বিনোদন

পড়াশোনা নয়, প্রতিভা-পরিশ্রমেই আলিয়ার সাম্রাজ্য

বলিউডে প্রতিষ্ঠা পেতে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই শেষ কথা নয়—নিজের ক্যারিয়ার দিয়ে সেই কথাই যেন বারবার প্রমাণ করেছেন আলিয়া ভাট। পড়াশোনা শেষ করে প্রচলিত পথে এগোনোর বদলে অল্প বয়সেই অভিনয়কে পেশা হিসেবে বেছে নেন তিনি। মাত্র ১৯ বছর বয়সে করণ জোহরের ‘স্টুডেন্ট অব দ্য ইয়ার’ দিয়ে বড় পর্দায় অভিষেক; এরপর এক দশকের কিছু বেশি সময়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ভারতের অন্যতম আলোচিত অভিনেত্রী হিসেবে।

তবে আলিয়ার গল্পটা শুধু তারকা পরিবারের মেয়ে থেকে নায়িকা হয়ে ওঠার গল্প নয়। বরং গ্ল্যামার, পারিবারিক পরিচয় ও সুযোগের বাইরে নিজের অভিনয়ক্ষমতা দিয়ে জায়গা করে নেওয়ার গল্পও এটি। ‘হাইওয়ে’, ‘উড়তা পাঞ্জাব’, ‘রাজি’, ‘গলি বয়’, ‘গাঙ্গুবাই কাঠিয়াওয়াড়ি’ কিংবা ‘রকি অউর রানি কি প্রেম কাহানি’—বিভিন্ন ঘরানার চরিত্রে নিজেকে ভেঙে নতুন করে হাজির করেছেন তিনি।

১৯ বছরেই শুরু, এরপর বদলে গেল পথ

২০১২ সালে মুক্তি পায় ‘স্টুডেন্ট অব দ্য ইয়ার’। সিদ্ধার্থ মালহোত্রা ও বরুণ ধাওয়ানের সঙ্গে অভিনয় করা সেই ছবিতে আলিয়া ছিলেন একেবারেই নতুন মুখ। কিন্তু অভিষেকের পর খুব বেশি সময় নেননি নিজেকে প্রমাণ করতে।

‘হাইওয়ে’তে ভিন্নধর্মী চরিত্রে অভিনয় করে সমালোচকদের প্রশংসা কুড়ান তিনি। এরপর ‘টু স্টেটস’, ‘হাম্পটি শর্মা কি দুলহানিয়া’, ‘কাপুর অ্যান্ড সন্স’, ‘ডিয়ার জিন্দেগি’, ‘উড়তা পাঞ্জাব’—একটির পর একটি ছবিতে চরিত্র বাছাইয়ের ক্ষেত্রে নিজের আলাদা স্বাক্ষর তৈরি করেন।

২০১৬ সালের ‘উড়তা পাঞ্জাব’-এর জন্য ফিল্মফেয়ারে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পাওয়ার পর তার অভিনয় দক্ষতা নিয়ে আর সংশয়ের খুব একটা জায়গা থাকেনি। পরে ‘রাজি’, ‘গলি বয়’ ও ‘গাঙ্গুবাই কাঠিয়াওয়াড়ি’র মতো সিনেমায় পুরস্কারজয়ী পারফরম্যান্স তার অবস্থান আরও শক্ত করে। ফিল্মফেয়ারের হিসাবে এখন পর্যন্ত আলিয়ার ছয়টি জয় রয়েছে, যার মধ্যে ‘হাইওয়ে’র জন্য ক্রিটিকস অ্যাওয়ার্ডও রয়েছে।

‘গাঙ্গুবাই’ থেকে ‘রানি’—চরিত্র বদলেছে, বেড়েছে স্বীকৃতি

সঞ্জয় লীলা বানসালির ‘গাঙ্গুবাই কাঠিয়াওয়াড়ি’ আলিয়ার ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। গঙ্গা থেকে গাঙ্গুবাই হয়ে ওঠার জটিল চরিত্রে তার অভিনয় দর্শক-সমালোচক উভয়ের নজর কাড়ে। এই ছবির জন্য ২০২৩ সালের ফিল্মফেয়ারে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কারও পান তিনি।

