পোশাক শিল্পে চলমান অস্থিরতাকে স্বাভাবিক শ্রমিক আন্দোলন হিসেবে দেখতে নারাজ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তাঁর দাবি, সাধারণ শ্রমিকদের সামনে রেখে একটি মহল পরিকল্পিত রাজনৈতিক সহিংসতা, ষড়যন্ত্র ও রাষ্ট্রবিরোধী অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে। শ্রমিক আন্দোলনের আড়ালে বহিরাগত ও অশ্রমিক ব্যক্তিরা হামলা, অগ্নিসংযোগ এবং ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
বুধবার (৪ নভেম্বর) বিকেলে বাংলাদেশ সচিবালয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর খসড়া পর্যালোচনা সংক্রান্ত আন্তমন্ত্রণালয় সভা শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
- ‘শ্রমিকদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে স্বার্থান্বেষী মহল’— অভিযোগ সালাহউদ্দিন আহমদের
- ১ জানুয়ারি থেকে নতুন মজুরি কাঠামো কার্যকরের লক্ষ্য, অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ না করার নির্দেশ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে
শ্রমিক আন্দোলন, নাকি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র?
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, গার্মেন্টস শ্রমিকদের বর্তমানে কোনো অমীমাংসিত দাবিদাওয়া নেই। অথচ একটি মহল পরিকল্পিতভাবে শিল্প খাতে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে। তাঁর ভাষ্য, এই বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতার সঙ্গে সাধারণ শ্রমিকদের সম্পৃক্ততা নেই। বরং শ্রমিক আন্দোলনের নাম ব্যবহার করে কিছু বহিরাগত ও অশ্রমিক ব্যক্তি অনাকাঙ্ক্ষিত হামলা, অগ্নিসংযোগ ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে।

মন্ত্রী অভিযোগ করেন, তদন্তে অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে থাকা কয়েকজন গার্মেন্টস মালিক, সাবেক সংসদ সদস্য, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক এজেন্ডা ও ভূমিকার বিষয় উঠে এসেছে। পাশাপাশি মাফিয়া ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে পরিচালিত চক্রান্ত বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এসব রাষ্ট্রবিরোধী সহিংসতা কঠোর হাতে দমনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
নতুন মজুরি কাঠামো ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকরের লক্ষ্য
শ্রমিকদের মজুরি প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রতি তিন বছর পরপর নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে মজুরি বোর্ড গঠন ছিল পোশাকশ্রমিকদের প্রধান দাবি। সরকার যথেষ্ট সময় আগেই বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নেয়। শ্রমিক পক্ষের প্রতিনিধি মনোনয়নে কিছুটা সময় লাগায় সামান্য বিলম্ব হলেও নাম পাওয়ার পরপরই বোর্ড গঠন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে বোর্ডের প্রথম সভাও সফলভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সিনিয়র জেলা জজ পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তার নেতৃত্বে গঠিত এই বোর্ডে মালিক ও শ্রমিক—উভয় পক্ষের প্রতিনিধি রয়েছেন। মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে আগামী ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে নতুন মজুরি কাঠামো কার্যকরের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে বোর্ড কাজ করছে বলে জানান মন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার শ্রমিকের জীবনমান উন্নয়ন
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত শ্রমবান্ধব, শ্রমিকবান্ধব ও শিল্পবান্ধব। শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন এবং সার্বিক কল্যাণকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিষয়গুলো বিবেচনার স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। সরকারের মূল লক্ষ্য রপ্তানি বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন এবং নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। সে লক্ষ্যেই শিল্প খাতের স্থিতিশীলতা ও শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান সালাহউদ্দিন আহমদ।
মালিক-শ্রমিক দুই পক্ষের সঙ্গে আলোচনা
মন্ত্রী জানান, সম্প্রতি গার্মেন্টস মালিকদের সঙ্গে সরকারের দীর্ঘ ও ফলপ্রসূ বৈঠক হয়েছে। শ্রমিক নেতাদের সঙ্গেও বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। তাঁর দাবি, উভয় পক্ষই একমত হয়েছেন যে, ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই সাধারণ শ্রমিকদের আন্দোলন নয়; বরং রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে শ্রমিকদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
বলপ্রয়োগে সংযম, অপরাধীদের ছাড় নয়
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকার অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, কোনো অবস্থাতেই যেন প্রয়োজনের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করা না হয়।
তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক সদস্য গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তারপরও তাঁরা সংযম দেখিয়েছেন এবং শ্রমিকদের ওপর বলপ্রয়োগ থেকে বিরত থেকেছেন। তবে এই সুযোগে মাফিয়া ও অপরাধী চক্রকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
শ্রমিকদের কর্মস্থলে ফেরার আহ্বান
সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সাধারণ শ্রমিকদের গুজব ও উসকানিতে কান না দিয়ে অবিলম্বে নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, শ্রমিকরা কাজে ফিরলে শিল্প উৎপাদন সচল থাকবে। একই সঙ্গে সুরক্ষিত থাকবে তাঁদের নিজস্ব কর্মসংস্থান ও জাতীয় অর্থনীতি।ইকবাল সোবহান চৌধুরী আটক প্রসঙ্গে যা বললেন
ইকবাল সোবহান চৌধুরী আটক প্রসঙ্গে যা বললেন
সাংবাদিক ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে আটক নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, যদি তিনি আটক হয়ে থাকেন, তবে তাঁর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ থাকার কারণেই প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি আইন অনুযায়ী খতিয়ে দেখা হবে। প্রেস ব্রিফিংয়ে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সন্ধানী বার্তা/এসআইপি/এএএন