শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি

প্রেম, প্রকৃতি ও প্রতিবাদের স্বতন্ত্র কবি বিমল গুহ

বাংলা কবিতার সত্তরের দশক ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতা, মুক্তিযুদ্ধের অভিঘাত, স্বাধীনতা-পরবর্তী বাস্তবতা ও সামাজিক রূপান্তরের এক আলোড়িত সময়। এই সময়ের কবিদের মধ্যে বিমল গুহ নিজের স্বতন্ত্র কাব্যভাষা ও সংবেদনশীল জীবনবোধের কারণে আলাদা পরিচিতি গড়ে তুলেছেন। তাঁর কবিতার মূল সুরে মিশে আছে ব্যক্তিজীবনের ঘাত-প্রতিঘাত, দেশপ্রেম, প্রেম, প্রকৃতি, প্রতিবাদ এবং গভীর মানবিক উপলব্ধি। কৈশোরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সঞ্চয়িতা’ পাঠের মধ্য দিয়ে কবিতার প্রতি তাঁর অনুরাগ তৈরি হয়। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০-এর নির্বাচন এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ ও শরণার্থী শিবিরের অভিজ্ঞতা তাঁর কাব্যজগতে তৈরি করেছে বিস্তৃত মানবিক পটভূমি।

পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকার সাহিত্য পরিমণ্ডলে তাঁর কাব্যসাধনা পরিণতি লাভ করে। ১৯৮২ সালে প্রকাশিত ‘অহংকার, তোমার শব্দ’ থেকে শুরু করে ব্যাধিমুক্তির সন্ধিক্ষণে রচিত ‘এ কোন মাতাল নৃত্য’ পর্যন্ত তাঁর কবিতায় প্রেম, ক্রোধ, প্রতিবাদ, সমাজ-সংস্কৃতি ও জীবনদর্শনের নানা মাত্রা প্রকাশ পেয়েছে। ব্যক্তিগত অনুভূতি থেকে জাতীয় ইতিহাস, প্রকৃতির সৌন্দর্য থেকে মৃত্যুচেতনা—সবকিছুই তাঁর কবিতায় পেয়েছে নিজস্ব শিল্পরূপ।

প্রেম ও বিশ্বাসে নবসৃষ্টির প্রত্যয়
বিমল গুহের কবিতায় প্রেম কেবল ব্যক্তিগত আবেগের প্রকাশ নয়; এটি মানুষের ক্লান্তি, বিষাদ ও ব্যাধি অতিক্রমের এক আত্মিক শক্তি। বিশ্বাস ও ভালোবাসার অলৌকিক ক্ষমতার মধ্য দিয়ে তিনি জীবনের সংকট পেরিয়ে নতুন সম্ভাবনার সন্ধান করেন। প্রেয়সীর আরোগ্য কামনায় আগুনের মতো তীব্র বিশ্বাস ধারণ করে কবি নিজেকে নবসৃষ্টির রূপকার হিসেবে আবিষ্কার করেন। ভালোবাসার নিবিড় স্পর্শে অতীতের গ্লানি মুছে গিয়ে জীবন হয়ে ওঠে সম্ভাবনাময়। এমন অনুভূতির প্রকাশ ঘটেছে ‘আলোকবর্তিকা’ কবিতায়—

‘আগুন আকাশকে ছুঁতে পারে না
বিশ্বাস আকাশকে ছোঁয়
বাতাস পাহাড়কে নাড়াতে পারে না
প্রেম পাহাড়কে নাড়ায়,
আকাশের দিকে তাকাতে তাকাতে চোখে রক্তগোলাপ ফুটে আছে
পাহাড়ের গায়ে হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হবো কি—দাক্ষায়ণী?

