মাঝারি তাপমাত্রার আবহাওয়া। তবু কমছে না বিদ্যুতের সংকট। বরং গ্রাম থেকে রাজধানী—সর্বত্রই বাড়ছে লোডশেডিং। দিনের ব্যস্ত সময়েও কয়েক হাজার মেগাওয়াট ঘাটতি নিয়ে চলছে বিদ্যুৎ সরবরাহ। বৃহস্পতিবার দুপুর ৩টায় দেশের বিদ্যুৎ ঘাটতি দাঁড়ায় ৩ হাজার ৬৬৪ মেগাওয়াটে। এতে চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশই মেটানো সম্ভব হয়নি।
বিদ্যুৎ বিভাগের পর্যালোচনা বলছে, চলতি আগস্টের শুরুতে গ্যাসের তীব্র সংকটের সময় যে মাত্রায় লোডশেডিং হয়েছিল, সাম্প্রতিক পরিস্থিতিও অনেকটা সেই পর্যায়ে ফিরে গেছে। সাধারণত লোডশেডিংয়ের বড় চাপ গ্রাম ও মফস্বল এলাকায় গিয়ে পড়লেও এবার রাজধানীর বাসিন্দারাও রেহাই পাচ্ছেন না। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় দিনে চার থেকে পাঁচবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। একবার বিদ্যুৎ গেলে অনেক ক্ষেত্রে এক ঘণ্টার আগে তা ফিরছে না।
দিনে ৩ হাজার ৬৬৪ মেগাওয়াট ঘাটতি
বৃহস্পতিবার বেলা ৩টায় সারা দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১৩ হাজার ৫৩৪ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি দাঁড়ায় ৩ হাজার ৬৬৬ মেগাওয়াটের কাছাকাছি। এই ঘাটতি সামাল দিতে প্রায় ২০ শতাংশ হারে লোডশেডিং করতে হয়েছে।দিনের বেলাতেও গড়ে ২ হাজার মেগাওয়াটের মতো লোডশেডিং হয়েছে। অর্থাৎ শুধু রাতের পিক আওয়ার নয়, দিনের স্বাভাবিক সময়েও বিদ্যুৎ সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
- গ্রাম-শহরে সমানতালে লোডশেডিং
- বিদ্যুৎ সংকটে বাড়ছে ভোগান্তি
- গ্যাস সংকটে কমেছে বিদ্যুৎ উৎপাদন
- দিনে ৩ হাজার ৬৬৪ মেগাওয়াট পর্যন্ত ঘাটতি
- ঢাকায় ৪–৫ বার, গ্রামে ১০–১২ বার পর্যন্ত বিদ্যুৎ যাচ্ছে
রাজধানীতেও পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হয়েছে। ২৪ আগস্ট দুপুর ১২টায় ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো) এলাকায় ১ হাজার ৩৯৬ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে লোডশেডিং ছিল ১২০ মেগাওয়াট। ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) এলাকায় ১ হাজার ৯৯৯ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে লোডশেডিং ছিল ১৬৫ মেগাওয়াট। একই সময়ে পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় চাহিদা ছিল ২ হাজার ৮৪৩ মেগাওয়াট, সেখানে লোডশেডিং ছিল ৪৩৭ মেগাওয়াট। কয়েক দিনের ব্যবধানেই এসব এলাকায় লোডশেডিংয়ের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
রাজধানীতে দিনে ৪–৫ বার, গ্রামে আরও ভয়াবহ
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পালা করে দিনে চার থেকে পাঁচবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। কোনো কোনো এলাকায় এক ঘণ্টার বেশি সময়ও বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে। ঈদের ছুটির দিন বুধবারও কোথাও কোথাও টানা দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না।তবে রাজধানীর তুলনায় গ্রামের চিত্র আরও কঠিন। কয়েক দিন কিছুটা স্বস্তি মিললেও ফের দিনে ১০ থেকে ১২ বার পর্যন্ত বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে শুধু গৃহস্থালি জীবনই নয়, ক্ষুদ্র ব্যবসা, সেচ, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় শিল্পকারখানার কাজও ব্যাহত হচ্ছে।
মূল সংকট গ্যাসে
বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে সামনে আসছে গ্যাসের ঘাটতি। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থা এখনো বড় মাত্রায় গ্যাসনির্ভর। কিন্তু প্রয়োজনীয় গ্যাস না পাওয়ায় অনেক গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। পেট্রোবাংলা ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের হিসাব বলছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য গ্যাসের বরাদ্দ ৯৪০ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে কমিয়ে ৮৯০ মিলিয়ন ঘনফুটে নামানো হয়েছে। সীমিত সরবরাহের অবশিষ্ট অংশ বাণিজ্যিক গ্রাহক ও সার কারখানায় দেওয়া হচ্ছে। ফলে ১২ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতার গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো গত কয়েক সপ্তাহে গড়ে ৫ হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের মধ্যে উৎপাদন সীমাবদ্ধ রেখেছিল। সাম্প্রতিক সময়ে তা আরও কমিয়ে ৫ হাজার মেগাওয়াটের নিচে নামানো হয়েছে।
