জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমবাহ ও পাহাড়ি ঢালের স্থিতিশীলতা দুর্বল হয়ে নেপাল ও তিব্বতে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে বলে এক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় উঠে এসেছে। গবেষকদের দাবি, গত আগস্টে সংঘটিত ওই দুর্যোগের আগে ওই অঞ্চলে অস্বাভাবিক উষ্ণতা লক্ষ্য করা গিয়েছিল।
গবেষণা অনুযায়ী, হিমবাহের একটি বিশাল অংশ ধসে পড়ার পর প্রায় ১১ কোটি ঘনমিটার তুষার ও বরফ নিচের উপত্যকায় নেমে আসে। এর ফলে আকস্মিক ও শক্তিশালী বন্যার সৃষ্টি হয়। কোনো ধরনের আগাম সতর্কতা পাওয়ার আগেই ভাটির জনপদগুলোতে বন্যার স্রোত আঘাত হানে।
লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের জলবায়ুবিজ্ঞানী ফ্রিডেরিকে অটোর নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় বলা হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি উষ্ণায়ন পাহাড়ি পরিবেশের বিভিন্ন উপাদানকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। এর প্রভাব হিমবাহ, বরফ এবং স্থায়ীভাবে জমাট থাকা পাহাড়ি মাটির ওপরও পড়ছে।
গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৬ আগস্ট লাংটাং লিরুং পর্বত থেকে ঝুলন্ত হিমবাহ ও শিলার বিশাল একটি অংশ ধসে পড়ে। এর আয়তন ছিল প্রায় দুই লাখ বর্গমিটার। ধসে পড়া অংশটি প্রায় ১ হাজার ৪০০ মিটার নিচে গিয়ে আঘাত হানে।
এত প্রবল শক্তিতে পাহাড়ি অংশটি নিচে আঘাত করায় সৃষ্ট কম্পন ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাতেও ধরা পড়ে। বরফ গলে যাওয়ার পাশাপাশি পানি, শিলা ও পলির বিশাল স্রোত তৈরি হয়। গবেষকদের হিসাবে, সেই বন্যার স্রোত ঘণ্টায় ১৭৭ কিলোমিটারের বেশি গতিতে নদীপথে নেমে আসে।
এর ফলে ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়। বহু মানুষ আটকা পড়েন এবং অনেক জনপদ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, এ ধরনের বিশাল আকারের শিলাধস অত্যন্ত বিরল। আনুমানিক হিসাবে এক হাজার থেকে দশ হাজার বছরে এ মাত্রার একটি ঘটনা ঘটতে পারে। একই সঙ্গে গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলের ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে।
গবেষণার অন্যতম গবেষক বেন ক্লার্ক বলেন, ভয়াবহ ধসের আগে হিমবাহের আশপাশে দীর্ঘ সময় ধরে যে পরিবর্তনগুলো ঘটেছে, তার মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
গবেষণায় উঠে এসেছে যেসব তথ্য
গবেষকদের হিসাবে, শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় ওই অঞ্চলের তাপমাত্রা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। শুধু জুলাই ও আগস্ট মাসে তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার ছিল প্রায় দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াস।
২০২৬ সালের জুলাই ও আগস্ট ওই এলাকায় রেকর্ডের উষ্ণতম দুই মাস ছিল বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। হিমবাহধসের ঠিক আগের কয়েক দিনে তাপমাত্রা ৩০ বছরের গড়ের তুলনায় প্রায় ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, ১৯৮০-এর দশক থেকে হিমালয় অঞ্চলে হিমাঙ্কের উচ্চতা প্রতি দশকে প্রায় ১০০ মিটার করে ওপরে উঠেছে। ফলে বরফ গলার মতো তাপমাত্রা এখন আগের তুলনায় আরও উঁচু এলাকায় এবং দীর্ঘ সময় ধরে বিরাজ করছে।
উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে হিমবাহটি আগেই উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে গিয়েছিল। এতে পাহাড়ি ঢালের স্থিতিশীলতা ধরে রাখা বরফের একটি অংশ সরে যায় এবং বিভিন্ন স্থানে বরফগলা পানি জমে।
২০১৫ সালের ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্পও ওই অঞ্চলের পাহাড়ি ঢাল দুর্বল হওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এবারের ধসে ওই ভূমিকম্পের নির্দিষ্ট ভূমিকা কতটা ছিল, তা নিশ্চিত করা যায়নি।
গবেষকরা সরাসরি দাবি করেননি যে জলবায়ু পরিবর্তনই এই দুর্যোগের একমাত্র কারণ। বরং তাঁদের মতে, ভূতাত্ত্বিক কাঠামোসহ একাধিক কারণের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি উষ্ণায়ন যুক্ত হয়ে পাহাড়ি পরিবেশকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলেছে।
ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় সহায়তা চায় নেপাল
বন্যা ও ভূমিধসের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে জাতিসংঘের ক্ষয়ক্ষতি তহবিল থেকে সহায়তা চেয়ে আবেদন করেছে নেপাল। এই তহবিল থেকে সহায়তা পেতে দুর্যোগের সঙ্গে জলবায়ু সংকটের সম্পর্কের প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল বেশি কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলোর প্রতি জলবায়ু সংকটের বিষয়ে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি অঞ্চল ও সেখানকার জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে এমন দুর্যোগ মোকাবিলায় ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা ও বৈশ্বিকভাবে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
সন্ধানী বার্তা/জেএন