এক্সক্লুসিভ

‘দৃষ্টিনন্দন’ নয় ‘সাধারণ চেয়ারে’ তথ্য প্রতিমন্ত্রী, দুর্নীতির বিরুদ্ধে পুনরায় কড়া বার্তা

জেলা পর্যায়ে আধুনিক তথ্য কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় ময়মনসিংহ বিভাগীয় তথ্য কমপ্লেক্স নির্মাণ কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠান। শনিবার (০৪ এপ্রিল) বিকেলে ভিত্তিপ্রস্তর উন্মোচন করলেন সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী। নগরীর শিকারীকান্দায় তথ্য কমপ্লেক্সের জন্য অধিগ্রহণকৃত নিজস্ব জায়গায় এরপর আয়োজন করা হয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের। অনুষ্ঠান মঞ্চে উঠেই প্রথমেই প্রতিমন্ত্রীর চোখ পড়লো তাঁর জন্য নির্ধারিত সুদৃশ্য চেয়ারের দিকে। তিনি প্রধান অতিথি বলেই কীনা অন্য সব অতিথির চেয়ে তাঁর চেয়ারটি ব্যতিক্রম! কিন্তু প্রথা বিরোধী প্রতিমন্ত্রী সেই চেয়ারে না বসে বসলেন অন্যদের মতোন সাধারণ চেয়ারে!

সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিমন্ত্রীর দৃষ্টিনন্দন চেয়ারে না বসে একেবারেই সাধারণ চেয়ারে আসন গ্রহণের এ যেন অভূতপূর্ব বাস্তবিক এক দৃশ্য। বিস্ময়ভরা দৃষ্টি নিয়ে যা প্রত্যক্ষ করলেন গণমাধ্যমকর্মী থেকে শুরু করে উপস্থিত প্রত্যেকে। জনগণের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাদের সঙ্গে এমন অকৃত্রিম মেলবন্ধন তাকে সাধারণে করে তুলেছে অসাধারণ। শুধু কী তাই? মঞ্চে বসা অতিথিদের জন্য নাশতাও তিনি গ্রহণ করেননি। দুর্নীতির বিরুদ্ধেও পুনরায় দিয়েছেন কড়া বার্তা।

অনুষ্ঠানে সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তথ্য কমপ্লেক্স নির্মাণে দুর্নীতি হলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি বলেছেন, ‘এই মন্ত্রণালয়ে আমি যতোদিন আছি দুর্নীতি স্পর্শ করবে না।’ তাঁর বা তথ্য সচিবের নাম ভাঙিয়ে কেউ দুর্নীতির আশ্রয় নিলে সরাসরি তাকে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর পরামর্শ দেন।

আধুনিক বাংলাদেশের স্বপ্ন নির্মাতা ও পরিবর্তনের কাণ্ডারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে যেমন ক্ষমতার চাকচিক্য স্পর্শ করেনি ঠিক তেমনি তাঁর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রীসভার এই প্রতিমন্ত্রীও শুরু থেকেই সাদামাটা এক পথকেই বেছে নিয়েছেন। এর আগে গত মাসের শেষ সপ্তাহে নিজ নির্বাচনী এলাকা ময়মনসিংহের নান্দাইলে সড়কের পাশে এক ব্যক্তির দাফন কাজ চলতে দেখে রাষ্ট্রীয় প্রটোকল ভেঙে হঠাৎ গাড়ি থামিয়ে দাফন কাজে অংশ নিয়ে মানবিকতার অনবদ্য এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী।

একজন ‘মাটির মানুষ’ হিসেবেই নিজেকে মেলে ধরেছেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেও সাধারণ এক জীবন ইয়াসের খান চৌধুরীর। যুক্তরাজ্যের বিলাসী জীবন তাকে টানেনি। তাঁর বাবা মো. আনোয়ারুল হোসেন খান চৌধুরীও ছিলেন সংসদ সদস্য। তিনি ১৯৯১ সালের নির্বাচনে ময়মনসিংহ-৯ (নান্দাইল) আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন। তাঁর চাচা খুররম খান চৌধুরী ছিলেন চারবারের সংসদ সদস্য। দীর্ঘদিন বিবিসি টেলিভিশন নেটওয়ার্ক লন্ডন-এর তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। চাকরির অধ্যায় শেষ করে সক্রিয় হন রাজনীতিতে। দীর্ঘ সময় যাবত নেতৃত্ব দিচ্ছেন নান্দাইল উপজেলা বিএনপির। বাবা-চাচার মতোই নান্দাইল থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর এই তথ্য প্রযুক্তি বিজ্ঞানীকে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

একজন ‘মাটির মানুষ’ হিসেবেই নিজেকে মেলে ধরেছেন তিনি। একটুকুও বদলাননি নিজেকে। বিএনপির রাজনৈতিক পরিবারের এই সন্তানের নিজের নির্বাচনী এলাকা নান্দাইলেও চলাফেরা একেবারেই সাদাসিধে। কথায় বলে ‘মর্নিং শোজ দ্য ডে’। অর্থাৎ সকাল দেখেই সারা দিন কেমন যাবে তা বোঝা যায়। একজন প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরীর সাধারণ জীবনযাপন, সততা ও নিষ্ঠা যেন এক অপার বিস্ময়।