বিষাদগ্রস্ত মানুষের মুখ দেখলে আমার আগুনের কথা মনে পড়ে
আমি আলোকবর্তিকা হাতে তোমাকে খুঁজি
তোমার উদ্দীপ্ত ইচ্ছার কথা ভাবলে
তিল তিল জন্ম নেয় রক্তকণিকায় স্পন্দন
আমি নবসৃষ্টির রূপকার।’

[আলোকবর্তিকা: কবিতাসংগ্রহ, পৃ. ২১]

এখানে আগুন, আকাশ, পাহাড় ও আলোকবর্তিকার মতো চিত্রকল্পের মধ্য দিয়ে বিশ্বাস ও প্রেমের শক্তিকে প্রকাশ করেছেন কবি। তাঁর কাছে ভালোবাসা এমন এক শক্তি, যা অসম্ভবকে সম্ভব করার প্রত্যয় জোগায় এবং বিপর্যস্ত জীবনেও নতুন করে বেঁচে থাকার প্রেরণা সৃষ্টি করে।

প্রেমের আগমন ও অপেক্ষার দীর্ঘশ্বাস
বিমল গুহের প্রেমের কবিতায় অপেক্ষা, আকাঙ্ক্ষা, বিরহ ও প্রিয়জনের আকস্মিক উপস্থিতি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ‘তুমি এলে’ কবিতায় নিশীথের স্তব্ধতা ভেঙে স্বপ্নের আবহে প্রেমাস্পদের আগমন এক নতুন সূচনার ইঙ্গিত দেয়। ভোর হওয়ার আগের আলো-আঁধারি, জানালার শিক, রাতের অন্ধকার ও চাঁদের শেষ আলো—এসব উপাদান কবিতায় তৈরি করেছে এক আবেশময় পরিবেশ। কবির ভাষায়—

‘তখনো হয়নি ভোর তুমি এলে স্বপ্নে গুঞ্জরণে
বিছানায় শুয়ে আছে রাত্রির স্তব্ধতা।
জানালার শিকে ভাঙা অন্ধকার
ছড়িয়েছে নিশীথের চুল—
চন্দ্রের শেষ আলো তখনো মোছেনি ভেজাচোখ
আকাশের সিঁড়ি ভেঙে
তুমি এলে আবাল্য স্পর্ধায়।’

[তুমি এলে: কবিতাসংগ্রহ, পৃ. ১২৩]

অন্যদিকে ‘সংগতি’ কবিতায় দীর্ঘ অপেক্ষার পর কাঙ্ক্ষিত মানুষের ফিরে আসার অনুভূতি ফুটে উঠেছে। প্রকৃতির ঋতুচক্র পেরিয়ে প্রিয়জনের আকস্মিক উপস্থিতি কবির ক্লান্ত জীবনে এনে দেয় প্রশান্তি ও বিস্ময়। তিনি লিখেছেন—

‘যেন তুমি অনেকদিন পর খুলে দিলে ঘরের দরজা।
সারাদিনের পরিশ্রমের পর
ক্লান্ত শরীর দখিন হাওয়ায় বেজে উঠলো রিমঝিম
কোথায় ছিলে এতদিন?
আশ্বিন কার্তিক গেলো
অগ্রহায়ণ গেলো
চৈত্রের দরজায় এসে
আলুথালু কড়া নাড়লে তুমি!’

[সংগতি: কবিতাসংগ্রহ, পৃ. ১২৯]

দীর্ঘ বিরতির পর প্রিয় মানুষের আগমন যেমন আনন্দ ও প্রশান্তি তৈরি করে, তেমনি তার ক্ষণিক উপস্থিতি আবার নতুন করে শূন্যতার জন্ম দেয়। এই আসা-যাওয়ার মধ্যেই কবি জীবনের আবেগময় বাস্তবতাকে তুলে ধরেছেন।

