দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা, দীর্ঘস্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং নীতিগত স্থবিরতার বৃত্ত ভেঙে বাংলাদেশ আজ এক নতুন ভোরের মুখোমুখি। ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণের দীর্ঘ দেড় দশকের অভিশাপ কাটিয়ে একটি মুক্ত ও স্বনির্ভর সার্বভৌম বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। যেকোনো দেশের স্বনির্ভরতা ও টেকসই অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের মূল চাবিকাঠি হলো একটি দক্ষ, আধুনিক ও জনবান্ধব রাজস্ব ব্যবস্থা। সেই নিরিখে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ‘রাজস্ব সম্মেলন-২০২৬’-এ রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকদের কৌশলগত দিকনির্দেশনা এবং গৃহীত যুগান্তকারী সিদ্ধান্তসমূহ কেবল রাজস্ব আদায় বাড়ানোর প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি জাতীয় অর্থনীতি পুনর্গঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ কার্যকার উদ্যোগ। ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত নতুন অর্থবছর চক্র নির্ধারণ এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) দুটি স্বতন্ত্র ও স্বচ্ছ সংস্থায় বিভক্ত করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত অর্থনৈতিক সংস্কারের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা করবে বলে মনে হচ্ছে।
একটি দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির টেকসই যাত্রা কখনোই বৈদেশিক ঋণ বা কৃত্রিম আর্থিক পরিসংখ্যানের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। বিগত বছরগুলোতে দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর যে চরম আঘাত এসেছে, তা থেকে মুক্ত হয়ে আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে ওঠার মূল শর্তই হলো অভ্যন্তরীণ সম্পদের সর্বোচ্চ ও দক্ষ ব্যবহার। জাতীয় রাজস্ব সম্মেলনের উদ্বোধনকালে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে সুস্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ: ‘ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে এবার আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর পালা, বাংলাদেশের ঘুরে দাঁড়ানোর পালা।’
সরকার পরিচালনার দ্বায়িত্ব নেওয়ার পর বর্তমান বাস্তবতায় ভঙ্গুর অর্থনৈতিক কাঠামোকে স্থিতিশীল করা এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আনা পুরোপুরি নির্ভর করছে রাজস্ব আহরণের সক্ষমতার ওপর। কিন্তু অতীতের নীতিহীন পৃষ্ঠপোষকতা, রাজনৈতিক স্বার্থে প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার এবং রাজস্ব আহরণে স্বেচ্ছাচারিতা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মতো সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনেছিল। করদাতাদের কাছে এনবিআর একসময় আতঙ্কের নাম ছিল, যা কোনো স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কাম্য হতে পারে না। আজ করদাতারা এনবিআরকে নিজেদের আস্থার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখতে চায়। করদাতাদের এই প্রত্যাশা পূরণ করা এবং একটি জনবান্ধব রাজস্ব কাঠামো তৈরি করা বর্তমান সময় ও দেশগঠনের প্রধান দাবি।
বাংলাদেশের রাজস্ব খাতের দীর্ঘদিনের স্থবিরতা এবং পেশাদারিত্বের অভাব দূর করতে আন্তর্জাতিক মানের প্রশাসনিক সংস্কার অত্যন্ত জরুরি ছিল। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ঘোষণা অনুযায়ী এনবিআর ভেঙে দুটি সম্পূর্ণ পৃথক ও বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান গঠনের সিদ্ধান্ত দেশের প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসে সবচেয়ে সময়োপযোগী পদক্ষেপ।
১.এই বিভাগটি কাজ করবে সরকারের উচ্চমানের ‘থিংক ট্যাংক’ বা চিন্তাশীল সংস্কারক সংস্থা হিসেবে। অর্থনীতিবিদ, গবেষক, বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি ও শিল্প-বাণিজ্য সংগঠনের বিশেষজ্ঞদের মতামত ও গবেষণার ভিত্তিতে এটি একটি ভারসাম্যপূর্ণ, প্রতিযোগিতামূলক এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নবান্ধব কর নীতি ও আইন কাঠামো প্রণয়ন করবে।
