শরৎকালের দিকে এগিয়ে যাওয়া এক বিষণ্ণ বিকেলে পুরোনো স্মৃতির দরজা খুলে যায়। সেই স্মৃতির কেন্দ্রে এমন একজন মানুষ, যিনি বাংলা সাহিত্য ও গবেষণার জগতে দুই বাংলার পাঠকের কাছেই ছিলেন পরিচিত ও সম্ভ্রমজাগানো নাম—কেতকী কুশারী ডাইসন। তবে অনেকের কাছে তিনি যতটা না ‘কেতকী কুশারী ডাইসন’, তার চেয়েও বেশি আপন ছিলেন ‘কেতকীদি’ নামে।

অক্সফোর্ডের বাড়িতে এক অন্যরকম জগৎ
বইয়ে ঠাসা পড়ার ঘর, লেখালেখির জন্য বিশেষভাবে তৈরি ডেস্কটপ কম্পিউটার ও কিবোর্ড, আর বাড়ির সামনে নিজের মতো বেড়ে ওঠা গাছপালা—সব মিলিয়ে সেই বাড়িতে ছিল না কোনো বাড়তি আড়ম্বর। ছিল শান্ত, নিবিড় এক জীবনযাপন।
কেতকী চিনিয়েছিলেন হর্সচেস্টনাট, হানিসাকল ও উইপিং উইলোর মতো গাছ। ইংল্যান্ডের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে হলুদ রেপসিডের ক্ষেত। প্রকৃতির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল গভীর। ইংল্যান্ডের মাটি ও প্রকৃতি যেমন তাঁর জীবনের অংশ হয়ে উঠেছিল, তেমনি বাংলাদেশের ও বাংলার স্মৃতিও তাঁর সৃষ্টির ভেতর থেকে কখনো হারিয়ে যায়নি।

শিউলি আর হর্সচেস্টনাটের মধ্যে দেশ খোঁজা
কেতকীর কবিতায় প্রবাসজীবনের এই দ্বৈত অনুভূতির এক অনন্য প্রকাশ পাওয়া যায় ‘বৃষ্টির পর’ কবিতায়। বৃষ্টির পর ভেজা বিকেলে একটি লাল গাড়ির গায়ে লেপ্টে থাকা ফুল দেখে তাঁর মনে হয়েছিল, সেগুলো বুঝি শিউলি।
শরতের অগ্রদূত শিউলি ফুল বাঙালির কাছে শুধু একটি ফুল নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঘরে ফেরার স্মৃতি, উৎসব ও শৈশবের অনুভূতি। কিন্তু পরে মনে হয়, ফুলগুলো হয়তো ইংল্যান্ডের হর্সচেস্টনাটের ফুল। শিউলির সঙ্গে তার মিল খুঁজে দেখার আগ্রহ তৈরি হয়। কিন্তু ফুলের উৎস জানার আগেই গাড়িটি চলে যায়।
এই ছোট্ট ঘটনাটিই যেন প্রবাসী জীবনের এক বড় সত্যকে সামনে আনে—দূরের দেশে থেকেও মানুষ নিজের শিকড়কে খুঁজে ফেরে পরিচিত গন্ধ, ফুল, ঋতু ও স্মৃতির ভেতর।

দোলনচাঁপায় ফুটেছিল প্রবাসের শারদ উপহার
কেতকীর ‘দোলনচাঁপায় ফুল ফুটেছে’ কবিতাতেও রয়েছে একই রকম শিকড়ের টান। বীরভূম থেকে একটি দোলনচাঁপার চারা নিয়ে যাওয়া হয়েছিল অক্সফোর্ডের বাড়িতে। শীত এলে গাছটির মাটির ওপরের অস্তিত্ব হারিয়ে যেত, বসন্তে আবার নতুন করে জীবন ফিরে পেত। কিন্তু বছরের পর বছর ফুল ফুটত না।
অবশেষে বাড়িতে আনার প্রায় ১২ বছর পর দোলনচাঁপায় ফুল ফুটল। দুর্গাপূজার প্রতিটি দিন যেন একটি করে ফুল দিয়ে প্রবাসী জীবনে নিয়ে এল বাংলার শরতের ঘ্রাণ।
দোলনচাঁপা যেন তখন শুধু একটি গাছ ছিল না, হয়ে উঠেছিল লেখিকার নিজের জীবনের প্রতীক। যে মানুষটি বহু দশক আগে দেশ ছেড়ে ব্রিটেনে বসতি গড়েছিলেন, তিনিও যেন দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বিদেশের মাটিতে নিজের ভাষা ও সংস্কৃতির শিকড় আরও গভীরে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন।

