জাতীয়

শ্রমিকদের ব্যবহার করে অস্থিরতা সৃষ্টির অভিযোগ সরকারের

শ্রমিক আন্দোলনের নামে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টি কিংবা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করা হলে তা কঠোর হাতে দমন করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, শ্রমিকদের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ড, সহিংসতা এবং সড়ক-মহাসড়ক অবরোধের মতো ঘটনা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। এসব ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সোমবার (২ নভেম্বর) সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন ও শ্রমিক নেতা শিমুল বিশ্বাস।

শ্রমিকদের ব্যবহার করে অস্থিরতা সৃষ্টির অভিযোগ
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গত কয়েকদিন ধরে শ্রমিকদের ব্যবহার করে একটি মহল দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ, আগুন জ্বালানোসহ বিভিন্ন সহিংস কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির অপচেষ্টা চলছে। এসব ঘটনার পেছনে কারা ইন্ধন দিচ্ছে, তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে বলে জানান তিনি। ইতোমধ্যে কয়েকজনকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। তাদের কর্মকাণ্ডের ভিডিও ফুটেজ, অডিও এবং অন্যান্য প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, কিছু শিল্প মালিক এবং শ্রমিক সংগঠনের ব্যানারে থাকা ব্যক্তিরা এসব অস্থিরতার সঙ্গে জড়িত বলে তথ্য পাওয়া গেছে। সাবেক সরকারের রাজনৈতিক পরিচয়ধারী কিছু শিল্প মালিক, যাদের মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীও রয়েছেন, তাদের ভূমিকা সম্পর্কেও সরকারের কাছে তথ্য রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য, প্রকৃত শ্রমিক কিংবা শ্রমিক সংগঠনের নেতারা কখনো নিজেদের কর্মসংস্থান ধ্বংস হোক, এমনটা চাইতে পারেন না। সাম্প্রতিক অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টায় প্রকৃত শ্রমিক ও শ্রমিক নেতারা জড়িত নন বলে সরকার বিশ্বাস করে। তিনি আরও বলেন, যারা ভিন্ন রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য শ্রমিকদের ব্যবহার করে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে, তাদের প্রতিহত করা হবে। সীমান্তের ওপার থেকে কোনো ধরনের ইন্ধন দেওয়া হলেও তা মোকাবিলা করা হবে।

কারখানা বন্ধের তালিকা চেয়েছে সরকার
বৈঠকে গার্মেন্টস মালিকদের সঙ্গে শিল্পকারখানা চালু রাখা এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সরকারের সহযোগিতা চাওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। মালিকরা সরকারকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। উদ্দেশ্যমূলকভাবে যেসব শিল্প মালিক কারখানা বন্ধ করেছেন, তাদের তালিকা দিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছেন—এমন শ্রমিক নেতা ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর নামও চাওয়া হয়েছে। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ফোকাল পয়েন্ট নির্ধারণ করা হয়েছে। পুলিশ বিভাগ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও যোগাযোগের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি ঠিক করা হয়েছে। মালিক সংগঠনগুলোও নিজেদের ফোকাল পয়েন্ট নির্ধারণ করেছে।

শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি নজরদারিতে কন্ট্রোল রুম
শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং দ্রুত তথ্য আদান-প্রদানের জন্য সরকারের ‘সুরক্ষা’ অ্যাপ ব্যবহারের কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এ লক্ষ্যে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে একটি কন্ট্রোল রুম স্থাপনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে।

কারখানা বন্ধের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আর্থিক সংকট, রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়া কিংবা নিজস্ব কারণে কিছু কারখানা আগে থেকেই বন্ধ রয়েছে। সেগুলো ভিন্ন বিষয়। তবে সাম্প্রতিক অস্থিরতার কারণে গাজীপুর ও কালিয়াকৈর এলাকায় কিছু কারখানা গতকাল এক দিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। সেগুলো সোমবার চালু হয়েছে। এখনো যেসব কারখানা চালু হয়নি, সেগুলোকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে সরকার। কোনো শিল্পকারখানা বন্ধ হোক, সরকার তা চায় না উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, কারখানার সঙ্গে শ্রমিকদের রুটি-রুজির বিষয় জড়িত। তাই মালিকদের শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানানো হয়েছে।

মজুরি বোর্ডের প্রথম সভা হতে পারে আজ
শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, মজুরি বোর্ড গতকাল গঠিত হয়েছে। সোমবারই বোর্ডের প্রথম সভা হতে পারে, অথবা অল্প সময়ের মধ্যে আলোচনা শুরু হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ ও ঘোষণা করা সম্ভব হবে বলে সরকার আশাবাদী। আগামী ডিসেম্বর মাসে বর্তমান মজুরি কাঠামোর তিন বছর পূর্ণ হবে।

মন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী শ্রমিকদের স্বার্থ সংরক্ষণ, জীবনমানের উন্নয়ন এবং সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সহানুভূতির সঙ্গে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের পরামর্শ দিয়েছেন। মালিক ও শ্রমিক উভয় পক্ষের সঙ্গে আলোচনা এবং বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে মজুরি নির্ধারণ করা হবে।

ডিসেম্বর ঘিরে অস্থিরতার আশঙ্কা নিয়ে বক্তব্য
গত ১৮ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সম্ভাব্য অস্থিরতা নিয়ে শ্রম মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সরকারের প্রস্তুতি ছিল। শ্রমমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা করে শান্তিপূর্ণভাবে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছেন। শ্রমিক প্রতিনিধিদের নাম আগে পাওয়া গেলে আরও আগেই মজুরি বোর্ড গঠন করা সম্ভব হতো।

ডিসেম্বর মাস ঘিরে মানুষের মধ্যে ভীতি তৈরির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ডিসেম্বর বিজয়ের মাস। এ মাসে বিজয় দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি থাকবে। কোনো পলাতক আসামি ডিসেম্বর বা জানুয়ারিকে কেন্দ্র করে কোনো কর্মকাণ্ড চালালে সে বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করা উচিত। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি, পতিত ফ্যাসিবাদী শক্তি ও মাফিয়া চক্রের সদস্যরা যেখানেই থাকুক, তাদের দেশে ফিরে আসা উচিত। দেশে ফিরলে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে এবং আদালতের রায় অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে প্রচারণা চালিয়ে পলাতক নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করার চেষ্টা সফল হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

শ্রমিকদের কর্মস্থলে ফেরার আহ্বান
শ্রমিকদের কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শিল্প মালিকদের কারখানা চালু রাখতে হবে এবং শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে তাদের সমস্যা সমাধান করতে হবে। তবে শ্রমিক আন্দোলনের কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে সরকার কঠোর হাতে তা দমন করবে বলে আবারও সতর্ক করেন তিনি।

সন্ধানী বার্তা/এএইচ/এমএসআইপি


সম্পর্কিত খবর