গ্যাস কম, বাড়ছে ব্যয়বহুল তেলভিত্তিক উৎপাদন
গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন কমলেও ঘাটতি সামাল দিতে ফার্নেস তেলচালিত বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে। এসব কেন্দ্রের উৎপাদন ২ হাজার মেগাওয়াট থেকে বাড়িয়ে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াট করা হয়েছে।তবে এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বাড়ছে। অর্থাৎ গ্যাস সংকট শুধু বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতিই তৈরি করছে না, একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয়ও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এলএনজি সরবরাহেও অনিশ্চয়তা
গ্যাসের ঘাটতি পূরণে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়লেও সেখানেও তৈরি হয়েছে নতুন সংকট। সাগরে থাকা মার্কিন এলএনজি টার্মিনালের মেরামত শেষ হলেও আমদানি করা গ্যাসের সরবরাহ প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়েনি।পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা বলছেন, ধীরে ধীরে এলএনজি সরবরাহ বাড়িয়ে গ্যাসের ঘাটতি কমানোর চেষ্টা চলছে। তবে নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী এলএনজি কার্গো সরবরাহেও কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবও পড়েছে সরবরাহ ব্যবস্থায়। কাতার ও ওমানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় থাকা কিছু এলএনজি কার্গো সময়মতো দেশে আসছে না। ফলে আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে।
১২ ডলারের গ্যাস এখন ২৪ ডলার
জ্বালানি বাজারে এই চাপের সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের ওপর। যুদ্ধের আগে আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট এলএনজির দাম ছিল প্রতি এমএমবিটিইউ প্রায় ১২ থেকে ১৩ ডলার। সর্বশেষ কেনাকাটায় তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৪ ডলারে। অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কেনা এলএনজি পাওয়া যাচ্ছিল ৯ থেকে ১০ ডলারে। ফলে সস্তা দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হওয়ায় ব্যয়বহুল স্পট এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরীর তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কেনা গ্যাসের প্রতি ঘনফুটের দাম পড়ছে প্রায় ৭৫ টাকা। অথচ বিদ্যুৎকেন্দ্রে সেই গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ১৪ টাকা দরে। এই বিশাল ব্যবধান সরকারকে ভর্তুকির ওপর আরও নির্ভরশীল করে তুলছে।
ভর্তুকির চাপেও সমাধান মিলছে না
বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়ায় গ্যাস খাতে এক বছরের জন্য বরাদ্দ করা ভর্তুকির অর্থের বড় অংশ মাত্র দুই মাসেই ব্যয় হয়ে গেছে। ফলে সরকারের সামনে এখন দ্বিমুখী চাপ—একদিকে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, অন্যদিকে বাড়তি জ্বালানি ব্যয়ের বোঝা সামলানো। এই পরিস্থিতিতে কম খরচে বিদ্যুৎ পাওয়ার উৎস খুঁজছে সরকার। কিন্তু স্বল্পমেয়াদে গ্যাসের সরবরাহ না বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধরনের স্বস্তি ফেরার সম্ভাবনা কম।
সব মিলিয়ে বর্তমান লোডশেডিং কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘাটতির গল্প নয়; এর পেছনে রয়েছে গ্যাস সরবরাহের সংকট, এলএনজি আমদানির অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের বাড়তি দাম এবং ভর্তুকির ক্রমবর্ধমান চাপ। ফলে আপাতত গ্রাম ও শহর—দুই জায়গার মানুষকেই ভাগ করে নিতে হচ্ছে একই দুর্ভোগ। বিদ্যুৎ সংকটের এই চক্র ভাঙতে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য ও তুলনামূলক সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
এম/এএইচ