এক্সক্লুসিভ

সরকার ও বিএনপিকে ঘিরে বাড়ছে অপতথ্যের বিস্তার

সরকার ও বিএনপিকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, বিভ্রান্তিকর তথ্য ও বিকৃত কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। কখনো পুরনো কোনো ভিডিওকে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনার দৃশ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, আবার কখনো প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমের ফটোকার্ডের আদল নকল করে ছড়ানো হচ্ছে মনগড়া বক্তব্য। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাস্তব ঘটনার সঙ্গে সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনৈতিক ব্যাখ্যা জুড়ে দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে বিভ্রান্তি।

সম্প্রতি প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের (পিআইবি) ফ্যাক্ট চেক ও মিডিয়া রিসার্চ টিম ‘বাংলাফ্যাক্ট’-এর যাচাইয়ে এমন একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে। এসব ঘটনা পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয়, সরকার ও বিএনপিকে কেন্দ্র করে অনলাইনে তথ্য বিভ্রান্তির অন্যতম প্রধান কৌশল হচ্ছে পুরনো কনটেন্টকে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া।

সত্য ভিডিও, মিথ্যা পরিচয়
তারেক রহমানের কার্যালয়ে দুপুরের খাবারের দৃশ্য দাবি করে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। যাচাইয়ে দেখা যায়, ভিডিওটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নয়। এটি তাঁর সিলেট সফরের সময় শ্বশুরবাড়িতে আপ্যায়নের দৃশ্য। অর্থাৎ ভিডিওটি বাস্তব হলেও এর সঙ্গে যে স্থান ও প্রেক্ষাপট জুড়ে দেওয়া হয়েছে, সেটিই বিভ্রান্তিকর। বিএনপিকে দায়ী করে ছড়িয়ে পড়া আরেকটি ভিডিওতেও একই প্রবণতা দেখা যায়। ভিডিওটি বর্তমান সরকারের সময়ের ঘটনা হিসেবে প্রচার করা হলেও যাচাইয়ে সেটি ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে উত্তরায় সংঘটিত একটি হামলার পুরনো দৃশ্য বলে উঠে আসে। ফলে একটি বাস্তব ঘটনার ভিডিও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নতুন পরিচয় পেয়েছে।

ফটোকার্ডেই যখন বদলে যায় সংবাদ
খালেদা জিয়াকে ঘিরে চ্যানেল ২৪-এর একটি ফটোকার্ড বিকৃত করে ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও অনলাইনে তথ্য কারসাজির আরেকটি দিক সামনে আনে। মূল ফটোকার্ডের বক্তব্য পরিবর্তন করে সেটিকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেন তা গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর। এতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীর কাছে মিথ্যা তথ্যও নির্ভরযোগ্য সংবাদ হিসেবে প্রতীয়মান হতে পারে। এই ধরনের কনটেন্টের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর দৃশ্যমান বিশ্বাসযোগ্যতা। পরিচিত সংবাদমাধ্যমের লোগো, ডিজাইন ও ফরম্যাট ব্যবহার করায় উৎস যাচাই না করলে প্রকৃত ও বিকৃত কনটেন্টের পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ে।

গুজবের পরিধি রাজনীতির বাইরেও সরকার ও বিএনপিকে ঘিরে
রাজনৈতিক অপতথ্যের পাশাপাশি অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাত নিয়েও বিভ্রান্তিকর বক্তব্য ছড়ানোর প্রবণতা রয়েছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ আমলের ব্যাংকিং অনিয়ম, ঋণখেলাপি ও আর্থিক দুর্নীতির তথ্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা দাবি দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের অনিয়ম এবং হিসাবগত বিভিন্ন ব্যবস্থার কারণে প্রকৃত পরিস্থিতি নিয়ে যে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছিল, পরবর্তী নিরীক্ষা ও সম্পদের মান যাচাইয়ে তার কিছুটা স্পষ্ট চিত্র সামনে আসে।

মেরুকরণ যত বাড়ে, গুজবের ঝুঁকিও তত বেশি
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে যে তীব্র বিভাজন তৈরি হয়েছে, তার সুযোগ নিচ্ছে অপতথ্য ছড়ানোকারীরা। কখনো সরকার, কখনো বিএনপি কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক পক্ষকে লক্ষ্য করে ছড়ানো হচ্ছে বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট। সমর্থন কিংবা বিরোধিতার আবেগে অনেক ব্যবহারকারী তথ্য যাচাই না করেই এসব পোস্ট শেয়ার করছেন। ফলে একটি গুজব খুব অল্প সময়েই ব্যাপক মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।

রাজনৈতিক বিতর্ক ও সমালোচনা গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু সেই বিতর্ক যখন পুরনো ভিডিও, বিকৃত ছবি কিংবা মনগড়া তথ্যের ওপর দাঁড়ায়, তখন তা শুধু জনমতকে বিভ্রান্ত করে না, রাজনৈতিক অবিশ্বাসও বাড়ায়।

সরকার ও বিএনপিকে ঘিরে অনলাইনে গুজবের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তাই বিচ্ছিন্ন কিছু উদাহরণ নয়; বরং রাজনৈতিক মেরুকরণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকা একটি বড় তথ্যগত সংকেত। এই বাস্তবতায় কোনো রাজনৈতিক দাবি দেখলেই তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্বাস বা প্রচার না করে উৎস, সময় ও প্রেক্ষাপট যাচাই করাই হতে পারে অপতথ্যের বিস্তার ঠেকানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

এম/এএইচ


সম্পর্কিত খবর