নেটফ্লিক্সে মুক্তির পরপরই দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে থ্রিলার সিনেমা ‘দ্য লাস্ট হাউস’। মুক্তির প্রথম তিন দিনে সিনেমাটি পেয়েছে ২ কোটি ৭৫ লাখ ভিউ। ৩ থেকে ৯ আগস্টের এক সপ্তাহের হিসাবে নেটফ্লিক্সের সবচেয়ে বেশি দেখা কনটেন্টের তালিকায় শীর্ষস্থান দখল করেছে গ্রেটা লি ও ওয়াগনার মৌরা অভিনীত সিনেমাটি।
শুধু ইংরেজি ভাষার সিনেমার তালিকাতেই নয়, ওই সপ্তাহে নেটফ্লিক্সের সব ধরনের কনটেন্টের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা হয়েছে ‘দ্য লাস্ট হাউস’। ফলে মুক্তির পরপরই এটি প্ল্যাটফর্মটির অন্যতম আলোচিত সিনেমায় পরিণত হয়েছে।
‘দ্য লাস্ট হাউস’-এর গল্প আবর্তিত হয়েছে একটি বাড়িকে ঘিরে। বাইরে অবিরাম বৃষ্টি। দরজা খোলা যাচ্ছে না, জানালাও নয়। ফোন ও ইন্টারনেটও স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে না। চারজন মানুষ ধীরে ধীরে বুঝতে পারে, তারা শুধু নিজেদের বাড়িতেই আটকা পড়েনি; সম্ভবত পুরো পৃথিবী থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
সিনেমার মূল ভয় কোনো ভূত বা অতিপ্রাকৃত প্রাণীকে ঘিরে নয়। বরং বাড়ি থেকে বের হওয়ার কোনো পথ না থাকাটাই হয়ে ওঠে আতঙ্কের প্রধান কারণ। এই ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে তৈরি হয়েছে সিনেমাটির রহস্য ও উত্তেজনা।
৭ আগস্ট মুক্তির পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবিটি নিয়ে আলোচনা চলছে। দর্শকদের একাংশ এর অস্বস্তিকর পরিবেশ ও রহস্য ধরে রাখার কৌশলের প্রশংসা করেছেন। অন্যদিকে কেউ কেউ মনে করছেন, চমৎকার একটি ধারণাকে শেষ পর্যন্ত দুর্বল চিত্রনাট্যের কারণে পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি সিনেমাটি।
নেটফ্লিক্স ‘দ্য লাস্ট হাউস’-কে সায়েন্স ফিকশন, হরর ও থ্রিলারের মিশ্রণ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে। তবে সমালোচকদের একটি অংশের মতে, ছবিটি ভয় দেখানোর চেয়ে পরিবারের ভেতরের সম্পর্ক ও মানসিক চাপকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।
বাইরের অজানা বিপদের পাশাপাশি চার চরিত্রের পারস্পরিক সম্পর্কও গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। ক্ষুধা, ভয়, অনিশ্চয়তা ও দীর্ঘদিনের বন্দিত্ব ধীরে ধীরে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কেও চাপ তৈরি করে।
সন্তানদের সামনে শক্ত থাকার চেষ্টা করতে গিয়ে মা-বাবাকে নিজেদের ভয় ও উদ্বেগ লুকিয়ে রাখতে হয়। ফলে বাড়িটি একসময় শুধু বাইরের বিপদ থেকে নিরাপদ আশ্রয় থাকে না, বরং চারজন মানুষের জন্য মানসিক বন্দিশালায় পরিণত হয়।
‘দ্য লাস্ট হাউস’-এর অন্যতম বড় আকর্ষণ গ্রেটা লি। ‘পাস্ট লাইভস’ সিনেমার মাধ্যমে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত এই অভিনেত্রী ছবিতে রাইলি চরিত্রে অভিনয় করেছেন। রাইলি একজন মা, যাকে সন্তানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক সামলাতে এবং নিজের ভয় নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।
চরিত্রটিতে বড় কোনো অ্যাকশন দৃশ্যের চেয়ে মুখের অভিব্যক্তি, নীরবতা ও আতঙ্ক প্রকাশের বিষয়টিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে ব্রাজিলিয়ান অভিনেতা ওয়াগনার মৌরা অভিনয় করেছেন জেসন চরিত্রে। ‘নার্কোস’-এ পাবলো এসকোবার চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে পরিচিতি পাওয়া এই অভিনেতা এখানে এমন এক বাবার চরিত্রে অভিনয় করেছেন, যিনি শুরুতে পরিস্থিতির ব্যাখ্যা খুঁজতে চান। কিন্তু সময় যত গড়ায়, বাস্তবতার সঙ্গে তাঁর লড়াই তত কঠিন হয়ে ওঠে।
সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন লুই লেতেরিয়ের। বড় বাজেটের অ্যাকশন ও ফ্যান্টাসি সিনেমা পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে ‘দ্য ইনক্রেডিবল হাল্ক’, ‘নাউ ইউ সি মি’ ও ‘ফাস্ট এক্স’।
তবে ‘দ্য লাস্ট হাউস’-এ তিনি বড় অ্যাকশন সেটের পরিবর্তে প্রায় পুরো গল্পকে একটি বাড়ির মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছেন। সীমিত পরিসরের মধ্যেই রহস্য, আতঙ্ক ও পারিবারিক টানাপোড়েন তৈরি করার চেষ্টা করেছেন পরিচালক।
বিশ্বজুড়ে দর্শকের কাছ থেকে ভালো সাড়া পেলেও সমালোচকদের একটি বড় অংশ সিনেমাটির চিত্রনাট্য নিয়ে হতাশ। সিনেমাবিষয়ক সাইট ডিসাইডার ছবিটিকে দুর্বল সায়েন্স ফিকশন থ্রিলার হিসেবে মূল্যায়ন করেছে। তাদের মতে, শক্তিশালী অভিনয়শিল্পীদের ব্যবহার করেও সিনেমাটি চরিত্রগুলোর যথেষ্ট বিকাশ ঘটাতে পারেনি।
রহস্যময় ঘটনাগুলোর ব্যাখ্যা এবং গল্পের শেষ অংশ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কয়েকজন সমালোচকের মতে, প্রথম দিকে যে রহস্য ও উত্তেজনা তৈরি করা হয়, দ্বিতীয়ার্ধে গিয়ে তার অনেকটাই হারিয়ে যায়। শুরুতে তৈরি হওয়া প্রশ্নগুলোর উত্তরও শেষ পর্যন্ত দর্শকের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।
তারপরও নেটফ্লিক্সে মুক্তির পর দর্শকদের বিপুল আগ্রহ প্রমাণ করছে, রহস্য, বন্দিত্ব ও পারিবারিক টানাপোড়েনের এই মিশ্রণ দর্শকদের কৌতূহল তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
সন্ধানী বার্তা/এসএ