এক্সক্লুসিভ

সংবিধান সংস্কার নিয়ে রাজপথে নামছে ১১ দল, ভাবনায় সংসদ বর্জনও

সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে সরকারের সঙ্গে বিরোধী জোটের দূরত্ব ক্রমেই বাড়ছে। সংসদীয় বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের সরকারি উদ্যোগ প্রত্যাখ্যান করে এবার রাজপথে বড় আন্দোলন গড়ে তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। দাবি আদায়ে ধারাবাহিক লংমার্চের পাশাপাশি ঢাকায় মহাসমাবেশ, কঠোর রাজনৈতিক কর্মসূচি এমনকি সংসদ বর্জনের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।

আন্দোলনের প্রস্তুতি জোরদার করতে ১৫ সদস্যের একটি স্ট্যান্ডিং কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে জোট। এতে রাজনৈতিক নেতাদের পাশাপাশি জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদেরও সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। কমিটির মাধ্যমে জনমত গঠন, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় এবং সংবিধান সংস্কারের পক্ষে রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।

  • সাত দফা দাবি আদায়ে বড় আন্দোলনের প্রস্তুতি
  • ১৫ সদস্যের স্ট্যান্ডিং কমিটি গঠনের উদ্যোগ
  • ঢাকায় মহাসমাবেশের পরিকল্পনা

জোটের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলমান লংমার্চ কর্মসূচি শেষ হওয়ার আগেই নতুন কর্মসূচির বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে। আগামী সপ্তাহে জোটের বৈঠকে আন্দোলনের পরবর্তী ধাপ নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। তবে সংসদ বর্জনসহ অন্যান্য কর্মসূচির বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

গণভোটের রায় বাস্তবায়নই মূল দাবি
১১ দলীয় জোটের নেতাদের বক্তব্য, সংবিধান সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কেবল সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের মতে, জুলাই জাতীয় সনদে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে। এ জন্য নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সমন্বয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন এবং এর কার্যক্রম শুরু করার দাবি জানিয়ে আসছে জোট।

সংবিধান সংশোধনে সরকার গঠিত বিশেষ কমিটিতে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তও বহাল রেখেছে তারা। জোটের শরিক জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহসভাপতি ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান জানান, কমিটি গঠনের সময় সরকার তাদের আমন্ত্রণ জানালেও জোটের বৈঠকে আলোচনা করে সেখানে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দাবি আদায়ে কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। আগামী সপ্তাহের বৈঠক থেকে নতুন কর্মসূচির ঘোষণা আসতে পারে।

আন্দোলনের প্রস্তুতিতে বিশেষ কমিটি
জোটের উদ্যোগে গঠিতব্য ১৫ সদস্যের স্ট্যান্ডিং কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিদের পাশাপাশি জুলাই আন্দোলনের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। সম্ভাব্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন জামায়াতের নায়েবে আমির ও সংসদ সদস্য ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, জোটের প্রধান সমন্বয়ক ড. এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ, সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান মোমেন, এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শিশির মনির এবং জুলাই শহীদ ক্লাবের ইব্রাহিম মুসা। পূর্ণাঙ্গ তালিকা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।

এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারওয়ার তুষার জানিয়েছেন, জোটের সংসদ সদস্যদের নিয়ে একটি কমিটি গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। এই কমিটির মাধ্যমে সাধারণ মানুষসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিদের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। পাশাপাশি ঢাকায় বড় পরিসরে মহাসমাবেশ আয়োজনের বিষয়েও আলোচনা চলছে।

জোটের প্রধান সমন্বয়ক ড. এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সংবিধান সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হবে। এসব আয়োজনে সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, শিক্ষাবিদ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মতামত নেওয়া হবে।

সরকারের পথে সংসদীয় কমিটি, বিরোধীদের আপত্তি
অন্যদিকে, বিদ্যমান সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুসরণ করে সংসদের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনার অবস্থানে রয়েছে বিএনপি সরকার। এ লক্ষ্যে গত ১৩ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়।