দেশ ছেড়ে ব্রিটেনে, বাংলা থেকে কখনো দূরে নয়
১৯৬০ সালে মাত্র ২০ বছর বয়সে দেশ ছাড়েন কেতকী কুশারী ডাইসন। অক্সফোর্ডে পড়াশোনা শেষে কলকাতায় ফিরে কিছুদিন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। পরে ১৯৬৪ সালে অক্সফোর্ডের সহপাঠী পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র রবার্ট ডাইসনকে বিয়ে করে আবার ব্রিটেনে ফিরে যান।
কয়েক বছর কানাডার ভ্যাংকুভারে থাকার সময় বাদ দিলে জীবনের বড় একটি অংশ কেটেছে অক্সফোর্ডশায়ারের কিডলিংটনে। সেখানেই সংসার, সন্তান পালন এবং লেখালেখির পাশাপাশি চালিয়ে গেছেন বিস্তৃত গবেষণা ও সাহিত্যচর্চা।
সাধারণ ব্রিটিশ জীবনের পরিসরের মধ্যেই তিনি একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন। ঘর-সংসারের দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কখনো ছিন্ন হয়নি।

গবেষণার বিষয়েও ছিল আন্তর্বিদ্য দৃষ্টিভঙ্গি
কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণার পরিসর ছিল বিস্তৃত এবং আন্তর্বিদ্য। তিনটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণাগ্রন্থের মধ্যে দুটি ইংরেজিতে এবং একটি বাংলায় প্রকাশিত হয়।
তাঁর উল্লেখযোগ্য গবেষণাগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘A Various Universe: A Study of the Journals and Memoirs of British Men and Women in the Indian Subcontinent 1705–1856’, ‘In Your Blossoming Flower Garden: Rabindranath Tagore and Victoria Ocampo’ এবং ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ: রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও চিত্রকলায় রঙের ব্যবহার’।
প্রথম বইটি ছিল তাঁর ডক্টরেট গবেষণার ফল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে ভারতবর্ষে আসা ব্রিটিশ নারী-পুরুষের ডায়েরি, ভ্রমণকাহিনি ও স্মৃতিকথা নিয়ে করা এই গবেষণার মধ্যেই তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন উপন্যাসের সম্ভাবনা।
সেই গবেষণার অভিজ্ঞতা থেকেই পরে জন্ম নেয় তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘নোটন নোটন পায়রাগুলি’। গবেষণার বিষয়বস্তু ও নিজের প্রবাসজীবনের মধ্যে এক ধরনের সমান্তরালতাও তিনি দেখতে পেয়েছিলেন।

রবীন্দ্রনাথ ও ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো নিয়ে অভিনব নিরীক্ষা
তাঁর দ্বিতীয় পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস ‘রবীন্দ্রনাথ ও ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সন্ধানে’-তে গবেষণা ও কথাসাহিত্যকে একসঙ্গে নিয়ে আসেন কেতকী।
উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র অনামিকা গবেষণার সূত্র ধরে রবীন্দ্রনাথ ও ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সম্পর্ক এবং তাঁদের ব্যক্তিত্ব ও অন্তর্জগৎ অনুসন্ধান করে। একই সঙ্গে তাকে মোকাবিলা করতে হয় নিজের ব্যক্তিগত জীবনের নানা প্রশ্ন ও সংকটের।
গবেষণা ও ব্যক্তিজীবনের এই দুই স্রোত ধীরে ধীরে একে অপরের পরিপূরক হয়ে ওঠে। কেতকীর সাহিত্যকর্মে গবেষণা ও সৃজনশীলতার এমন মেলবন্ধন তাঁর স্বাতন্ত্র্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

