বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রধান ভাইস এডমিরাল খোন্দকার মিসবাহ উল আজীম এডমিরাল পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। রোববার (২৩ আগস্ট) বিমান বাহিনী সদর দপ্তরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান তাঁকে এডমিরাল র্যাংক পরিয়ে দেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী নৌবাহিনী প্রধানকে অভিনন্দন জানান।
র্যাংক ব্যাজ পরিধান অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চীফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) লেফটেন্যান্ট জেনারেল মীর মুশফিকুর রহমান, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আশরাফ উদ্দিনসহ ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
চলতি বছরের ২৩ জুলাই বাংলাদেশ নৌবাহিনী প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর অল্প সময়ের মধ্যেই এডমিরাল পদে উন্নীত হলেন খোন্দকার মিসবাহ উল আজীম। প্রায় চার দশকের সামরিক জীবনে অর্জিত তাঁর দীর্ঘ পেশাগত অভিজ্ঞতা, কমান্ড সক্ষমতা, একাডেমিক অর্জন এবং দেশ-বিদেশে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা তাঁর বর্তমান নেতৃত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
নৌবাহিনীতে চার দশকের পথচলা
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, খোন্দকার মিসবাহ উল আজীম ১৯৮৭ সালের ১ জানুয়ারি বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে যোগ দেন। রয়্যাল মালয়েশিয়ান নৌবাহিনীতে বিশেষ কৃতিত্বের সঙ্গে নৌ-প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করার পর ১৯৮৯ সালের ১ জুলাই তিনি এক্সিকিউটিভ ব্রাঞ্চে কমিশন লাভ করেন। তাঁর ৮৭-এ ব্যাচে জ্যেষ্ঠতা ও মেধায় তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেন। কর্মজীবনে তিনি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কমান্ড, স্টাফ ও নেতৃত্বমূলক দায়িত্ব পালন করেছেন। এর মধ্যে কমান্ডার চট্টগ্রাম নৌ অঞ্চল, কমান্ডার ঢাকা নৌ অঞ্চল, কমান্ডার সাবমেরিন, কমান্ড্যান্ট বাংলাদেশ নেভাল একাডেমি এবং নৌবাহিনী সদর দপ্তরের পরিচালক নৌ-অপারেশন্সের দায়িত্ব উল্লেখযোগ্য।
যুদ্ধজাহাজ পরিচালনাতেও রয়েছে তাঁর বিস্তৃত অভিজ্ঞতা। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ফ্রিগেট বানৌজা ওমর ফারুক, বানৌজা এস আর আমিন, বানৌজা নির্ভয় ও বানৌজা সৈকতসহ প্রায় সব ধরনের যুদ্ধজাহাজের অধিনায়কত্ব করেছেন তিনি। একই সঙ্গে বাংলাদেশ নেভাল একাডেমি, ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজ এবং ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজে প্রশিক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে তাঁর কর্মজীবনে অপারেশনাল কমান্ডের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ ও সামরিক নেতৃত্ব বিকাশের অভিজ্ঞতাও যুক্ত হয়েছে।
সামরিক পেশার সঙ্গে উচ্চশিক্ষার সমন্বয়
পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি উচ্চশিক্ষাতেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য রয়েছে এডমিরাল আজীমের। বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি) থেকে তিনি মেরিটাইম গভর্ন্যান্স বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। এমফিল ডিগ্রির পাশাপাশি স্ট্র্যাটেজিক, ডিফেন্স ও অপারেশনাল স্টাডিজ বিষয়ে দেশ-বিদেশের প্রতিষ্ঠান থেকে প্রথম শ্রেণিসহ তিনটি মাস্টার্স ডিগ্রিও অর্জন করেন। তিনি ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ, আর্মড ফোর্সেস ওয়ার কোর্স এবং ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজের কৃতী গ্র্যাজুয়েট। ছাত্রজীবনেও তাঁর মেধার স্বাক্ষর ছিল। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক উভয় পরীক্ষায় সম্মিলিত মেধা তালিকায় স্থান পাওয়ায় তিনি রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে চ্যান্সেলর অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন।
