জাতীয়

এক দিনে দুই জেলায় রাজপথের কর্মসূচিতে ব্যস্ত তথ্য প্রতিমন্ত্রী

এক জেলা থেকে আরেক জেলা—একই দিনে একের পর এক রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সরব তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে কিশোরগঞ্জ শহরে বিক্ষোভ মিছিল-পরবর্তী সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার পর বিকেলে তিনি যোগ দেন ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে আয়োজিত আরেকটি সমাবেশে। দুটি কর্মসূচিতেই তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল আওয়ামী লীগের সন্ত্রাস ও দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টার প্রতিবাদ, নৈরাজ্য ও সন্ত্রাস প্রতিরোধ এবং বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও সুসংহত রাখার বার্তা।

  • কিশোরগঞ্জে ‘বুকের পাটা থাকলে এখন আসেন’ হুংকার
  • হালুয়াঘাটে অনলাইন হুমকির জবাব—নৈরাজ্য ঠেকাতে মাঠে থাকার বার্তা

‘বুকের পাটা থাকলে এখন আসেন’
দুপুরে কিশোরগঞ্জ শহরের কালিবাড়ী মোড়সংলগ্ন চত্বরে জেলা বিএনপির আয়োজনে অনুষ্ঠিত সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তথ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশে নৈরাজ্য ও সন্ত্রাস সৃষ্টির যেকোনো অপচেষ্টা কঠোরভাবে মোকাবিলা করা হবে। নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘ডিসেম্বর নয়, বুকের পাটা থাকলে এখন আসেন। টেক্কা দিতে চান। আমাদের মা-বোনদের বুক খালি করেছেন। আসেন, ফাঁসির কাষ্ঠে ঝোলার জন্য আসেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা রাজপথে নেতৃত্ব দিয়েছি। বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছি। আমরা মানুষের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে এনেছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে আমরা মানুষকে ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছি।’

‘ষড়যন্ত্র সফল হতে দেওয়া হবে না’
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগও। তাঁর ভাষ্য, গণতন্ত্র নস্যাৎ করতে ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচারের পক্ষগুলো পালিয়ে গিয়ে ষড়যন্ত্র করছে। এসব প্রচেষ্টা মোকাবিলা করে তাদের ‘ফ্যাসিবাদ ভেঙে দেওয়া হয়েছে’ এবং ভবিষ্যতেও কোনো ষড়যন্ত্র সফল হতে দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে বিএনপির সাংগঠনিক ঐক্যের বিষয়টি সামনে এনে তিনি বলেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের পরিবার সারা দেশে ঐক্যবদ্ধ রয়েছে। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন তিনি।

বাসে আগুনের প্রসঙ্গে কঠোর সতর্কবার্তা
সম্প্রতি দুটি বাসে আগুন দেওয়ার প্রসঙ্গ তুলে তথ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাস পুড়িয়ে বা কোনো চক্রের মাধ্যমে জনগণের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করা যাবে না। তিনি বলেন, যারা মনে করছেন দুটি বাস পুড়িয়ে এবং একটি চক্রের মাধ্যমে জনগণকে ভয় দেখাতে পারবেন, তাদের সাবধান করে দিতে চাই। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সৈনিকেরা জনগণকে নিয়ে যেভাবে আপনাদের দেশ থেকে তাড়িয়েছে, প্রয়োজনে তাদেরও দেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হবে। দেশকে অস্থিতিশীল করতে দেওয়া হবে না।

প্রতিমন্ত্রীর স্লোগানের সঙ্গে গলা মেলান নেতাকর্মীরাও
এর আগে দুপুরে শহরের রথখলা এলাকায় জেলা বিএনপি কার্যালয়ের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে কালিবাড়ী মোড় এলাকায় গিয়ে শেষ হয়। এ সময় প্রতিমন্ত্রী নিজেই স্লোগান ধরেন, ‘আপা আপা করিস নারে, আপা আর আসবে নারে।’ প্রতিমন্ত্রীর স্লোগানের সঙ্গে উপস্থিত নেতাকর্মীরাও গলা মেলান।

সমাবেশে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মাজহারুল ইসলাম এবং কিশোরগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. জালাল উদ্দিন বক্তব্য রাখেন। বিক্ষোভ মিছিলে বিএনপি, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা অংশ নেন।

