ইয়েমেনে যুদ্ধের পুরোনো আগুন আবার বড় পরিসরে জ্বলে উঠছে। এবার লড়াইয়ের কেন্দ্র শুধু হুতি নিয়ন্ত্রিত এলাকা নয়; লক্ষ্য লোহিত সাগরের প্রবেশপথ বাব আল-মানদেব। এই কৌশলগত জলপথের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বড় সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে সৌদি আরব। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, স্থল অভিযানে এক লাখের বেশি ইয়েমেনি সেনা অংশ নিতে পারেন। তাঁদের সহায়তায় বিমান হামলা চালাবে সৌদি বাহিনী।
অর্থাৎ ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর ইয়েমেনে যে সংঘাত তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত ছিল, তা আবার বড় আকার নেওয়ার পথে। আর এবার সৌদি আরব একা নয়—যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সহায়তা, পাকিস্তানের সেনা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, তুরস্কের সামরিক সম্পর্ক এবং ফ্রান্সের প্রতিরক্ষামূলক সহায়তা মিলিয়ে যুদ্ধের সমীকরণও বদলে গেছে।
- ১ লাখের বেশি ইয়েমেনি সেনা নামানোর পরিকল্পনা
- আকাশে সৌদি যুদ্ধবিমান; পাশে যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান ও তুরস্ক
- হুতিদের ঠেকাতে বড় সংঘাতের ঝুঁকি
কেন বাব আল-মানদেব এত গুরুত্বপূর্ণ?
ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলের বাব আল-মানদেব প্রণালি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে নৌবাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হওয়ায় এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ কেবল ইয়েমেনের সামরিক হিসাব নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
হুতিরা উপকূলীয় এলাকায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করার পর এই জলপথে তাদের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে। সৌদি আরবের সম্ভাব্য অভিযানের প্রধান লক্ষ্য তাই শুধু ভূখণ্ড পুনর্দখল নয়; নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
রয়টার্সকে সাবেক সৌদি রাষ্ট্রদূত মাইকেল র্যাটনি বলেছেন, নতুন অভিযান ২০১৫ সালের সৌদি হস্তক্ষেপের মতো ব্যাপক নাও হতে পারে। বরং বাব আল-মানদেব দিয়ে নৌ চলাচল স্বাভাবিক করাই হতে পারে এর মূল লক্ষ্য।
স্থলযুদ্ধে নামবে এক লাখের বেশি সেনা
সম্ভাব্য অভিযানের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসতে পারে স্থলযুদ্ধে। রয়টার্সের একাধিক মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিমা সূত্র জানিয়েছে, এক লাখের বেশি ইয়েমেনি সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে।
বাব আল-মানদেব ছাড়াও আল-বায়দা, মারিব, তাইজ ও আল-জাওফ অঞ্চলে অভিযান বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গত মাসে হুতিরা লোহিত সাগরের উপকূলজুড়ে নতুন এলাকা দখলে নেওয়ার পর সৌদি নেতৃত্বাধীন পক্ষের ওপর সামরিক চাপ বাড়ে।
ইতিমধ্যে বিমান হামলাও তীব্র হয়েছে। ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী গত শুক্রবার তাইজে হুতিদের অবস্থানে ২০টি বিমান হামলার কথা জানিয়েছে। অন্যদিকে সৌদি ভূখণ্ডেও হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার খবর পাওয়া যাচ্ছে। ফলে স্থল অভিযান শুরুর আগেই সংঘাতটি দুই দেশের সীমান্ত ও সামরিক অবকাঠামোর ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।
রিয়াদের পাশে কারা?
