রংপুরের কাউনিয়ায় আমন ধানক্ষেতে ক্ষতিকর পোকামাকড় দমনে কীটনাশকের বিকল্প হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী পার্চিং পদ্ধতি। জমিতে গাছের ডাল, বাঁশের কঞ্চি কিংবা ধইঞ্চা গাছ স্থাপন করে পোকাখেকো পাখিদের বসার ব্যবস্থা করছেন কৃষকেরা। এসব পাখি ধানের ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে ফসল রক্ষায় ভূমিকা রাখছে। এতে কীটনাশকের ব্যবহার ও উৎপাদন খরচ কমার পাশাপাশি পরিবেশের ওপরও ক্ষতিকর প্রভাব কমছে। কৃষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, কাউনিয়ায় পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহারের ফলে কীটনাশক বা বালাইনাশক কেনার খরচ প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। ফলে কম খরচে ধান চাষের সুযোগ তৈরি হওয়ায় এ পদ্ধতির প্রতি আগ্রহ বাড়ছে কৃষকদের।
কাউনিয়ার কৃষকেরা মূলত দুই ধরনের পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহার করছেন—ডেড পার্চিং ও লাইভ পার্চিং। ডেড পার্চিং পদ্ধতিতে ধানক্ষেতের আইল বা জমির বিভিন্ন স্থানে গাছের ডাল, বাঁশের কঞ্চি কিংবা খুঁটি পুঁতে দেওয়া হয়। অন্যদিকে, লাইভ পার্চিংয়ে ধইঞ্চা বা অন্য কোনো জীবিত গাছ লাগিয়ে পাখিদের বসার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা হয়। এসব ডাল ও গাছের ওপর বসে ফিঙে, শালিক, বুলবুলি ও দোয়েলসহ বিভিন্ন পোকাখেকো পাখি ধানক্ষেতের ক্ষতিকর পোকামাকড় ধরে খায়। এতে জমিতে রাসায়নিক কীটনাশকের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হয়।
আমন ধানের সবুজ মাঠের মধ্যে কোথাও ধানের শিষ বের হয়েছে, আবার কোথাও ধান পাকতে শুরু করেছে। দিগন্তজোড়া ধানক্ষেতের মাঝে চোখে পড়ে ধইঞ্চা গাছ, গাছের ডাল ও বাঁশের কঞ্চি। সেগুলোর ওপর বসে পাখিদের পোকামাকড় ধরতে দেখা যায়। কৃষকেরা জানান, পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহারে একদিকে যেমন কীটনাশক কেনার খরচ কমছে, অন্যদিকে পরিবেশও তুলনামূলকভাবে দূষণমুক্ত থাকছে। পাখির বিষ্ঠা জমিতে প্রাকৃতিক জৈব উপাদান হিসেবে যোগ হয়ে মাটির উর্বরতা বাড়াতেও সহায়তা করতে পারে।
নিজপাড়া গ্রামের কৃষক নাছির উদ্দিন বলেন, পোকার আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষায় পার্চিং পদ্ধতি বেশ কার্যকর। এটি পরিবেশবান্ধব এবং খরচও অনেক কম। এ কারণে তারা কীটনাশকের পরিবর্তে এ পদ্ধতি ব্যবহার করছেন।গদাই গ্রামের ধানচাষি শাহজাহান মণ্ডল বলেন, এবার তাদের জমির ধান বেশ সবুজ ও সতেজ হয়েছে। পুরো ক্ষেতেই পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন তিনি। আর কিছুদিন পর সোনালি ধান ঘরে তুলতে পারবেন বলে আশা করছেন।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আমন ধানের ক্ষতিকর পোকামাকড়ের মধ্যে রয়েছে মাজরা পোকা, পাতা মোড়ানো পোকা, চুঙ্গি পোকা ও লেদা পোকার মথ। পার্চিংয়ের ওপর বসা পাখিরা এসব পোকার বিভিন্ন পর্যায়ের কীট ও কীড়া ধরে খায়। ফলে পোকামাকড়ের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং তাদের বংশবিস্তার কমাতে এ পদ্ধতি সহায়তা করতে পারে। কৃষি বিভাগের মতে, পার্চিং পদ্ধতির অন্যতম সুবিধা হলো—এতে বাড়তি রাসায়নিক উপকরণ কেনার প্রয়োজন হয় না। সহজলভ্য গাছের ডাল বা বাঁশের কঞ্চি দিয়েই পাখির বসার ব্যবস্থা করা যায়। ফলে বিশেষ করে সীমিত পুঁজির কৃষকেরা কম খরচে এ পদ্ধতি প্রয়োগ করতে পারেন।
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন জানান, কৃষি বিভাগের পরামর্শে আমন মৌসুমের শুরুতেই কৃষকেরা এ প্রাকৃতিক পদ্ধতি প্রয়োগ করছেন। ধানের চারা রোপণের ২০ দিনের মধ্যে জমিতে পার্চিং স্থাপন করা প্রয়োজন। পোকার আক্রমণ শুরু হওয়ার আগেই এটি স্থাপন করলে পোকা দমনে উপকার পাওয়া যায়। তিনি জানান, প্রতি বিঘা বা ৩৩ শতক আমন জমিতে অন্তত পাঁচ থেকে ছয়টি গাছের ডাল কিংবা বাঁশের কঞ্চি পুঁতে দেওয়া উচিত। এগুলোর উচ্চতা ধানগাছের সর্বোচ্চ উচ্চতার চেয়ে কমপক্ষে এক ফুট বেশি হওয়া দরকার। এতে পাখিরা সহজে বসতে পারে এবং ধানক্ষেতের ওপর নজর রাখতে পারে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. সালাহউদ্দিন জানান, চলতি আমন মৌসুমে কাউনিয়ায় ১১ হাজার ৪৭০ হেক্টর জমিতে চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর বিপরীতে আবাদ হয়েছে ১১ হাজার ৪৬০ হেক্টর জমিতে। এ মৌসুমে ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩৭ হাজার ৩৫৫ টন।
তিনি বলেন, চলতি বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আমন ধানের মাঠের অবস্থা বেশ ভালো। এতে কৃষকদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের অধিকাংশ কৃষক এবার পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। প্রশিক্ষণ ও বিভিন্ন পরামর্শের মাধ্যমে কৃষকদের এ পদ্ধতির উপকারিতা সম্পর্কে জানানো হচ্ছে। ফলে চলতি মৌসুমে আগের তুলনায় বেশি জমিতে পার্চিং ব্যবহার করা হয়েছে। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, কম খরচে প্রাকৃতিকভাবে ক্ষতিকর পোকা দমন, কীটনাশকের ব্যবহার কমানো এবং পরিবেশ রক্ষায় পার্চিং পদ্ধতি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তবে পোকামাকড়ের আক্রমণ ও ফসলের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ নেওয়াও জরুরি।
সন্ধানী বার্তা/ডিএইচ/এমএসআইপি