কিশোরগঞ্জের পর গন্তব্য হালুয়াঘাট
কিশোরগঞ্জের কর্মসূচি শেষ করেই বিকেলে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট পৌর এলাকার ধান মহলে আয়োজিত সমাবেশে যোগ দেন প্রতিমন্ত্রী। ময়মনসিংহ উত্তর জেলা বিএনপির আয়োজনে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাস ও দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টার প্রতিবাদে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে তিনি ছিলেন প্রধান বক্তা। এখানেও বক্তব্যের সার কথা—অস্থিতিশীলতার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে মাঠে থাকার ঘোষণা। তবে হালুয়াঘাটের বক্তব্যে অনলাইনভিত্তিক হুমকি এবং ভবিষ্যতে অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

অনলাইন হুমকির বিপরীতে মাঠের বার্তা
হালুয়াঘাটে তথ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, অনলাইনে হুমকি দিয়ে বাংলাদেশের জনগণকে ভয় দেখানো যাবে না। তিনি বলেন, দেশের মানুষ অতীতে অন্যায় ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে যেভাবে রুখে দাঁড়িয়েছে, ভবিষ্যতেও তেমনি গুম, খুনসহ সকল অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। প্রতিমন্ত্রী এ সময় বলেন, ‘বিগত ১৭ বছর জেল-জুলুম ও নির্যাতন সহ্য করে দেশের জনগণ তারেক রহমান—এর নেতৃত্বে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে এবং ভোটাধিকার পুনরুদ্ধার করেছে। তিনি বলেন, ‘যারা এই গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা ব্যাহত করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে জনগণকে সঙ্গে নিয়েই মাঠে থাকা হবে।’

তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে লুটপাট ও সন্ত্রাসের মাধ্যমে যারা দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করেছে, তাদের আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান প্রিন্সের
সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও ময়মনসিংহ জেলা পরিষদ প্রশাসক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, ‘দেশ পুনর্গঠন, জনসমস্যা সমাধান এবং নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যেতে গিয়ে দেশ-বিদেশে নানা ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।’

তিনি বলেন, দেশের মানুষ কোনো ধরনের সন্ত্রাস, নৈরাজ্য ও অস্থিতিশীলতা চায় না। বিএনপি সংঘাতের রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না; তবে দেশের স্থিতিশীলতা বিনষ্টের যেকোনো অপচেষ্টার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হবে। যারা সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করবে, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

ময়মনসিংহ উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক একেএম এনায়েত উল্লাহ কালামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও উত্তর জেলা বিএনপির একমাত্র যুগ্ম আহ্বায়ক মোতাহার হোসেন তালুকদার। এতে জেলা ও উপজেলার বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

দুই কর্মসূচিতে অভিন্ন রাজনৈতিক বার্তা
কিশোরগঞ্জ ও হালুয়াঘাট—দুই কর্মসূচিতেই তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরীর বক্তব্যের মূল নির্যাস ছিল ছিল রাজনৈতিকভাবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে প্রতিরোধ, জননিরাপত্তা এবং অপরাধের বিচার। কিশোরগঞ্জে ছিল সরাসরি চ্যালেঞ্জ ও পাল্টা রাজনৈতিক বার্তা এবং হালুয়াঘাটে গুরুত্ব পেয়েছে অনলাইন হুমকি, বিচার ও স্থিতিশীলতা রক্ষার প্রশ্ন। একই দিনে দুই জেলার ধারাবাহিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া তাঁর রাজনৈতিক ব্যস্ততার একটি স্পষ্ট চিত্রও তুলে ধরে। দুপুরে কিশোরগঞ্জের রাজপথের কর্মসূচি থেকে বিকেলে হালুয়াঘাটের সমাবেশ—দিনভর এই ছুটে চলার মধ্য দিয়ে প্রতিমন্ত্রী দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এবং মাঠের রাজনৈতিক তৎপরতায় সক্রিয় থাকার বার্তাই দিয়েছেন। এতে দলীয় নেতাকর্মীরাও আশান্বিত হয়ে উঠেছেন।

এমএএএমকে


সম্পর্কিত খবর