এর পর ‘রকি অউর রানি কি প্রেম কাহানি’তে একেবারে ভিন্ন মেজাজের চরিত্রে দেখা যায় তাকে। বাঙালি সাংবাদিক রানি চ্যাটার্জির চরিত্রে অভিনয়ের জন্য ২০২৪ সালের ফিল্মফেয়ারে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পান আলিয়া।

এভাবেই ক্যারিয়ারের প্রতিটি পর্যায়ে নিজেকে একই ছাঁচে আটকে না রেখে চরিত্রের সঙ্গে বদলে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি।

অভিনেত্রী থেকে প্রযোজক

আলিয়ার সাফল্যের গল্প এখন আর শুধু অভিনয়ে সীমাবদ্ধ নেই। সময়ের সঙ্গে তিনি প্রযোজনাতেও পা রেখেছেন। ‘ইটারনাল সানশাইন প্রোডাকশনস’ নামের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান গড়ে গল্প বলার অন্য দিকেও নিজের উপস্থিতি তৈরি করেছেন।

‘ডার্লিংস’ ও ‘জিগরা’র মতো প্রকল্পে প্রযোজক হিসেবেও যুক্ত হয়েছেন তিনি। অর্থাৎ ক্যামেরার সামনে অভিনয়ের পাশাপাশি ক্যামেরার পেছনের সৃজনশীল সিদ্ধান্তেও নিজের জায়গা তৈরি করছেন আলিয়া।

ব্যবসায়ও বাড়ছে সাম্রাজ্য

আলিয়ার পরিচয় এখন শুধু বলিউড অভিনেত্রী হিসেবে নয়। ব্যবসায়িক ক্ষেত্রেও ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়েছে তার পরিধি। শিশুদের পোশাক ও লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড ‘Ed-a-Mamma’র সঙ্গে তার উদ্যোক্তা হিসেবে সম্পৃক্ততা রয়েছে। পাশাপাশি Phool.co-তেও তার ইক্যুইটি অংশীদারিত্ব রয়েছে বলে ফর্চুন ইন্ডিয়ার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ফ্যাশন দুনিয়াতেও তার প্রভাব ক্রমেই আন্তর্জাতিক হয়েছে। তিনি গুচির প্রথম ভারতীয় গ্লোবাল অ্যাম্বাসেডর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৬ সালে ফর্চুন ইন্ডিয়ার ‘Most Powerful Women’ তালিকাতেও জায়গা করে নিয়েছেন আলিয়া।

পরিবারও সিনেমার, কিন্তু পরিচয় নিজের

আলিয়ার জন্মই হয়েছে চলচ্চিত্র-ঘনিষ্ঠ পরিবারে। বাবা মহেশ ভাট পরিচালক ও প্রযোজক, মা সোনি রাজদান অভিনেত্রী। বোন পূজা ভাটও অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত। পরে স্বামী হিসেবে জীবনে এসেছেন আরেক তারকা রণবীর কাপুর।

ফলে বলিউডে প্রবেশের দরজা তার জন্য তুলনামূলকভাবে পরিচিত ছিল—এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু সেই দরজা দিয়ে ঢুকে দীর্ঘদিন টিকে থাকা এবং শীর্ষ সারির অভিনেত্রী হয়ে ওঠা সম্পূর্ণ ভিন্ন চ্যালেঞ্জ। আলিয়ার ক্যারিয়ার দেখলে বোঝা যায়, সময়ের সঙ্গে নিজের জায়গাটি তিনি শুধু পারিবারিক পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে রাখেননি।

ব্যক্তিজীবনেও আলোচনার কেন্দ্রে

ক্যারিয়ারের পাশাপাশি ব্যক্তিজীবনও বহুবার খবরের শিরোনাম হয়েছে আলিয়ার। রণবীর কাপুরের সঙ্গে প্রেম, ২০২২ সালে বিয়ে এবং একই বছর কন্যাসন্তান রাহার জন্ম—সবকিছু নিয়েই ভক্তদের আগ্রহ ছিল তুঙ্গে।