অবজ্ঞার আঘাতেও ভালোবাসার গভীরতা
‘অবজ্ঞা’ কবিতায় প্রেমের আরেকটি জটিল ও মনস্তাত্ত্বিক দিক প্রকাশ পেয়েছে। প্রিয়জনের অবহেলা ও প্রত্যাখ্যান ভালোবাসাকে নিঃশেষ না করে বরং আরও তীব্র করে তোলে। বেদনার মধ্যেও কবি প্রকৃতির কাছে আশ্রয় খোঁজেন। দুঃখ, ভালোবাসা ও অপেক্ষার বিচ্ছিন্ন অনুভূতিগুলো তাঁর কবিতায় একাকার হয়ে যায়। কবির ভাষায়—

‘তোমার অবজ্ঞা পেয়ে ভালোবাসা তীব্র হলো আরো
বিনয় তাড়িত রাত খুলে দেয় চোখের সম্মুখে অন্ধকার,
আমিও শরীর আড়মোড়া কেটে দুপায়ে সরাই বেদনাকে
বিছানা চাদর যেন রাতভর মলিনতা ধারণ করেছে।
মাঝে মধ্যে নীলিমায় টুকরো টুকরো দুঃখ ছুড়ে ফেলি
টুকরো টুকরো ভালোবাসা, টুকরো টুকরো গড়িমসি
দেখি, আমার শরীরজুড়ে ঝাঁকঝাঁক পাখির কূজন
আমাকে পাগল হাওয়ায় দোলা দেয়
বেদনা ভোলায়—
আমাকে দুহাত ধরে নিয়ে যায় নদীর ওপারে
ভালোবাসা যেখানে শিখেছে গড়িমসি।’

[অবজ্ঞা: কবিতাসংগ্রহ, পৃ. ১৩৭]

এ কবিতায় ভালোবাসার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অভিমান, প্রত্যাখ্যান ও নিঃসঙ্গতা। প্রিয়জনের অবজ্ঞায় আহত কবি প্রকৃতির মধ্যে সান্ত্বনা খুঁজে নেন। পাখির কূজন, বাতাস ও নদীর ওপারের কল্পিত জগৎ তাঁর মানসিক যন্ত্রণাকে অন্য এক অনুভূতির স্তরে নিয়ে যায়। ফলে ব্যক্তিগত বেদনা হয়ে ওঠে সর্বজনীন মানবিক অভিজ্ঞতা।

প্রতিবাদ ও অদম্য অগ্রযাত্রার কবি
বিমল গুহের কবিতায় প্রেম ও প্রকৃতির পাশাপাশি প্রতিবাদী চেতনারও শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে। ‘অবরোধ’ কবিতায় অগ্রযাত্রা রুদ্ধ করার অপচেষ্টা এবং তার বিপরীতে কবির দৃঢ় প্রতিরোধের মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে। অন্যায়ের মুখে তিনি নতি স্বীকার করেন না। বরং বাধা অতিক্রমের সাহস ও আত্মবিশ্বাসকে ধারণ করেন। কবির ভাষায়—

‘আমার চলার পথে বেড়ি কেটে
রুখতে কি পারো এই গতি?
পায়ে পায়ে লেগে আছে রুক্ষ ধূলিকণা
প্রবল ঝঞ্ঝায় যদি দাঁড়াও সম্মুখে
তোমার সম্পূর্ণ চিত্র, মুখাবয়ব
কপালের বলিরেখা ঢেকে যাবে জিঘাংসু ধুলায়।
পরে যদি পস্তাও
এই ভয়ে আমার সাহস অস্থি ও মজ্জায়
দুলে ওঠে, করুণায় বিগলিত হয়।

[অবরোধ: কবিতাসংগ্রহ, পৃ. ৯১]

এখানে কবির অগ্রযাত্রা কেবল ব্যক্তিগত চলার পথ নয়; এটি অন্যায়, বাধা ও প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে মানুষের সংগ্রামের প্রতীক। তাঁর প্রতিবাদে সাহসের পাশাপাশি করুণার উপস্থিতিও লক্ষণীয়। প্রতিপক্ষের প্রতি ঘৃণার বদলে মানবিক উপলব্ধির জায়গাটিও কবি অক্ষুণ্ন রেখেছেন।

