বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গতি ফেরার প্রত্যাশার বিপরীতে দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। শিল্প উৎপাদনে নতুন ক্রয়াদেশ কমা, কাঁচামাল ও পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট এবং ভোক্তাদের সীমিত ক্রয়ক্ষমতা ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। এর প্রভাব পড়েছে উৎপাদন, নির্মাণ ও সেবা খাতে। সেপ্টেম্বরে এ তিন খাতের দুর্বলতায় সামগ্রিক অর্থনীতির সম্প্রসারণের গতি কমে সংকোচনের দিকে গেছে। বিপরীতে কৃষি খাত সম্প্রসারণে থাকলেও সেখানেও প্রবৃদ্ধির গতি কিছুটা শ্লথ হয়েছে।
৫০ পয়েন্টের নিচে অর্থনীতির সূচক
গত সেপ্টেম্বরে দেশের পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (পিএমআই) কমে ৪৮.৬ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে, যা আগস্টে ছিল ৪৯.৯। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে সূচকটি কমেছে ১.৩ পয়েন্ট। পিএমআইয়ের মান ৫০-এর ওপরে থাকলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্প্রসারণ এবং নিচে থাকলে সংকোচন নির্দেশ করে। সেই হিসাবে, সর্বশেষ সূচক দেশের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে দুর্বলতারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
- সেপ্টেম্বরে পিএমআই নেমে ৪৮.৬
- উৎপাদন ও নির্মাণে অবনতি
- কৃষিই একমাত্র ভরসা
ব্যবসায়ীদের মনোভাব ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এ সূচক অর্থনীতির স্বল্পমেয়াদি প্রবণতা বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ যৌথভাবে সূচকটি প্রণয়ন করে। কৃষি, উৎপাদন, নির্মাণ ও সেবাসহ সংশ্লিষ্ট খাতের ৪০০টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীদের মতামত এতে প্রতিফলিত হয়।
উৎপাদনে দুর্বলতা, নির্মাণেও নতুন সংকোচন
অর্থনীতির সামগ্রিক সূচক কমে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে উৎপাদন খাত। সেপ্টেম্বরে এ খাতের পিএমআই ২.৬ পয়েন্ট কমে ৪৪.৮-এ নেমেছে। আগস্টে সূচকটি ছিল ৪৭.৪। নতুন ক্রয়াদেশ, উৎপাদন, কাঁচামালের মজুদ, প্রস্তুত পণ্যের মজুদ ও আমদানিতে দুর্বলতা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডকে সীমিত করেছে।
উৎপাদন খাতের এই পরিস্থিতি শুধু কারখানার কার্যক্রমেই নয়, সরবরাহব্যবস্থা, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের সম্ভাবনাতেও চাপ তৈরি করতে পারে। নতুন অর্ডার কমলে প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হয়। একই সঙ্গে ব্যয় বেড়ে গেলে মুনাফার মার্জিন ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়ে। নির্মাণ খাতেও পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরে এ খাতের পিএমআই ৩.৮ পয়েন্ট কমে ৪৮.৫-এ দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ খাতটি আবার সংকোচনের পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। নির্মাণসংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে দুর্বলতা অব্যাহত থাকলে সংশ্লিষ্ট শিল্প, উপকরণ সরবরাহকারী ও শ্রমবাজারেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সেবা খাতে স্থবিরতা, কৃষিতে স্বস্তি
সেবা খাত টানা দ্বিতীয় মাসের মতো সংকোচনের মধ্যে রয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে এ খাতের পিএমআই কমে ৪৯ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। নতুন ব্যবসা ও সামগ্রিক কার্যক্রম সংকুচিত হলেও কর্মসংস্থানে সংকোচনের গতি কিছুটা কমেছে। এ চিত্র থেকে বোঝা যায়, ব্যবসায়িক কার্যক্রমে দুর্বলতা কাটেনি, যদিও কর্মসংস্থানের অবনতিতে কিছুটা বিরতি আসার লক্ষণ রয়েছে।
অন্যদিকে কৃষি খাত টানা ১৩ মাস ধরে সম্প্রসারণের ধারায় রয়েছে। তবে সেপ্টেম্বরে এ খাতের পিএমআই ১.৩ পয়েন্ট কমে ৫৫.২ হয়েছে। নতুন ব্যবসা, কার্যক্রম ও কর্মসংস্থানের সম্প্রসারণের গতিও আগের মাসের তুলনায় কমেছে। ফলে কৃষি খাত অর্থনীতিকে কিছুটা স্থিতিশীলতা দিলেও এককভাবে অন্য খাতগুলোর দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার নিশ্চয়তা দিতে পারছে না।
ব্যয় ও জ্বালানি সংকটে ব্যবসায়িক আস্থা
পিএমআই জরিপে অংশ নেওয়া ব্যবসায়ীরা পাঁচটি প্রধান উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। এগুলো হলো জ্বালানি তেলের বারবার মূল্যবৃদ্ধি, কাঁচামাল ও পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি, ভোক্তাদের দুর্বল ক্রয়ক্ষমতা, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ঘাটতি এবং ব্যাংকঋণপ্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা। এসব বাধা উৎপাদন ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যবসা সম্প্রসারণ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকেও অনিশ্চিত করে তুলছে।
ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে পণ্যের দাম বাড়ানো সম্ভব না হলে প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা কমে যায়। আবার দাম বাড়ালে সীমিত ক্রয়ক্ষমতার ভোক্তাদের কাছ থেকে চাহিদা আরও কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। ফলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো একদিকে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে বিক্রি ধরে রাখার দ্বৈত চাপে পড়ছে।
পুনরুদ্ধারে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজের মতে, উৎপাদন, নির্মাণ ও সেবা খাতের দুর্বলতায় দেশের অর্থনীতি এখনো চাপে রয়েছে। তবে কৃষির সম্প্রসারণ কিছুটা স্থিতিশীলতা বজায় রেখেছে। সব খাতেই সামান্য ইতিবাচক প্রত্যাশা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা তৈরি করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর মূল্যায়নে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরাতে অভ্যন্তরীণ ও রপ্তানি চাহিদা বাড়ানো, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা কমানো এবং ব্যয় বৃদ্ধির চাপ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
কিছু প্রতিষ্ঠান নিশ্চিত ক্রয়াদেশ, নির্ভরযোগ্য ক্রেতা এবং শীতকাল ও আসন্ন ব্যবসায়িক মৌসুমে চাহিদা বৃদ্ধির প্রত্যাশায় আশাবাদী। তবে সেই প্রত্যাশা বাস্তব অগ্রগতিতে রূপ নিতে হলে উৎপাদন ব্যয় ও সরবরাহসংক্রান্ত বাধা কমানোর পাশাপাশি বাজারে চাহিদা জোরদার করতে হবে। অন্যথায় কৃষির ইতিবাচক অবদান সত্ত্বেও অর্থনীতির সামগ্রিক পুনরুদ্ধার দীর্ঘায়িত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।
সন্ধানী বার্তা/আরআই/এমকে