রবীন্দ্রনাথের রঙের জগত নিয়েও গভীর অনুসন্ধান
কেতকীর গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণদৃষ্টি ও তাঁর সাহিত্য-চিত্রকলায় রঙের ব্যবহার। একজন চক্ষুবিশেষজ্ঞের লেখা বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ থেকেই এ বিষয়ে তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়।
রবীন্দ্রনাথের বর্ণদৃষ্টির সীমাবদ্ধতার সঙ্গে তাঁর সাহিত্যিক চিত্রকল্প এবং চিত্রকলার রঙ ব্যবহারের সম্পর্ক খুঁজতে গিয়ে সাহিত্য, শিল্পকলা ও বিজ্ঞানের সমন্বয়ে তৈরি হয় একটি বিস্তৃত গবেষণাকর্ম।
প্রায় আট বছরের শ্রমে সম্পন্ন সেই গবেষণা তাঁকে দ্বিতীয়বারের মতো ‘আনন্দ পুরস্কার’ এনে দেয়। তবে প্রাতিষ্ঠানিক রবীন্দ্রচর্চায় এই কাজ নিয়ে দীর্ঘ নীরবতাও ছিল বলে স্মৃতিচারণে উল্লেখ করা হয়েছে।

উপন্যাসের পাশাপাশি নাটকেও ছিল স্বতন্ত্র কণ্ঠ
কেতকী কুশারী ডাইসন শুধু কবি, গবেষক বা ঔপন্যাসিক ছিলেন না; নাট্যকার হিসেবেও কাজ করেছেন। তাঁর তিনটি নাটক হলো ‘রাতের রোদ’ (১৯৯০), ‘মোৎসার্ট চকোলেট’ (১৯৯৮) এবং ‘সুপর্ণরেখা’ (২০০১)।
এসব নাটকে রাজনীতি, সমাজ, লিঙ্গ, পরিবেশ ও উপনিবেশোত্তর চিন্তার নানা প্রশ্ন উঠে এসেছে। ‘রাতের রোদ’-এর ইংরেজি অনুবাদ Nights Sunlight প্রকাশের পর পাশ্চাত্যের বিদ্বৎসমাজেও এটি আলোচনায় আসে।
‘মোৎসার্ট চকোলেট’-এ প্রবাসী দুই বাঙালি নারীর কথোপকথনের মধ্য দিয়ে উঠে আসে পরিচয়, উপনিবেশোত্তর বাস্তবতা, স্মৃতি এবং প্রবাসী জীবনের নানা স্তর।

শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে জমে থাকা দেশ
প্রবাসী বাঙালি নারীর স্মৃতির সঙ্গে শাড়ির সম্পর্কও তাঁর লেখায় বিশেষভাবে উঠে এসেছে। একটি শাড়ি হয়ে ওঠে স্মৃতির অ্যালবাম—কখনো বিশেষ মানুষের উপহার, কখনো কোনো বিশেষ মুহূর্তের স্মারক, আবার কখনো দেশ ছাড়ার আগের জীবনের চিহ্ন।
সেই স্মৃতির ভাঁজে ফিরে আসে মেহেরপুরের শৈশব, স্কুলজীবন, কলেজের দিন, প্রেসিডেন্সি কলেজের সাহিত্যচর্চা এবং বাংলা ভাষায় লেখালেখি চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার।
দেশ ছেড়েছিলেন, কিন্তু বাংলা ছাড়েননি। ব্রিটেনের মাটিতে বসেও মাতৃভাষাকে নিজের সৃষ্টির প্রধান আশ্রয় করে রেখেছিলেন কেতকী কুশারী ডাইসন। তাঁর সাহিত্য তাই একদিকে প্রবাসের জীবন, অন্যদিকে শিকড়ের টান—দুইয়েরই এক দীর্ঘ সংলাপ।
কবিতা, উপন্যাস, নাটক ও গবেষণার নানা শাখা পেরিয়ে কেতকীর লেখায় বারবার ফিরে এসেছে মানুষ, প্রকৃতি, স্মৃতি, পরিচয়, দেশান্তর ও ভাষা। দোলনচাঁপার মতোই তাঁর সৃষ্টিশীলতাও যেন প্রতিকূল মাটিতে দীর্ঘ অপেক্ষার পর বারবার নতুন করে ফুল ফুটিয়েছে।
সন্ধানী বার্তা/এসএ