এক্সক্লুসিভ

ঢাকার যানজট নিরসনে মেট্রোরেলের নতুন অগ্রযাত্রা, চার প্যাকেজের চুক্তি স্বাক্ষর

রাজধানী ঢাকাকে আরও গতিশীল, আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব নগরী হিসেবে গড়ে তোলার পথে মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে যুক্ত হয়েছে নতুন গতি। যানজট কমানো, যাতায়াতের সময় সাশ্রয় এবং নগরবাসীর চলাচলকে আরও স্বাচ্ছন্দ্যময় করার লক্ষ্যে এমআরটি লাইন-১ ও এমআরটি লাইন-৫-এর উত্তরাংশের চারটি গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণ প্যাকেজের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে রাজধানীর গণপরিবহন অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়িতে এমআরটি লাইন-৬-এর ডিপো এলাকায় অবস্থিত মেট্রোরেল ভবনের সম্মেলনকক্ষে এই চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ সরকার ও জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার যৌথ অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্প দুটির অবকাঠামো নির্মাণে এসব চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

  • দুই প্রকল্পে ১১.৫০৭ কিলোমিটার উড়াল রেলপথ ও আটটি স্টেশন নির্মাণ
  • লাইন-১-এর ডিপোতে হবে ৪৯টি আধুনিক স্থাপনা
  • বাড়বে আধুনিক গণপরিবহনের সুযোগ

চুক্তির আওতায় এমআরটি লাইন-১-এ ৫.০০৭ কিলোমিটার উড়াল রেলপথ ও তিনটি স্টেশন এবং এমআরটি লাইন-৫-এর উত্তরাংশে ৬.৫০ কিলোমিটার উড়াল রেলপথ ও পাঁচটি স্টেশন নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি দুটি প্রকল্পের ডিপো, পরিচালনাকেন্দ্র, কর্মশালা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে। এমআরটি লাইন-১-এর ডিপোতে নির্মিত হবে মোট ৪৯টি আধুনিক স্থাপনা।

এই অবকাঠামোগত সম্প্রসারণ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার মধ্যে গণপরিবহন সংযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতে দ্রুত, নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য যাতায়াতব্যবস্থা গড়ে তোলার ভিত্তি শক্তিশালী করবে। মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক যত বিস্তৃত হবে, তত বেশি মানুষের জন্য আধুনিক গণপরিবহন ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে মেট্রোরেলের এই সম্প্রসারণ রাজধানীকে আধুনিক, গতিশীল ও পরিবেশবান্ধব নগরী হিসেবে গড়ে তোলার চলমান উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। পরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ, উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার এবং নাগরিকদের যাতায়াতের সুবিধাকে গুরুত্ব দিয়ে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে ঢাকাবাসীর জন্য আরও স্বাচ্ছন্দ্যময় ও নির্ভরযোগ্য গণপরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার পথ সুগম হবে।

আধুনিক গণপরিবহন গড়ে তোলাই মূল লক্ষ্য
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক। স্বাগত বক্তব্য রাখেন ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাওগাতুল আলম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (ভারপ্রাপ্ত সচিব) কবির আহমদ। এ ছাড়া জাপান দূতাবাস, জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা, প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এবং চুক্তি স্বাক্ষরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক বলেন, ‘রাজধানীর যানজট নিরসন ও যাতায়াতের সময় কমানো বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। এ লক্ষ্য অর্জনে আধুনিক, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।’ এসময় তিনি বলেন, ‘নির্মাণকাজে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও গুণগত মান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কোনো আপস করা যাবে না। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ভোগান্তি দীর্ঘায়িত না হয়।’

সড়ক সচিব আরও বলেন, ‘নির্মাণকাজের পরিবেশগত প্রভাব এবং প্রকল্প এলাকার আশপাশে বসবাসকারী মানুষের কল্যাণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ, প্রকৌশলী ও ঠিকাদারদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ও যোগাযোগ নিশ্চিত করার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ঢাকাবাসীর জন্য আধুনিক, দক্ষ ও আরামদায়ক গণপরিবহন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা সম্ভব হবে।’

আধুনিক গণপরিবহনব্যবস্থা একটি নগরীর যোগাযোগব্যবস্থাকে গতিশীল করার পাশাপাশি মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, কর্মঘণ্টার ব্যবহার এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। সচিবের গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যে মেট্রোরেল সম্প্রসারণের পাশাপাশি জনবান্ধব উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও গুণগত মানের ওপর গুরুত্ব প্রতিফলিত হয়েছে।