২.এটি কাজ করবে একটি দক্ষ ‘অ্যাকশন টিম’ হিসেবে। যাদের মূল দায়িত্ব হবে কেবল রাজস্ব নীতি বাস্তবায়ন, কর সংগ্রহ এবং আইনের পরিপালন নিশ্চিত করা।
অতীতের কাঠামোয় একই কর্মকর্তার হাতে নীতি প্রণয়ন এবং কর সংগ্রহের দায়িত্ব থাকায় সেখানে স্বার্থের সংঘাত (Conflict of Interest), স্বৈরাচারী সিদ্ধান্ত এবং দুর্নীতি লালনের সুযোগ থেকে যেত। রাজস্ব প্রশাসন থেকে নীতি নির্ধারণী অংশকে বিচ্ছিন্ন করার এই নতুন মডেল কর ব্যবস্থার সামগ্রিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও পেশাদারিত্ব শতভাগ নিশ্চিত করবে।
অর্থনীতির আকার ও বিস্তৃতি ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেলেও বাংলাদেশে ট্যাক্স-টু-জিডিপি (Tax-to-GDP Ratio) অনুপাত বিশ্ব ও আঞ্চলিক সূচকে অত্যন্ত হতাশাজনক। ২০২৩ সালে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে গড় কর-জিডিপি অনুপাত ছিল ১৯.৫ শতাংশ, যেখানে বাংলাদেশের এই হার ৭.২ শতাংশে অবস্থান করছিল। দুখজনকভাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এটি আরও কমে ৬.৭ শতাংশে নেমে আসে, যা বিশ্বপর্যায়ে সর্বনিম্নগুলোর অন্যতম।
এর মূল কারণ অর্থনীতির সম্প্রসারণের সাথে সাথে রাষ্ট্র তার রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা বাড়াতে পারেনি। বিদ্যমান নিয়মিত করদাতাদের ওপর বারবার করের বোঝা বাড়ানোর নীতি কোনো অবস্থাতেই টেকসই নয়। এ ব্যবধান কমাতে আমাদের কর কাঠামোতে প্রধানত চারটি কৌশল অবলম্বন করা প্রয়োজন:
১.যারা কর দেয়ার সক্ষমতা রাখেন অথচ কর ব্যবস্থার বাইরে রয়েছেন, তাদের সঠিকভাবে শনাক্ত করে করের আওতায় আনতে হবে।
২.অযৌক্তিক, অপ্রয়োজনীয় এবং রাজনৈতিক সুবিধাভিত্তিক কর ছাড় বা ট্যাক্স হলিডে সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে।
৩.আন্তর্জাতিক সীমানা পেরিয়ে ট্রান্সফার প্রাইসিং বা মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে সম্পদ পাচার কঠোরভাবে রদ করতে হবে।
৪.ভয়ভীতি প্রদর্শনের পরিবর্তে করদাতাদের সম্মানিত করা এবং ট্যাক্স প্রসেস সহজ করতে হবে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে নির্ধারিত ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা আপাতদৃষ্টিতে উচ্চাভিলাষী হলেও, একটি ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে নিজস্ব সামর্থ্যভিত্তিক উন্নয়ন বাজেটে উত্তরণের জন্য এই অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের কোনো বিকল্প নেই।
বৈশ্বিক অর্থনীতি এখন ট্রেডিশনাল ম্যানুয়াল ফরম্যাট থেকে দ্রুত গতিতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের দিকে মোড় নিয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ই-কমার্স, ট্রান্সফার প্রাইসিং, বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত ইন্টারন্যাশনাল ট্যাক্সেশন এবং ডিজিটাল ক্রাইমের জটিল সমীকরণে আমাদের রাজস্ব কর্মকর্তাদের মানসিকভাবে ও সামর্থ্যের দিক দিয়ে বহুমাত্রিক দক্ষতা অর্জন করতে হবে।
সরকার রাজস্ব খাতের আমূল পরিবর্তনে ‘কন্টাক্ট-ফ্রি’ এবং ‘ফেসলেস’ রাজস্ব প্রশাসন গড়ে তোলার ওপর জোর দিচ্ছে। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া করদাতাকে কর কর্মকর্তার মুখোমুখি না হওয়ার সংস্কৃতি চালু করা গেলে দুর্নীতির বড় একটি পথ বন্ধ হয়ে যাবে। ইতোমধ্যে চালু হওয়া ই-ট্যাক্স ম্যানেজমেন্ট, আসিকুডা ওয়ার্ল্ড (ASYCUDA World), ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো (NSW) এবং পোর্টগুলোতে আধুনিক স্ক্যানিং ব্যবস্থার মতো তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক কার্যক্রমকে ‘এন্ড-টু-এন্ড অটোমেশন’ (End-to-End Automation)-এর অধীনে আনতে হবে। আধুনিক ডাটাভিত্তিক কর প্রশাসনই কেবল পারে অহেতুক হয়রানি বন্ধ করে প্রকৃত কর ফাঁকিদাতা ও সৎ করদাতাকে নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করতে।
