শরীরে হাম নিয়ে শ্বাসকষ্টে ছটফট করছিল ৬ মাসের গৌরি। চিকিৎসক দ্রুত তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু গৌরির আগে আরও ২৬ জন শিশু অপেক্ষা করছিল আইসিইউর একটি বেডের জন্য। দুইদিন অপেক্ষা করেও আইসিইউ না পাওয়া গৌরি মারা গেছে। পরদিন আইসিইউ থেকে তার বাবাকে ফোন করা হয়েছে গৌরির সিরিয়াল এসেছে বলে। বাবা জানিয়ে দিয়েছেন, এখন আর আইসিইউ লাগবে না গৌরির।
শিশু গৌরি নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার চাঁইপাড়া গ্রামের সোহাগ কুমারের মেয়ে। তার মায়ের নাম বন্দনা রানী। গৌরি ছিল তাদের প্রথম সন্তান। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শনিবার দুপুরে গৌরি মারা যায়। এর আগে গত বুধবার (১৫ এপ্রিল) তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল।
গৌরির বাবা সোহাগ কুমার জানান, তারা বাড়িতেই মেয়ের শরীরে হাম দেখেন। জ্বর ছাড়ছিল আর আসছিল। এ অবস্থায় বুধবার তারা গৌরিকে নিয়ে রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যান। সেখান থেকে তাকে রামেক হাসপাতালে স্থানান্তর করে দেওয়া হয়। পরদিন বৃহস্পতিবার দুপুরে মেয়ের প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। তখন চিকিৎসক আইসিইউতে সিরিয়াল দিয়ে আসতে বলেন। তিনি আইসিইউতে ছুটে যান। তখন গৌরির সিরিয়াল পড়ে ২৭।
সোহাগ বলেন, এরপর দু’দিন ধরেই অক্সিজেন চলছিল। গৌরি মারা যাওয়ার আধা ঘণ্টা আগে তার কষ্ট তিনি সহ্য করতে না পেরে আবার আইসিইউতে ছুটে যান। তখন আইসিইউ থেকে তাকে বলা হয়, আইসিইউর জন্য যারা সিরিয়াল দিয়েছে তারা প্রত্যেকে মূমুর্ষ। সিরিয়াল ভেঙে কাউকে আইসিইউতে নেওয়া যাবে না। হতাশ হয়ে তিনি ওয়ার্ডে ফেরেন। কিছুক্ষণ পর তার মেয়ে মারা যান। এরপর তারা মেয়ের মরদেহ নিয়ে বাড়ি ফেরেন।
তিনি বলেন, ‘ডাক্তাররা খুব আন্তরিক। তারা সাধ্যমত চেষ্টা করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা আমার মেয়েকে বাঁচাতে পারেননি। আজ (রোববার) দুপুরে আমাকে আইসিইউ থেকে ফোন করা হয়েছিল। গৌরির সিরিয়াল এসেছে বলে আমাকে জানানো হয়। আমি জানিয়ে দিই যে, আমাদের আর আইসিইউ লাগবে না। আমাদের গৌরি সবাইকে ছেড়ে চলে গেছে।’
সোহাগ বলেন, ‘আমার কারও ওপর কোনো অভিযোগ নেই। আমি কোথাও অভিযোগ করিনি। শুধু একটাই দাবি রাখব, শিশুদের জন্য যেন আইসিইউতে বেড বাড়ানো হয়। আর আইসোলেশন ওয়ার্ডে যেন রোগী কম রাখে। কারণ, সেখানে এত বেশি রোগী যে কোনো বাচ্চা একটু সুস্থ হলেও অন্য বাচ্চা আক্রান্ত থাকার কারণে অন্য বাচ্চাটারও সমস্যা বেড়ে যাচ্ছে।’
রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস জানান, হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে বর্তমানে ১৩২ জন শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। এরমধ্যে শনিবার সকাল থেকে রোববার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় নতুন ১০ জন শিশু ভর্তি হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে ছাড়পত্র পেয়েছে ২৬ জন।
হামের সংক্রমণ শুরুর পর এ পর্যন্ত হাসপাতালে মোট ৬৬১ জন শিশু ভর্তি হয়েছে। এরমধ্যে ৫২ জন মারা গেছে। গত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হাসপাতালে শুধু শিশু গৌরির মৃত্যু হয়।
সন্ধানী বার্তা/জেএন