জীবন-মৃত্যুর দার্শনিক উপলব্ধি
‘এ কোন মাতাল নৃত্য’ কাব্যগ্রন্থের ‘ধ্রুবসত্য’ কবিতায় বিমল গুহ জীবন ও মৃত্যুর চিরন্তন সম্পর্ককে দার্শনিক দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করেছেন। চন্দ্র, সূর্য ও তারার মতো প্রকৃতির চিরন্তন উপাদানের পাশাপাশি তিনি মৃত্যুকে জীবনের অবধারিত সত্য হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। জন্মকে আমরা সাধারণত জীবনের সূচনা ও আলোর প্রকাশ হিসেবে দেখি। কিন্তু কবি সেই প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে প্রশ্ন করেছেন। তাঁর দৃষ্টিতে জন্ম ও মৃত্যু পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়; বরং সৃষ্টির ধারায় জন্মও মৃত্যুর অধীন। কবিতায় তিনি লিখেছেন—

‘পৃথিবীতে ধ্রুবসত্য চন্দ্র-সূর্য তারা
ধ্রুবসত্য জন্ম নয়, মৃত্যুর ইশারা!

জন্ম কি উদ্ভাস, তবে মৃত্যু কি বিলীন?
সৃষ্টিসত্যে জন্মই মৃত্যুর অধীন

জন্ম হাহাকার— মৃত্যু পরম সুন্দর;
মৃত্যুতেই বস্তুর মৌল রূপান্তর।’

[ধ্রুবসত্য: এ কোন মাতাল নৃত্য, পৃ. ১৭]

এই কবিতায় মৃত্যু কেবল জীবনের সমাপ্তি নয়, বরং রূপান্তরের একটি অনিবার্য বাস্তবতা। জন্ম ও মৃত্যুর মধ্যকার দার্শনিক সম্পর্ককে কবি সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর পঙ্‌ক্তিতে প্রকাশ করেছেন।

সত্তরের উত্তাল সময়ে স্বতন্ত্র কাব্যভাষা
বাংলাদেশের কবিতার ইতিহাসে সত্তরের দশক ছিল গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সময়। মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক হতাশা ও মূল্যবোধের সংকট তৎকালীন কবিদের সৃষ্টিতে নানা মাত্রায় প্রতিফলিত হয়। আবিদ আনোয়ার, ফারুক মাহমুদ, আবিদ আজাদ, নাসির আহমেদ, শিহাব সরকার, কামাল চৌধুরী, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, নাসিমা সুলতানা ও সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলালসহ অনেক কবি তাঁদের নিজস্ব কাব্যভাষায় সমকালীন বাস্তবতা তুলে ধরেছেন।

এই প্রজন্মের মধ্যে বিমল গুহের অবস্থান স্বতন্ত্র। তাঁর কবিতায় সমকালীন রাজনীতি, সামাজিক সংকট ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ থাকলেও তা সরাসরি স্লোগাননির্ভর হয়ে ওঠেনি। বরং রূপক, প্রতীক ও সংযত ভাষার মাধ্যমে তিনি এসব বিষয়কে শিল্পসম্মতভাবে প্রকাশ করেছেন। উচ্চকণ্ঠ প্রকাশের পরিবর্তে তিনি বেছে নিয়েছেন গভীর, সংবেদনশীল ও আত্মমগ্ন কবিস্বর।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ তাঁর কবিমানসের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। অন্যায়, শোষণ ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান স্পষ্ট। সমাজ পরিবর্তন, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের মর্যাদা রক্ষার আকাঙ্ক্ষা তাঁর কাব্যচিন্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ কারণে তাঁর কবিতায় রাজপথের উত্তাপ ও হৃদয়ের গভীর অনুভূতি পাশাপাশি অবস্থান করে।