এই অভিযানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে সৌদি আরবের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, হুতিদের ওপর বিমান হামলার ক্ষেত্রে সৌদি আরবকে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করছে যুক্তরাষ্ট্র। পাকিস্তান সৌদি আরবের আকাশ ও সীমান্ত প্রতিরক্ষায় সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম দিয়েছে। তুরস্কের সঙ্গে সৌদির প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও জোরদার হয়েছে। ফ্রান্স ইয়ানবু বন্দর রক্ষায় প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও সেনাসদস্য পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে।
পাকিস্তানের একটি সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, সৌদি আরবে ৩০ থেকে ৪০ হাজার পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। তবে তাঁদের ইয়েমেনে পাঠানোর পরিকল্পনা নেই। এই সহযোগিতা দেখাচ্ছে, ইয়েমেনের সংঘাত এখন শুধু দুই পক্ষের স্থানীয় লড়াই হিসেবে থাকছে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে উপসাগরীয় নিরাপত্তা ও বৃহত্তর আঞ্চলিক সামরিক সমীকরণ।
যুদ্ধের মধ্যেই কূটনীতির জানালা
তবে সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি কূটনৈতিক তৎপরতাও চলছে। পাকিস্তানের ভাষ্য অনুযায়ী, হুতিদের সঙ্গে আলোচনার একটি প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। এ নিয়ে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে বৈঠকের উদ্যোগও রয়েছে।
এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি সমান্তরাল প্রবণতা। একদিকে সৌদি আরব বড় সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে, অন্যদিকে মিত্রদের মাধ্যমে হুতিদের সঙ্গে যোগাযোগের সম্ভাবনাও খোলা রাখা হচ্ছে। অর্থাৎ রিয়াদের কৌশল এখন শুধু সামরিক চাপের ওপর নির্ভর করছে না; যুদ্ধক্ষেত্রের পাশাপাশি কূটনৈতিক পথও বিবেচনায় রয়েছে।
সবচেয়ে বিপন্ন ইয়েমেনের মানুষ
যুদ্ধের এই নতুন অধ্যায়ের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, ইয়েমেনের সরকারনিয়ন্ত্রিত এলাকায় প্রায় ৭৪ শতাংশ পরিবার খাবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারছে না।
এর মধ্যেই লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। নতুন করে বড় অভিযান শুরু হলে খাদ্য, জ্বালানি ও চিকিৎসাসামগ্রীর সরবরাহ আরও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে বাব আল-মানদেব ও লোহিত সাগরকেন্দ্রিক সংঘাত বাড়লে এর প্রভাব ইয়েমেনের গণ্ডি ছাড়িয়ে আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যেও পড়তে পারে।
সৌদির সামনে আসল পরীক্ষা
বিমান হামলা চালানোর সক্ষমতা সৌদি আরবের রয়েছে, মিত্রদের সামরিক সহায়তাও মিলছে। কিন্তু বাব আল-মানদেবের মতো কৌশলগত এলাকা পুনর্দখলের আসল পরীক্ষা হবে স্থলযুদ্ধে। সৌদি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলী শিহাবির মতে, এখন পর্যন্ত ইয়েমেনি স্থলবাহিনী মূলত নিজেদের অবস্থান ধরে রাখায় মনোযোগ দিয়েছে। সম্ভাব্য নতুন অভিযানে তাদের ভূমিকা হবে আক্রমণাত্মক। ফলে তাদের প্রশিক্ষণ, সমন্বয় ও যুদ্ধক্ষমতার ওপর ফলাফল অনেকটাই নির্ভর করবে।
সব মিলিয়ে সামনে যে চিত্রটি তৈরি হচ্ছে, তা শুধু ‘সৌদি বনাম হুতি’ সংঘাতের পুনরাবৃত্তি নয়। বাব আল-মানদেবকে ঘিরে লড়াই হলে এর সঙ্গে যুক্ত হবে লোহিত সাগরের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ, সৌদি-ইরান সম্পর্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সামরিক অবস্থান। তাই আগামী কয়েক সপ্তাহে রিয়াদ কী সিদ্ধান্ত নেয়, হুতিরা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায় এবং কূটনৈতিক উদ্যোগ কতটা এগোয়—এই তিনটি বিষয়ই নির্ধারণ করতে পারে ইয়েমেনে নতুন যুদ্ধ কতটা বিস্তৃত হবে।
সন্ধানী বার্তা/আরআই/এমকে