জাতীয়

চাল-ডাল-আটার দাম বাড়তি, চাপে সাধারণ মানুষ

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার মধ্যে রাজধানীর বাজারে চাল, ডাল, আটা ও ময়দার দাম বেড়েছে। গত দুই সপ্তাহে বিভিন্ন ধরনের চালের দাম কেজিতে ২ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। কোনো কোনো ডালের দাম বেড়েছে কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা। নিত্যপণ্যের বাড়তি দামে আগে থেকেই চাপে থাকা সাধারণ মানুষের সংসার খরচ আরও বেড়েছে।

সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাজধানীর কয়েকটি খুচরা বাজার ঘুরে দেখা যায়, মানভেদে সরু চাল নাজিরশাইল ও মিনিকেট প্রতি কেজি ৭০ থেকে ৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহ আগেও এসব চালের দাম ছিল ৬৮ থেকে ৮৫ টাকা।

মাঝারি মানের পাইজাম, ব্রি-২৮ ও ব্রি-২৯ চালের দাম কেজিতে ৩ টাকা বেড়ে ৫৮ থেকে ৬৫ টাকায় উঠেছে। মোটা চায়না ইরি, গুটি ও স্বর্ণা চালের দামও কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা বেড়ে ৫০ থেকে ৫৫ টাকা হয়েছে।

তবে খোলা পোলাও চালের দাম কেজিতে ৩০ টাকা কমে ১৯০ টাকায় নেমেছে। অন্যদিকে, প্যাকেটজাত পোলাও চাল কোম্পানিভেদে ২২০ থেকে ২৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

ব্যবসায়ীরা জানান, দুই সপ্তাহ আগে চালের দাম এক দফা বেড়েছে। এরপর থেকে দাম আর কমেনি। সাধারণত নতুন চাল বাজারে আসার পর পুরোনো চালের দাম কেজিতে ১ থেকে ২ টাকা বাড়ে। এবার নতুন চাল বাজারে আসার আগেই পুরোনো চালের দাম বেড়েছে। আগামী ডিসেম্বর থেকে খুচরা বাজারে নতুন চাল বিক্রি শুরু হতে পারে।

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের একই সময়ে মোটা চালের দাম ছিল কেজিপ্রতি ৫৫ থেকে ৬৫ টাকা। মানভেদে সরু চালের দাম ছিল ৭৫ থেকে ৮৫ টাকা।

চালের পাশাপাশি বেড়েছে বিভিন্ন ধরনের ডালের দাম। বর্তমানে মোটা মসুর ডাল প্রতি কেজি ৯৫ থেকে ১১০ টাকা এবং ভালো মানের মসুর ডাল ১৫০ থেকে ১৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মানভেদে মুগ ডালের দাম ১২০ থেকে ১৭০ টাকা। গত এক সপ্তাহে এ ডালের দাম কেজিতে ১০ টাকা বেড়েছে।

বুটের ডালের দাম কেজিতে ৩০ টাকা বেড়ে ১২০ টাকায় উঠেছে। আগে এ ডাল বিক্রি হতো ৯০ টাকায়। ছোলার ডালের দাম কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে ১১০ টাকা হয়েছে। ডাবলি ও অ্যাংকর ডালের দাম ১০ টাকা বেড়ে ৬৫ টাকায় দাঁড়িয়েছে। তবে মটর ও মাসকলাই ডালের দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। বর্তমানে মটর ডাল ১২০ টাকা এবং মাসকলাই ডাল ১৯০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

আটা ও ময়দার বাজারেও দাম বাড়তি। বর্তমানে খোলা আটা প্রতি কেজি ৪৮ থেকে ৫০ টাকা এবং প্যাকেটজাত আটা ৬৫ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

টিসিবির হিসাবে, গত এক মাসে খোলা আটার দাম ২ শতাংশ এবং প্যাকেটজাত আটার দাম ৮ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে খোলা ময়দার দাম ৩ দশমিক ৭০ শতাংশ এবং প্যাকেটজাত ময়দার দাম ৬ শতাংশ বেড়েছে। বর্তমানে খোলা ময়দা প্রতি কেজি ৭০ টাকা এবং প্যাকেটজাত ময়দা ৮৫ থেকে ৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

গত সেপ্টেম্বরে ডিজেল, পেট্রল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হয়। এর পর থেকে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তাঁদের দাবি, পরিবহন খরচের পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সমস্যাও পণ্যের দাম বাড়ার পেছনে ভূমিকা রাখছে।

পুরান ঢাকার বাসিন্দা মো. তুহিন ইসলাম বলেন, নিত্যপণ্যের দাম বারবার বাড়ায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রায় প্রতি মাসেই কোনো না কোনো পণ্যের দাম বাড়ছে। চাল-ডালের দাম বেড়ে যাওয়ায় তিনি বাজারের পরিমাণও কমিয়ে দিয়েছেন।

আদনান অ্যান্ড আরাফাত ট্রেডার্সের মালিক মো. ফারুক হোসেন বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন ভাড়া বেড়েছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সমস্যাও চালের দাম বৃদ্ধির একটি কারণ হতে পারে। তাঁর মতে, সরকার নতুন পে-স্কেল ঘোষণার পরও নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে।

তিনি আরও বলেন, গত কয়েক দিনে খোলা পোলাও চালের দাম কেজিতে ২০ টাকা কমেছে। সরকার রপ্তানি বন্ধ করায় দাম কমেছে বলে তাঁর ধারণা। তবে প্যাকেটজাত পোলাও চালের দাম কোম্পানিগুলো এখনো কমায়নি। পরিবহন খরচ বাড়ায় আমদানি কিছুটা কমে থাকতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

রায়সাহেব বাজারের আদর জেনারেল স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. মোহন আহমেদ বলেন, প্রায় এক মাস ধরে মুদি পণ্যের দাম বাড়তি। সম্প্রতি চালের দাম কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা এবং কোনো কোনো ডালের দাম ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। খোলা ও প্যাকেটজাত আটা-ময়দার দামও বেড়েছে।

ধূপখোলা মাঠ বাজারের মোহাম্মদ হোসেন রাইসের ব্যবস্থাপক মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, প্রায় সব ধরনের চালের দাম কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা বেড়েছে। খোলা পোলাও চালের দাম কমলেও প্যাকেটজাত চালের দাম আগের মতোই রয়েছে। নতুন চাল বাজারে আসার আগেই পুরোনো চালের দাম বেড়ে যাওয়াকে তিনি অস্বাভাবিক বলে মনে করেন।

দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের ব্যয় সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, গত সেপ্টেম্বরে ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ।

এ পরিস্থিতিতে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সরকারি সহায়তা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের মতে, টিসিবির পণ্য বিক্রি ও খোলা বাজারে পণ্য বিক্রির কার্যক্রম থাকলেও চাহিদার তুলনায় তা পর্যাপ্ত নয়। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েও অনেকে পণ্য পান না।

তাঁরা মনে করেন, শুধু বাজারে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করলেই হবে না; পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি ও রেশনিংয়ের আওতা বাড়ানো প্রয়োজন। তা না হলে নিত্যপণ্যের বাড়তি দামের চাপে সাধারণ পরিবারগুলোর দৈনন্দিন ব্যয় আরও সংকুচিত হয়ে পড়বে।

সন্ধানী বার্তা/এএএন/এমএসআইপি 


সম্পর্কিত খবর