প্রকৃতির সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক
বিমল গুহের কাব্যবিশ্বের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য প্রকৃতিচেতনা। গ্রামীণ বাংলার রূপ, শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি এবং নদীর গতিময়তা তাঁর কবিতার ভাবজগৎকে সমৃদ্ধ করেছে। নগরজীবনে অবস্থান করেও তিনি প্রকৃতির সঙ্গে গভীর আত্মিক সম্পর্ক বজায় রেখেছেন।

তাঁর কবিতায় প্রকৃতি কেবল সৌন্দর্যের পটভূমি নয়; বরং মানুষের অস্তিত্ব, ক্লান্তি, বিরহ ও অন্তর্জগতের প্রতিচ্ছবি। জল, নদী, মেঘ, বাতাস ও বনরাজির রূপান্তরের মধ্য দিয়ে তিনি মানবজীবনের উত্থান-পতন এবং বেঁচে থাকার সংগ্রামকে তুলে ধরেছেন। প্রকৃতির প্রতি তাঁর এই গভীর অনুরাগ কবিতায় একধরনের নস্টালজিয়া ও প্রশান্তির আবহ তৈরি করে।

তবে তাঁর প্রকৃতিচেতনা শুধু কোমল ও স্নিগ্ধ অনুভূতিতে সীমাবদ্ধ নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী প্রকৃতি তাঁর কবিতায় রুদ্র ও প্রতিবাদী রূপও ধারণ করে। কালবৈশাখীর ঝড়, তীব্র রোদ কিংবা সমুদ্রের গর্জন হয়ে ওঠে সামাজিক অবিচার ও মানবসৃষ্ট সংকটের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক। ফুল, পাখি, জ্যোৎস্না ও রোদের সৌন্দর্যের মধ্য দিয়ে তিনি নশ্বর জীবনের বিপরীতে এক চিরন্তন সৌন্দর্যবোধের সন্ধান করেন।

মিতভাষিতা ও চিত্রকল্প নির্মাণের দক্ষতা
বিমল গুহের কাব্যশৈলীর অন্যতম প্রধান শক্তি তাঁর মিতভাষিতা। অপ্রয়োজনীয় শব্দ পরিহার করে সংহত ও সুবিন্যস্ত শব্দচয়নের মাধ্যমে তিনি জটিল অনুভূতিকে সহজ অথচ গভীরভাবে প্রকাশ করেন। তাঁর কবিতায় প্রতিবাদ রয়েছে, কিন্তু তা উচ্চকণ্ঠ স্লোগানের মতো নয়; বরং পাঠকের চিন্তা ও বিবেককে নাড়া দেয়।

উপমা, রূপক ও চিত্রকল্প নির্মাণেও তাঁর স্বাতন্ত্র্য লক্ষণীয়। ব্যক্তিগত সম্পর্ক, পারিবারিক বন্ধন, প্রাত্যহিক জীবনের ছোট ছোট স্মৃতি এবং মানুষের সংবেদনশীল অনুভূতিকে তিনি পরম মমতায় কবিতায় ধারণ করেছেন। কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েও তাঁর লেখায় আশাবাদ ও মানবিক মূল্যবোধের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়।

সমকালীন কবি-সমালোচকদের মূল্যায়নে বিমল গুহ
সত্তরের দশকের কবিদের মধ্যে বিমল গুহের অবস্থান ও গুরুত্ব নিয়ে সমকালীন কবি ও সাহিত্য সমালোচকদের মূল্যায়নও তাৎপর্যপূর্ণ। ষাটের দশকের কবি সিকদার আমিনুল হক সত্তরের কবিদের মূল্যায়ন প্রসঙ্গে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, নাসির আহমেদ, ফারুক মাহমুদ, বিমল গুহ, কামাল চৌধুরী, জাহিদ হায়দার, আবিদ আনোয়ারসহ একাধিক কবির গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তাঁর পর্যবেক্ষণে সত্তরের কবিতার বহুমাত্রিকতা ও বিভিন্ন কবির অবদান স্বীকৃতি পেয়েছে।

