রয়েছে আলোচনার কেন্দ্রে। এর বাইরে কাজী জিয়া উদ্দিন বাসিক, রিয়াদ রহমান, আরিফুল ইসলাম আরিফ, তরিকুল ইসলাম তারিক ও মোস্তাফিজুর রহমান শুভসহ আরও কয়েকজন নেতার নামও বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনায় এসেছে।
তবে এসব নামের কোনটি শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত তালিকায় থাকছে, তা নিয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো ঘোষণা নেই। রাজনৈতিক সংগঠনের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব নির্বাচনে শেষ মুহূর্তে সমীকরণ বদলে যাওয়ার নজির থাকায় আলোচনায় থাকা নামগুলোকে সম্ভাব্য তালিকা হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
এবার নেতৃত্ব বাছাইয়ে কোন বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ?
ছাত্রদলের নতুন কমিটি নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শুধু কে সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক হচ্ছেন, তা নয়; বরং কোন রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক মানদণ্ডে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করা হবে—সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। পদপ্রত্যাশীদের বক্তব্যে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে সামনে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকা, সাংগঠনিক দক্ষতা, ত্যাগ ও পরীক্ষিত ভূমিকা। তৃণমূলের প্রত্যাশা, রাজপথের পরীক্ষিত নেতাদের পাশাপাশি নিয়মিত শিক্ষার্থী এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে—এমন নেতাদেরও নেতৃত্বে আনা হবে।
নারী নেতৃত্বের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক সংগঠনকে আরও কার্যকর করার দাবিও রয়েছে। ফলে নতুন কমিটি শুধু পুরোনো নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে, নাকি নতুন প্রজন্মের একটি বড় অংশকে সামনে নিয়ে আসবে—সেদিকেও নজর থাকবে।
সন্ধানী বার্তা/এসআর/এএএন