১৭ সদস্যের এই কমিটিতে বিরোধী দলের জন্য পাঁচটি পদ রাখা হলেও তাদের পক্ষ থেকে প্রতিনিধি না দেওয়ায় বর্তমানে ১২ সদস্য কার্যক্রম চালাচ্ছেন। সরকারি দলের বক্তব্য, বিরোধীরা প্রতিনিধি দিলে কমিটি পুনর্গঠন করা সম্ভব।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, রাজনৈতিক দল, আইনজ্ঞ, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক, সাংবাদিক, জুলাই যোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের মতামত নিয়ে ডিসেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন তৈরির লক্ষ্য রয়েছে। এরপর ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে সংসদে সংশোধনী বিল উত্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

তবে এই প্রক্রিয়াকে যথাযথ মনে করছে না বিরোধী জোট। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের বক্তব্য অনুযায়ী, জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন আদেশে সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেওয়ার বিধান ছিল। বিরোধী দলের সদস্যরা দুই ধরনের শপথ নিলেও বিএনপির সংসদ সদস্যরা কেবল সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন। তাঁর মতে, সাংবিধানিক বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু এখানেই।

ছাত্রসংগঠনগুলোর বর্জন, বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তাপ
সরকারের বিশেষ কমিটির কার্যক্রম ঘিরে ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যেও বিরোধ দেখা দিয়েছে। গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত কমিটির বৈঠকে ছাত্রদল অংশ নিলেও ইসলামী ছাত্রশিবির, জাতীয় ছাত্রশক্তি ও ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশসহ কয়েকটি সংগঠন তা বর্জন করে। ডাকসুর ভিপি আবু সাদিক কায়েমসহ বিভিন্ন ছাত্র সংসদের নেতারাও বৈঠকে যোগ দেননি।

ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিগবাতুল্লাহর অভিযোগ, গণভোটে প্রায় ৬৯ শতাংশ মানুষের সংস্কারের পক্ষে দেওয়া রায় উপেক্ষা করেই সরকার বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে।

অন্যদিকে, ছাত্রশক্তির সভাপতি আবু বাকের মজুমদার ও সাধারণ সম্পাদক তাহমীদ আল মুদ্দাসসীর চৌধুরী যৌথ বিবৃতিতে কমিটির কার্যক্রমকে অযৌক্তিক আখ্যা দিয়েছেন। তাদের দাবি, বিশেষ কমিটি বাতিল করে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করতে হবে। একই দাবিতে বৈঠক বর্জন করেছে ইসলামী ছাত্র আন্দোলনও।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের দাবি করেছেন, ধারাবাহিক লংমার্চে সাধারণ মানুষের ব্যাপক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। সাত দফা দাবি এখন জোটের গণ্ডি পেরিয়ে জনদাবিতে পরিণত হয়েছে। সামনে আরও লংমার্চ ও ঢাকায় মহাসমাবেশের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।

গণভোটের ফল ঘিরে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর গৃহীত হয় জুলাই জাতীয় সনদ। পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ জারি করেন।

এর ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন অনুষ্ঠিত গণভোটে প্রায় ৬৯ শতাংশ ভোটার সংবিধান সংস্কারের পক্ষে মত দেন। তবে এই রায় বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে সরকার ও বিরোধী জোটের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে।

সরকার সংসদের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের পথে এগোতে চাইলেও জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে পরিবর্তন আনার দাবিতে অনড়। ফলে সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নটি এখন আর কেবল আইনগত বা সংসদীয় বিতর্কে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গণভোটের রায়, জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন এবং দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো নির্ধারণের প্রশ্ন। এ অবস্থায় ১১ দলীয় জোট রাজপথে কতটা শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে এবং সরকার তাদের দাবির বিষয়ে কী অবস্থান নেয়, সেটিই আগামী দিনের রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

সন্ধানী বার্তা/এমডিএইচ/এএএন


সম্পর্কিত খবর