কবি আল মাহমুদ বিমল গুহের কবিতার নম্র উচ্চারণ, প্রেমের কবিতা রচনার দক্ষতা এবং প্রকৃতিকে ব্যাখ্যা করার ক্ষমতার প্রশংসা করেছেন। তাঁর মতে, বিমলের কবিতায় কবিত্বশক্তির গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণগুলো রয়েছে। প্রেমের মতো দুরূহ বিষয়কে তিনি যে দক্ষতায় কবিতায় রূপ দিয়েছেন, তা আল মাহমুদকে মুগ্ধ করেছে।

ষাটের দশকের কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা বিমল গুহকে ‘নিরন্তর উত্তীর্ণ পঙ্‌ক্তিমালা রচনায় ব্রতী’ কবি হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। অন্যদিকে সত্তরের দশকের কবি আবিদ আজাদ মনে করেন, এই দশকের কবিতার প্রকৃত নির্মাতাদের খোঁজ করতে গেলে বিমল গুহের নাম আলাদাভাবে মনে করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন হবে না।

কবি কামাল চৌধুরী তাঁর কবিতার শুদ্ধাচার, সৌন্দর্যবোধ, উপমা ও চিত্রকল্প নির্মাণের দক্ষতার কথা উল্লেখ করেছেন। কবি আবিদ আনোয়ারের মূল্যায়নেও বিমল গুহ তাঁর প্রজন্মের গুরুত্বপূর্ণ কবিদের একজন। নাসির আহমেদ জানিয়েছেন, দৈনিক বাংলার সাহিত্য বিভাগে কাজ করার সময় তিনি দেখেছেন, সাহিত্য সম্পাদক আহসান হাবীব যেসব তরুণ কবির লেখা আগ্রহের সঙ্গে প্রকাশ করতেন, বিমল গুহ তাঁদের অন্যতম।

এ ছাড়া কথাসাহিত্যিক ও সমালোচক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বিমল গুহের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থের বক্তব্যের নতুনত্ব নিয়ে আলোচনা করেছেন। এসব মূল্যায়ন থেকে বোঝা যায়, সমসাময়িক কবি ও সাহিত্যবোদ্ধাদের কাছে বিমল গুহের কাব্যচর্চা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

নিজস্ব আলোয় উজ্জ্বল এক কবিসত্তা
বিমল গুহের কবিতায় প্রেম, প্রকৃতি, মুক্তিযুদ্ধ, সমাজচেতনা, প্রতিবাদ ও জীবনদর্শন পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তিনি একদিকে ব্যক্তিমানুষের নিঃসঙ্গতা, ভালোবাসা ও বেদনার কবি, অন্যদিকে জাতীয় ইতিহাস, সামাজিক অন্যায় ও মানুষের অধিকারবোধেরও শিল্পিত ভাষ্যকার। তাঁর কাব্যজগতে প্রকৃতি যেমন প্রশান্তির আশ্রয়, তেমনি প্রতিবাদের শক্তিশালী প্রতীক।

সত্তরের দশকের কবিদের সম্মিলিত ধারায় থেকেও নিজস্ব গীতিময়তা, শব্দের সংযম, চিত্রকল্পের দক্ষতা ও গভীর প্রকৃতিচেতনার কারণে তিনি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছেন। রাজপথের উত্তাপ ও হৃদয়ের কোমল অনুভূতির যে সমন্বয় তাঁর কবিতায় দেখা যায়, সেটিই তাঁকে বাংলা কবিতার ভুবনে আলাদা পরিচয় দিয়েছে। লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক, গীতিকার; পরিচালক, বাংলা একাডেমি

সন্ধানী বার্তা/এসএ/জেএন


সম্পর্কিত খবর