বাংলাদেশের অর্থপ্রশাসনের ইতিহাসে সবচেয়ে যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক সিদ্ধান্তটি এসেছে দেশের অর্থবছর পরিবর্তনের মাধ্যমে। দীর্ঘকালের ‘১ জুলাই – ৩০ জুন’ অর্থবছর চক্রকে বদলে ‘১ এপ্রিল – ৩১ মার্চ’ নতুন অর্থবছর নির্ধারণ করার সিদ্ধান্ত প্রশাসনিক বাস্তবতার আলোকেই গৃহীত হয়েছে।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও জলবায়ুগত বাস্তবতায় জুন-জুলাই-আগস্ট—এই তিন মাস থাকে প্রচণ্ড বর্ষাকাল। কিন্তু আমাদের প্রচলিত অর্থবছর জুন মাসে শেষ হওয়ায় অর্থছাড়, দরপত্র আহ্বান এবং উন্নয়ন বাজেটের সিংহভাগ বরাদ্দ খরচের মহোৎসব শুরু হতো মে ও জুন মাসেই। ফলে বর্ষার তীব্র বৃষ্টিপাতের মধ্যেই তড়িঘড়ি করে রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্টসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করতে হতো। এর ফলে প্রতিবছর: কোটি কোটি টাকার জনগণের আমানত নর্দমায় যেত এবং কাজের মান চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতো। বর্ষার কারণে কাজ দীর্ঘায়িত হয়ে জনদুর্ভোগ চরম মাত্রায় পৌঁছাত। অর্থছাড়ের নির্ধারিত সময়সীমা বা জুন ডেডলাইনের কারণে ঠিকাদার ও দুর্নীতিবাজদের পকেট ভারী হতো কিন্তু টেকসই অবকাঠামো তৈরি হতো না।
অর্থবছরের মতো বিশাল জটিল একটি সরকারি অর্থনৈতিক পরিকাঠামো রাতারাতি পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। তাই সরকার অত্যন্ত দূরদর্শীভাবে প্রশাসনিক ও আর্থিক ট্রানজিশনের সময়রেখা নির্ধারণ করেছে:
২০২৬ – ২০২৭ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দ্বিখণ্ডীকরণ, ডিজিটাইজেশন প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন এবং নতুন অর্থবছর সংক্রান্ত অর্থ আইন ও প্রশাসনিক বিধিমালা প্রস্তুত করা।
২০২৭ – ২০২৮ অর্থবছরটিকে বিশেষ ৯ মাসের (১ জুলাই ২০২৭ থেকে ৩১ মার্চ ২০২৮) রূপান্তরকালীন অর্থবছর হিসেবে পরিচালনা করা হবে এবং পরীক্ষামূলকভাবে বাজেট সমন্বয় করা হবে। ১ এপ্রিল ২০২৮ থেকে ৩১ মার্চ ২০২৯ তারিখ পর্যন্ত নতুন সময়সূচী অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ‘এপ্রিল-মার্চ’ অর্থবছর চক্র চালুকরণ।
একটি দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক মুক্তি ও সার্বভৌমত্ব নির্ভর করে তার নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত উন্নয়ন কাঠামোর ওপর। জাতীয় রাজস্ব সম্মেলন ২০২৬ কেবল একটি বার্ষিক আলোচনা সভা ছিল না, বরং এটি ছিল অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনের জন্য একটি জাতীয় ঐকমত্যের প্ল্যাটফর্ম। কর আদায় কেবল আইন বা জোরজবরদস্তির বিষয় নয়; এটি আস্থা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও দেশপ্রেমের সংমিশ্রণ।
পরিশেষে বলা যায়,রাজস্ব কর্মকর্তাদের মানসিকতায় আমূল পরিবর্তন এনে সেবাধর্মী মনোভাব গড়ে তুলতে হবে। দেশপ্রেম ও সততার সাথে প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে হবে। যে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের সম্মান দিতে জানে এবং সেবার প্রক্রিয়াকে হয়রানিমুক্ত রাখে, নাগরিকরাও সেই রাষ্ট্রের উন্নয়নে অংশীদার হতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসে।
অর্থবছরের যুগান্তকারী পরিবর্তন, এনবিআরের সংস্কার, ডিজিটাইজেশন এবং আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সমন্বয়ে যে ব্যাপক সংস্কারমূলক কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে—তা যদি সততা, সাহসিকতা ও নিরপেক্ষতার সাথে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে বাংলাদেশ অতি দ্রুত একটি শক্তিশালী, দক্ষ ও বিশ্বস্ত রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম হবে। সুতরাং এই অর্থনৈতিক সংস্কারই হবে ফ্যাসিবাদমুক্ত, স্বনির্ভর এবং অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ ‘নতুন বাংলাদেশ’ গঠনের মূল হাতিয়ার ইনশাল্লাহ।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com