আগামী সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফরের সম্ভাবনা নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। কেউ কেউ সম্ভাবনা ‘খুবই কম’ বললেও অন্যদের মতে, আলাপ-আলোচনা ঠিকমত এগোলে সফরটি এখনও সম্ভব। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের পর হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেছিলেন, ভারতের জনগণ ও প্রধানমন্ত্রী মোদী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের অপেক্ষায় আছেন।
হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্য হচ্ছে-‘আমাদের ইস্যু হবে, বাংলাদেশের ইস্যু হবে। কিন্তু মানুষের ইস্যু একটাই যে—ভালো সম্পর্ক। আর ভালো সম্পর্ক হলে উইন-উইন সিচুয়েশন। এটা আমাদের ঐতিহাসিকভাবে আছে, এটা তো আপনি বদলাতে পারবেন না। প্রতিবেশী তো বদলাতে পারবেন না, ইতিহাস বদলাতে পারবেন না।’ আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের ওপর জোর দিয়ে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, ‘আমি সবসময় বলি, আমরা শুধু সীমান্ত ভাগাভাগি করি না, আমরা স্বপ্নও ভাগাভাগি করি। আমরা তো স্বপ্ন ভাগাভাগি করি, তাই তো? আমার মনে হচ্ছে, আগামী দিন খুবই ভালো হবে। ইস্যুজটা শর্ট-আউট করতেই হবে, দুদিক থেকে। আমি খুবই আত্মবিশ্বাসী।’
প্রধানমন্ত্রী ব্রিকসের আয়োজনে যোগ দেবেন কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। সরকার বলছে, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে ব্রিকসের চেয়ে দ্বিপক্ষীয় সফরকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
যদিও ভারতীয় হাই কমিশনারের এই বার্তার মধ্যে ভারতের দিক থেকে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার আগ্রহ দেখতে পাচ্ছেন সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, ‘হাই কমিশনার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করলেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করলেন। বৈঠক করার পরে যে ধরনের কথাবার্তা বলেছেন, এটা দেখে মোটামুটি বোঝা যাচ্ছে যে, তারা চাচ্ছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী এই ব্রিকস সম্মেলনে যান। এবং এরপর তাদের ‘র’ প্রধান এসেছিলেন, তিনি দেখা করেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার সাথে, এটা রুটিন বললেও আমি মনে করি যে, এটা তাদের দিক থেকে মনে হচ্ছে তারা আগ্রহী। এখন এটা আমাদের দিক থেকে আমাদের সিদ্ধান্ত।’
আলাপ-আলোচনার ‘সুযোগ’ কাজে লাগানোর পরামর্শ দিয়ে বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সভাপতি হুমায়ুন কবির বলেন, প্রতিবেশী হিসাবে দুই দেশের স্বার্থ ‘খুব ওতপ্রোতভাবে জড়িত’। সেক্ষেত্রে যদি এই ভিজিটের পাশাপাশি ভালো দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের ব্যবস্থা করার সুযোগ থাকে, সেটা চিন্তা করে দেখা যেতে পারে।’
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্নেন্সের (এসআইপিজি) পরিচালক অধ্যাপক এসকে তৌফিক এম হক মনে করেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে হাই কমিশনারের বৈঠক আসলে ছিল শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন ঘিরে উত্তাপের পর দুই পক্ষের বার্তা আদান-প্রদানের সাক্ষাৎ। মনে হয়েছে, বাংলাদেশ খুব শক্তভাবে তার অবস্থানটা জানিয়েছে। ভারতীয় দিক থেকে সেই অবস্থানটা জানার পরে তারা দিল্লিতে বা তাদের মূল নীতিনির্ধারণী মহলে সেটা অবহিত করেছে।’
পরিস্থিতি যেখানে দাঁড়িয়েছে, তাতে সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরের খুব একটা সম্ভাবনা দেখছেন না অধ্যাপক তৌফিক এম হক। সফর নিয়ে সোমবার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘উনি খুব স্পষ্ট ভাষায়, কিছুটা কড়া ভাষায় বলেছেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে দাওয়াত দেওয়া হয়নি ব্রিকসে, বিমসটেকের সভাপতিকে দাওয়াত দেওয়া হয়েছে এবং সেটা বাংলাদেশ খুব পছন্দ করেছে বা এটা বাংলাদেশের বর্তমানের নীতিনির্ধারক মহল এটাকে পজিটিভলি আগাবে, এরকম উনার বলার টোনে মনে হয়নি। আমি মনে করি যে, ব্রিকসের সম্মেলনে যাওয়ার সুযোগ একেবারেই কমে গেছে। অফিশিয়ালি এখনও কিছু বলা হয়নি, কিন্তু আমার মনে হয় একেবারেই কমে গেছে।’
এখন দ্বিপক্ষয়ী সফরের যে আমন্ত্রণটি রয়েছে, সেটি ধরে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে পরিকল্পনা করবে বলে মনে করছেন এই বিশ্লেষক। তবে সেখানেও ‘কিন্তু’ আছে। তিনি মনে করেন, ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরির যে শর্ত বাংলাদেশ দিয়েছে, শেষ পর্যন্ত ভারত তা মেনে নেবে। অর্থাৎ, দিল্লিতে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে লাগাম টানতে ভারত হয়ত রাজি হবে। এটা মেনে না নেওয়ার কোনো কারণ নাই। এই রকম একজন ব্যক্তির জন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্কতো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে না। আমার মনে হয়, ভারতের নীতিনির্ধারকরাও এটাকে ইতিবাচকভাবে নেবেন এবং এভাবে সম্পর্ক এগোনোর সম্ভাবনা দেখি আমি।’
এম/এএইচ