আন্তর্জাতিক দায়িত্বেও অভিজ্ঞতা
বাংলাদেশের বাইরে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনেও দায়িত্ব পালন করেছেন এডমিরাল আজীম। লেবানন ও গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে তাঁর দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। সর্বশেষ ওমানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বাংলাদেশ-ওমান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়ন, বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের কল্যাণে বিশেষ ভূমিকা রাখেন তিনি।
সামরিক পেশার পাশাপাশি কূটনৈতিক দায়িত্ব পালনের এই অভিজ্ঞতা তাঁর কর্মজীবনে একটি ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। নৌ-অপারেশন ও সামরিক নেতৃত্বের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কূটনৈতিক পরিসরে কাজ করার অভিজ্ঞতাও তাঁর রয়েছে।
স্বীকৃতি ও পুরস্কারে সমৃদ্ধ কর্মজীবন
দীর্ঘ কর্মজীবনে এডমিরাল খোন্দকার মিসবাহ উল আজীম বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদক ও পুরস্কার অর্জন করেছেন। এর মধ্যে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সর্বোচ্চ শান্তিকালীন পদক ‘নৌবাহিনী পদক’ (এনবিপি), ‘নৌ পারদর্শিতা পদক’ (এনপিপি), ‘জাতীয় শুদ্ধাচার পুরস্কার’ এবং ‘জাতীয় স্কাউট পুরস্কার’ (রৌপ্য ইলিশ পদক) উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া তিনি তিনবার নৌবাহিনী প্রধানের প্রশংসাসূচক ইনসিগনিয়া লাভ করেছেন। ‘বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন’ পুরস্কার, ‘সেরা ব্যক্তিগত গবেষণাপত্র পুরস্কার’ এবং অ্যান্টি-সাবমেরিন ওয়ারফেয়ার বিশেষায়িত প্রশিক্ষণে ‘সেরা শিক্ষার্থী পুরস্কার’ও অর্জন করেছেন তিনি।

নৌ নেতৃত্বে নতুন দায়িত্বের তাৎপর্য
খোন্দকার মিসবাহ উল আজীমের এডমিরাল পদে পদোন্নতি তাঁর দীর্ঘ সামরিক ক্যারিয়ারের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তাঁর কর্মজীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়, কমান্ড ও অপারেশন থেকে শুরু করে প্রশিক্ষণ, সামরিক গবেষণা, উচ্চশিক্ষা, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন এবং কূটনৈতিক দায়িত্ব—বিভিন্ন ক্ষেত্রে তিনি কাজ করেছেন। একজন নৌ কর্মকর্তার জন্য সমুদ্রভিত্তিক সামরিক সক্ষমতার পাশাপাশি কৌশলগত চিন্তা, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা নীতি এবং আঞ্চলিক সম্পর্কের বিষয়ে অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ। এডমিরাল আজীমের কর্মজীবনে এসব ক্ষেত্রের সমন্বিত অভিজ্ঞতা রয়েছে। ফলে তাঁর এডমিরাল পদে উন্নীত হওয়া শুধু পদমর্যাদা বৃদ্ধির বিষয় নয়; বরং দীর্ঘ পেশাগত প্রস্তুতি ও বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতারও প্রতিফলন।
লেখক ও গবেষক হিসেবেও পরিচিত
পেশাগত দায়িত্বের বাইরে এডমিরাল আজীম একজন পাঠক, লেখক ও গবেষক হিসেবেও সক্রিয়। সামুদ্রিক নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা এবং সামরিক ও নৌ-কৌশলগত বিষয়ে বিভিন্ন সমাদৃত জার্নাল ও সাময়িকীতে তাঁর প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। খেলাধুলার মধ্যে তাঁর আগ্রহ রয়েছে গলফ, বাস্কেটবল, দাবা ও টেবিল টেনিসে। বাংলা ও ইংরেজিতে তিনি সাবলীল; পাশাপাশি মালে ও ফরাসি ভাষায় তাঁর ব্যবহারিক দক্ষতা রয়েছে। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বেগম নুরতাজ আজীমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ। তাঁদের দুই কন্যাসন্তান রয়েছে।চার দশকের বেশি সময় ধরে নৌবাহিনীতে দায়িত্ব পালন, সমুদ্রযুদ্ধ ও কমান্ডে অভিজ্ঞতা, সামরিক শিক্ষায় সাফল্য, আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণ এবং কূটনৈতিক দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা—সব মিলিয়ে এডমিরাল খোন্দকার মিসবাহ উল আজীমের পেশাগত যাত্রা বাংলাদেশের নৌ নেতৃত্বে একটি দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময় অধ্যায়ের প্রতিনিধিত্ব করে।
এম/এএইচ