দেশের ৬৪ জেলায় ৬৪টি তথ্য কমপ্লেক্স নির্মাণের ঘোষণা
ময়মনসিংহ বিভাগীয় তথ্য কমপ্লেক্স নির্মাণ কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী দেশের ৬৪ জেলায় ৬৪টি তথ্য কমপ্লেক্স নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘সে উদ্দেশ্যে বিভাগীয় শহরসহ ২৬টি জেলার কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে। এটা আমার প্রথম উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আরও চারটি ভবন নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করা হবে। প্রয়োজনে অনুমোদন সাপেক্ষে পর্যায়ক্রমে আমরা উপজেলা পর্যায়েও তথ্য কমপ্লেক্স ভবন করার প্রকল্প হাতে নিব ইনশাআল্লাহ।’ তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘নির্বাচনী ইশতেহার নিয়ে জনগণের কাছে গিয়েছিলাম। জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। বিগত সরকারের আমলে উন্নয়নের নামে হাতে প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল কিন্তু কাজ হয়নি। আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমাদের কাজে দুর্নীতি স্পর্শ করতে পারবে না। গুণগত মান ঠিক রেখে সঠিকভাবে কাজ শেষ করার জন্য ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের প্রতি আহ্বান জানান।

জনগণের মাঝে তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিন্ত করবো
গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের উদ্দেশ্যে ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্দেশনা দিয়েছেন, আমরা জনগণের মাঝে তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিন্ত করবো। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা আছে, থাকবে। কিন্তু মিস ইনফরমেশন, মিথ্যা বা বানোয়াট কিছু যেন সংবাদে রূপ না নেয়, আপনারা সেদিকে খেয়াল রাখবেন। তথ্য কমপ্লেক্স চালু হলে সাংবাদিকরাই সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন জানিয়ে তথ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বহু জায়গায় প্রেসক্লাবের ভগ্নদশা। তথ্য কমপ্লেক্সের ভেতরে সাংবাদিকদের জন্য স্থান লিজ নেওয়ার বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা চলছে।’

জনগণকে সজাগ করা তথ্য মন্ত্রণালয়ের অন্যতম কাজ
জনগণকে সজাগ করা তথ্য মন্ত্রণালয়ের অন্যতম কাজ উল্লেখ করে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবা ফারজানা বলেন, তথ্য কমপ্লেক্সগুলো বিভিন্ন জেলায় এরকম একটি হাব হিসেবে গড়ে উঠবে। সাংবাদিক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে তথ্য কমপ্লেক্সগুলো ভাবের আদান প্রদানের জায়গা হয়ে উঠবে। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় বর্তমানে গণমাধ্যমের আধুনিকায়ন ও তথ্য সেবার দিকে নজর দিয়েছে। ডিজিটাল তথ্যসেবা, সেবার সম্প্রসারণ এবং সোশ্যাল ও নিউমিডিয়ায় নিজেদেরকে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করতে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় মনোনিবেশ করেছে। তিনি বলেন, ‘আমার বাড়ি ময়মনসিংহে। এই জনপদের মানুষের সঙ্গে আমার আত্মার সম্পর্ক, তাই মাননীয় মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর সহযোগিতায় ময়মনসিংহের মানুষের জন্য বিশেষ কিছু করতে চাই।’

গণযোগাযোগ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আবদুল জলিল এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে ফজলুল হক ভূঁইয়া, অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার জন কেনেডি জাম্বিল, জেলা প্রশাসক মোঃ সাইফুর রহমান, ময়মনসিংহ গণপূর্ত জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম, জেলা পর্যায়ে আধুনিক তথ্য কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মোঃ মনিরুজ্জামান। ময়মনসিংহ জেলা তথ্য অফিসের পরিচালক মীর আকরাম অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন।

১৯.৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হবে ৭তলা বিশিষ্ট বিভাগীয় তথ্য কমপ্লেক্স
ময়মনসিংহ বিভাগে ১৯.৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭ তলা বিশিষ্ট বিভাগীয় তথ্য কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণের জন্য ঠিকাদারের সঙ্গে ১৮ মাস মেয়াদী চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। শনিবার (০৪ এপ্রিল) নির্মাণ কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মাধ্যমে কাজ শুরু হলো। নির্মিতব্য তথ্য কমপ্লেক্সে সিনেপ্লেক্স ও আইসিটি বিষয়াদি যেমন ইন্টারনেট, সাইবার ক্যাফে, ডিজিটাল আর্কাইভ এবং ডিজিটাল ল্যাব ইত্যাদির ব্যবস্থা থাকবে। এটি একটি পরিপূর্ণ তথ্য ভান্ডার হিসেবে কাজ করবে। অন্যদিকে, এখানে সিনেপ্লেক্সে প্রদর্শিত চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সুস্থ ধারার চলচ্চিত্র দেখার অভ্যাস গঠন ও চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নয়ন সাধন হবে। পাশাপশি সর্বস্তরের জনগণের মধ্যে জাতীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য, মহান মুক্তিযুদ্ধসহ আমাদের জাতীয় জীবনে ঘটে যাওয়া আন্দোলন-সংগ্রামের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রসার করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সন্ধানী বার্তা/আরআই/এমকে


সম্পর্কিত খবর