আন্তর্জাতিক

হিজবুল্লাহর পেজার হামলার প্রসঙ্গ, নেতানিয়াহুর বক্তৃতায় জাতিসংঘে তীব্র প্রতিবাদ

নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বক্তৃতা দিতে গিয়ে লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের পেজার হামলার প্রসঙ্গ তুলেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি হাতে একটি পেজার তুলে ধরেন। তবে তার বক্তৃতা শুরুর সময়ই জাতিসংঘের অধিবেশনকক্ষে দেখা দেয় তীব্র প্রতিবাদ। বিভিন্ন দেশের কয়েক ডজন প্রতিনিধি হল ছেড়ে বেরিয়ে যান। এ সময় নেতানিয়াহুর বক্তব্যের বিরুদ্ধে দুয়োধ্বনি ও প্রতিবাদের শব্দ শোনা যায়।

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া প্রায় ৪০ মিনিটের বক্তব্যে নেতানিয়াহু ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি দাবি করেন, গত কয়েক বছরে ইসরায়েলকে একসঙ্গে সাতটি ফ্রন্টে লড়াই করতে হয়েছে। তার ভাষ্য, নিউ জার্সির সমান আয়তনের একটি দেশ কীভাবে একই সময়ে সাতটি ফ্রন্টে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে—এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

তবে নেতানিয়াহু বক্তব্য শুরু করার আগেই অধিবেশনকক্ষের পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তিনি মঞ্চে ওঠার সময় বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা একের পর এক হল ছেড়ে বেরিয়ে যান। রয়টার্সের ছবিতে অধিবেশনকক্ষের বড় অংশ খালি হয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখা যায়। ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিদলসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের ওয়াকআউট করতে দেখা যায়।

প্রতিনিধিদের ওয়াকআউটের প্রতিক্রিয়ায় নেতানিয়াহু তাদের ‘নৈতিকভাবে কাপুরুষ’ বলে মন্তব্য করেন। তিনি আরও বলেন, যারা তার বক্তব্য শুনতে চান না, তারা চাইলে হল ছেড়ে যেতে পারেন। অন্যদিকে ইসরায়েলি প্রতিনিধিদলের সদস্যরা দাঁড়িয়ে তাকে করতালি দিয়ে সমর্থন জানান। অধিবেশন পরিচালনাকারীকে কয়েকবার শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানাতে দেখা যায়।

বক্তৃতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে ছিল ইরান ও হিজবুল্লাহ প্রসঙ্গ। ইরানের বিরুদ্ধে তীব্র অভিযোগ তুলে নেতানিয়াহু দেশটির নেতৃত্বকে আক্রমণ করেন। তিনি দাবি করেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন থেকে দূরে রেখেছে। ইরানের নেতৃত্বের পতনও খুব বেশি দূরে নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এরপর ২০২৪ সালের লেবানন পেজার হামলার প্রসঙ্গ তোলেন নেতানিয়াহু। হিজবুল্লাহ সদস্যদের ব্যবহৃত পেজারে বিস্ফোরক সংযোজন করে একযোগে বিস্ফোরণের ঘটনায় বিপুলসংখ্যক মানুষ হতাহত হয়েছিল। ওই হামলার সঙ্গে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্টতার কথা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল। হামলায় হিজবুল্লাহ সদস্যদের পাশাপাশি বেসামরিক লোকজনও হতাহত হন।

জাতিসংঘের মঞ্চে সেই ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে একটি পেজার হাতে নিয়ে নেতানিয়াহু বলেন, ‘বিপারগুলোর কথা মনে আছে?’ এরপর তিনি দাবি করেন, হিজবুল্লাহও সেগুলো মনে রেখেছে। রয়টার্সের প্রকাশিত ছবিতেও বক্তৃতার সময় তার হাতে পেজার দেখা যায়।

ইরানের পাশাপাশি তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের বিরুদ্ধেও বক্তব্য দেন নেতানিয়াহু। তিনি এরদোয়ানকে আক্রমণ করে তুরস্কের বিরুদ্ধে হামাসকে সমর্থনের অভিযোগ তোলেন। তুরস্কের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।

নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানিকেও বক্তব্যের বড় একটি অংশে আক্রমণ করেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী। মামদানি এর আগে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে কঠোর মন্তব্য করেছিলেন এবং ইসরায়েলের গাজা যুদ্ধের সমালোচনা করেছিলেন। নেতানিয়াহু মামদানির রাজনৈতিক অবস্থান ও তার সহযোগীদের নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। মামদানি পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় নেতানিয়াহুর বক্তব্যকে ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডের পক্ষে প্রচারণা হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

বক্তৃতায় যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মতো পশ্চিমা দেশগুলোর সমালোচনাও করেন নেতানিয়াহু। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে উপনিবেশবাদ ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগের সমালোচনা করে তিনি এসব দেশের ঐতিহাসিক ভূমিকার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।

নেতানিয়াহুর এবারের নিউইয়র্ক সফরের রাজনৈতিক গুরুত্বও ছিল উল্লেখযোগ্য। ইসরায়েলে নির্বাচন সামনে রেখে তিনি জাতিসংঘের মঞ্চকে ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডের পক্ষে অবস্থান তুলে ধরার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করেন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার বক্তব্যটি অনেকটা নির্বাচনী প্রচারণামূলক ভাষণের রূপ নেয় এবং ইসরায়েলের ‘সাতটি ফ্রন্টে’ লড়াইয়ের বিষয়টি তিনি বিশেষভাবে তুলে ধরেন।

নেতানিয়াহুর বক্তব্যের আগে ও চলাকালে জাতিসংঘের বাইরে নিউইয়র্কেও তার সফর ঘিরে বিক্ষোভ হয়। কয়েক শ বিক্ষোভকারী জাতিসংঘের আশপাশে জড়ো হন এবং তার সফরের প্রতিবাদ জানান। অধিবেশনকক্ষের ওয়াকআউট ও বাইরে বিক্ষোভ—দুই ঘটনাতেই এবারের জাতিসংঘ সফরে নেতানিয়াহুকে ঘিরে আন্তর্জাতিক বিরোধিতার চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

তবে ওয়াকআউট ও প্রতিবাদের মধ্যেও নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি নেতানিয়াহু। বরং তিনি ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে আত্মরক্ষার অংশ হিসেবে তুলে ধরে দাবি করেন, ইসরায়েল তার নিরাপত্তার জন্য লড়াই করছে এবং ভবিষ্যতেও সেই লড়াই চালিয়ে যাবে।

সূত্রঃ রয়টার্স

সন্ধানী বার্তা/এসএ


সম্পর্কিত খবর