বিবিধ

গোখাদ্যের দাম বাড়ায় দিশেহারা নবাবগঞ্জের খামারিরা

দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলায় গোখাদ্যের সংকট ও মূল্যবৃদ্ধিতে বিপাকে পড়েছেন গরু পালনকারী কৃষক ও খামারিরা। খড়, ভুসি ও সবুজ ঘাস কিনতে আগের তুলনায় বেশি টাকা খরচ করতে হচ্ছে তাদের। এতে বেড়ে গেছে গরু পালনের ব্যয়, কমে আসছে লাভের পরিমাণ। বিশেষ করে অল্প পুঁজি নিয়ে গরু পালন করা প্রান্তিক খামারিরা পড়েছেন বেশি চাপে। খামারিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে নতুন ধানের প্রতিটি আঁটি বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ৩০ টাকায়। ভুসির বস্তার দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার ৫০০ টাকা। অন্যদিকে, নেপিয়ার ঘাসের প্রতিটি চারা কিনতে হচ্ছে ৪৫ থেকে ৫০ টাকায়। বাড়তি দামে এসব খাদ্য কিনে দুধ উৎপাদন ও গরু মোটাতাজাকরণে লাভের হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা।

নবাবগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে কৃষিকাজের পাশাপাশি গবাদিপশু পালন বহু পরিবারের আয়ের অন্যতম উৎস। কেউ দুধ বিক্রি করে সংসার চালান, আবার কেউ গরু মোটাতাজা করে বিক্রির মাধ্যমে বাড়তি আয় করেন। কিন্তু গোখাদ্যের দাম বাড়তে থাকায় এসব খামারের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, পশুখাদ্যের দাম যে হারে বাড়ছে, সে অনুপাতে দুধের বিক্রিমূল্য কিংবা গরুর বাজারদর বাড়ছে না। ফলে খামারিদের লাভ কমে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অনেকেই গরু পালনে আগ্রহ হারাতে পারেন। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নবাবগঞ্জে ৯৫টি দুগ্ধ খামার, ৮৫টি ছাগলের খামার ও ৩৮টি ভেড়ার খামার রয়েছে। এসব খামারের সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে আয় ও কর্মসংস্থানের বিষয়টি জড়িত।

উপজেলার দাউদপুর ইউনিয়নের কুন্দন গ্রামের ক্ষুদ্র খামারি সাহেব আলী বলেন, গরুর খাবারের ব্যবস্থা করতেই এখন তাকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। আগে যে টাকায় কয়েক দিনের খাবার কেনা যেত, এখন সেই টাকায় অনেক কম খাবার পাওয়া যায়। গরুকে না খাইয়ে রাখার সুযোগ নেই। ফলে সংসারের অন্যান্য খরচের পাশাপাশি পশুখাদ্যের টাকা জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। সাহেব আলী জানান, বর্তমানে নতুন ধানের প্রতিটি আঁটি ২০ থেকে ৩০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। এতে গরু পালনের দৈনন্দিন ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। দুধ উৎপাদনকারী খামারি জাহাঙ্গীর হোসেন জুয়েল বলেন, গরুর খাবারের খরচ বেড়ে গেলে দুধ বিক্রি করে তেমন লাভ থাকে না। নিয়মিত খাবার দিতে না পারলে দুধ উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে বেশি দাম দিয়েই খাবার কিনতে হচ্ছে।

তিনি জানান, আগে ভুসির বস্তা ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকায় পাওয়া যেত। বর্তমানে তা প্রায় ২ হাজার ৫০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। পাশাপাশি নেপিয়ার ঘাসের প্রতিটি চারার দাম পড়ছে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা। গরুর খাবারের ব্যয় শুধু খড় ও ভুসি কেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে খৈল, সবুজ ঘাস, শ্রমিকের মজুরি, চিকিৎসা ও পরিচর্যার খরচও যুক্ত রয়েছে। বাড়তি ব্যয় সামলাতে গিয়ে কোনো খামারি খাবারের পরিমাণ বা মান কমিয়ে দিলে গবাদিপশুর পুষ্টিতে ঘাটতি দেখা দিতে পারে। এতে গরুর ওজন বৃদ্ধি, দুধ উৎপাদন ও প্রজননক্ষমতা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি পুষ্টির ঘাটতি পশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতাকেও দুর্বল করতে পারে।

নবাবগঞ্জ উপজেলা ভেটেরিনারি সার্জন ডা. মানিক রহমান বলেন, খাদ্যের ঘাটতি হলে গরুর ওজন, দুধ উৎপাদন ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যেতে পারে। তাই খামারিদের সুষম খাদ্য ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি নিয়মিত পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো জরুরি। খাদ্যের দাম কিংবা সরবরাহ নিয়ে সমস্যা হলে প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পরামর্শ নেওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. বিপুল কুমার চক্রবর্তী বলেন, গবাদিপশুর জন্য শুধু খড় দিলেই হবে না। এর সঙ্গে পর্যাপ্ত সবুজ ঘাস, পরিষ্কার পানি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সুষম দানাদার খাবার দিতে হবে। খামারিরা বাড়ির আশপাশে নেপিয়ারসহ উপযোগী ঘাস চাষ করতে পারেন। পাশাপাশি মৌসুমে খড় সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করলে সংকটের সময় পশুখাদ্যের চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, গোখাদ্যের বাজারদর ও সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি খামারিদের ঘাস চাষে প্রশিক্ষণ, উন্নত পদ্ধতিতে খড় সংরক্ষণ এবং সাশ্রয়ী পশুখাদ্য উৎপাদনে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। ক্ষুদ্র খামারিদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও কারিগরি সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন ব্যয়ের চাপ কমানো সম্ভব হতে পারে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে গবাদিপশু পালন কৃষকের সম্পদ, পরিবারের বাড়তি আয়ের উৎস এবং অনেকের জীবিকার অবলম্বন। তাই গোখাদ্যের সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাব পড়তে পারে দুধ উৎপাদন ও স্থানীয় খামার ব্যবস্থায়। খামারিদের প্রত্যাশা, সাশ্রয়ী দামে পশুখাদ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।

সন্ধানী বার্তা/ডিএইচ/এমএসআইপি


সম্পর্কিত খবর