তবে মাতৃত্বের পরও কাজ থেকে দূরে সরে যাননি তিনি। বরং অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজনা, ব্যবসা ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড—সব ক্ষেত্রেই নিজের ব্যস্ততা ধরে রেখেছেন।

নতুন দশকে আরও বড় ঝুঁকি

আলিয়ার সাম্প্রতিক ক্যারিয়ারও দেখাচ্ছে, নিরাপদ চরিত্রের মধ্যে আটকে থাকার ইচ্ছা তার নেই। ২০২৬ সালে মুক্তি পাওয়া ‘আলফা’তে তাকে দেখা গেছে YRF Spy Universe-এর প্রথম নারী-নেতৃত্বাধীন অ্যাকশন ছবির কেন্দ্রে। ছবিতে তার সঙ্গে ছিলেন শর্বরী, অনিল কাপুর ও ববি দেওল।

সামনেও তার হাতে রয়েছে বড় প্রকল্প। ‘লাভ অ্যান্ড ওয়ার’-এ রণবীর কাপুর ও ভিকি কৌশলের সঙ্গে তাকে দেখা যাবে; ছবিটির মুক্তির তারিখ ২১ জানুয়ারি ২০২৭ হিসেবে তালিকাভুক্ত রয়েছে।

৪ হাজার ৬০০ কোটির সম্পদ—কতটা সত্য?

আলিয়ার মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা—এমন দাবি বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়। তবে এ ধরনের সেলিব্রিটি ‘নেট ওয়ার্থ’ হিসাব সাধারণত বিভিন্ন সম্পদ, ব্র্যান্ড চুক্তি, ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব ও বিনিয়োগের আনুমানিক হিসাবের ওপর নির্ভর করে; তাই নির্দিষ্ট অঙ্কটিকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

নিশ্চিতভাবে বলা যায়, অভিনয়ের পারিশ্রমিকের বাইরেও এখন তার আয় ও প্রভাবের ক্ষেত্র অনেক বিস্তৃত। সিনেমা, প্রযোজনা, ব্যবসা, ব্র্যান্ড এন্ডোর্সমেন্ট ও আন্তর্জাতিক ফ্যাশন—সব মিলিয়ে আলিয়া নিজেকে একটি পূর্ণাঙ্গ বিনোদন-ব্যবসায়িক ব্র্যান্ডে পরিণত করেছেন।

অসম্পূর্ণ পড়াশোনা নয়, সম্পূর্ণ আত্মবিশ্বাসের গল্প

আলিয়ার গল্পকে তাই শুধু ‘পড়াশোনা শেষ না করেও সফল’—এই একটি বাক্যে আটকে রাখলে তার ক্যারিয়ারের বড় অংশই বাদ পড়ে যায়। তার আসল গল্প হলো অল্প বয়সে সিদ্ধান্ত নেওয়া, একের পর এক কঠিন চরিত্র গ্রহণ করা, ব্যর্থতা ও সমালোচনা সামলে নিজেকে বদলানো এবং অভিনয়ের বাইরেও নিজের সাম্রাজ্য তৈরি করা।

১৯ বছর বয়সে যে মেয়েটি ‘স্টুডেন্ট অব দ্য ইয়ার’ দিয়ে বলিউডে পা রেখেছিলেন, আজ তিনি অভিনেত্রী, প্রযোজক, উদ্যোক্তা ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের মুখ। আর এই দীর্ঘ পথচলাই দেখিয়েছে—তারকা পরিবার দরজা খুলে দিতে পারে, কিন্তু সেই দরজার ওপারে নিজের জায়গা ধরে রাখতে লাগে প্রতিভা, পরিশ্রম এবং সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলে নেওয়ার সাহস।

সন্ধানী বার্তা/জেএন


সম্পর্কিত খবর