চার প্যাকেজে বিস্তৃত হচ্ছে মেট্রোরেলের অবকাঠামো
এমআরটি লাইন-১-এর চুক্তি প্যাকেজ সিপি-০২-এর আওতায় ডিপোর পূর্ত ও ভবন নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা হবে। এই প্যাকেজে কর্মশালা, রেলগাড়ি রাখার ছাউনি, পরিচালনা ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রসহ মোট ৪৯টি আধুনিক স্থাপনা নির্মাণ করা হবে। এ কাজের জন্য ‘সিনোহাইড্রো-এসইবিসিএল যৌথ উদ্যোগ’-এর সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। মেট্রোরেলের নিয়মিত পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ডিপো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে রেলগাড়ি সংরক্ষণ, কারিগরি পরীক্ষা, পরিচর্যা এবং পরিচালনাসংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পন্ন হবে। পরিকল্পিত এসব স্থাপনা ভবিষ্যতে নির্ভরযোগ্য রেলসেবা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত ভিত্তি তৈরি করবে।

এমআরটি লাইন-১: ৫.০০৭ কিলোমিটার উড়াল রেলপথ, তিনটি নতুন স্টেশন
এমআরটি লাইন-১-এর চুক্তি প্যাকেজ সিপি-০৭-এর আওতায় পাতালপথ থেকে উড়ালপথে উত্তরণের স্থান থেকে বালু নদীর শুরু পর্যন্ত ৫.০০৭ কিলোমিটার উড়াল রেলপথ নির্মাণ করা হবে। এ অংশে জোয়ার সাহারা, বোয়ালিয়া ও মস্তুল—এই তিনটি উড়াল স্টেশন নির্মিত হবে। এই কাজের জন্য ‘সিআরইসি-এমআইএল-এমবিইসি যৌথ উদ্যোগ’-এর সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।

নতুন এই অংশের অবকাঠামো রাজধানীর মেট্রোরেল নেটওয়ার্ককে আরও বিস্তৃত করার সুযোগ তৈরি করবে। পাশাপাশি স্টেশনগুলো চালু হলে সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দাদের আধুনিক গণপরিবহন ব্যবহারের সুযোগ বাড়বে। কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য গন্তব্যে যাতায়াতের ক্ষেত্রে মেট্রোরেলকে আরও কার্যকর বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনাও তৈরি হবে।

এমআরটি লাইন-৫-এর উত্তরাংশ: গড়ে উঠবে আধুনিক ডিপো
এমআরটি লাইন-৫-এর উত্তরাংশের চুক্তি প্যাকেজ সিপি-০২-এর আওতায় ডিপোর প্রশাসনিক ভবন, পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র, রেলগাড়ি রাখার প্রাঙ্গণ, গুদাম এবং কর্মশালার ছাউনিসহ বিভিন্ন পূর্তকাজ সম্পন্ন করা হবে। এ কাজের জন্য ‘সিপিসি-হানিল যৌথ উদ্যোগ’-এর সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ডিপোর এসব অবকাঠামো প্রকল্পটির পরিচালনাগত সক্ষমতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। রেলগাড়ি সংরক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ ব্যবস্থাপনা এবং দৈনন্দিন পরিচালনার জন্য পরিকল্পিত সুযোগ-সুবিধা তৈরি হলে ভবিষ্যৎ রেলসেবা আরও সুসংগঠিতভাবে পরিচালনার ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হবে।

এমআরটি লাইন-৫-এর উত্তরাংশ: ৬.৫০ কিলোমিটার উড়াল রেলপথ ও পাঁচটি স্টেশন
এমআরটি লাইন-৫-এর উত্তরাংশের চুক্তি প্যাকেজ সিপি-০৩-এর আওতায় হেমায়েতপুর থেকে আমিনবাজার এবং নতুন বাজার থেকে ভাটারা পর্যন্ত মোট ৬.৫০ কিলোমিটার উড়াল রেলপথ নির্মাণ করা হবে। একই সঙ্গে হেমায়েতপুর, বালিয়াপুর, বিলামালিয়া, আমিনবাজার ও ভাটারা—এই পাঁচটি উড়াল স্টেশন নির্মাণ করা হবে। এই কাজের জন্য ‘সিআরইসি-এমআইএল-এমবিইসি যৌথ উদ্যোগ’-এর সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।

এই অংশের নির্মাণকাজ রাজধানীর গণপরিবহন নেটওয়ার্কের বিস্তারে নতুন মাত্রা যোগ করবে। একাধিক এলাকায় মেট্রোরেলের অবকাঠামো সম্প্রসারিত হলে বৃহত্তর নগরাঞ্চলের মানুষের জন্য আধুনিক গণপরিবহন ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানোর পথ তৈরি হবে। বিশেষ করে বাসসহ অন্যান্য পরিবহনব্যবস্থার সঙ্গে কার্যকর সংযোগ প্রতিষ্ঠা করা গেলে যাত্রীদের দৈনন্দিন যাতায়াত আরও সহজ ও সুশৃঙ্খল করার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

যাতায়াতে সময় সাশ্রয়, নগরজীবনে নতুন সম্ভাবনা
ঢাকার ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও যাতায়াতের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে গণপরিবহন অবকাঠামো সম্প্রসারণ এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মেট্রোরেলের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, এটি নির্দিষ্ট পথে দ্রুতগতিতে বিপুলসংখ্যক যাত্রী পরিবহনের সুযোগ সৃষ্টি করে। ফলে সড়কনির্ভর যাতায়াতের বিকল্প হিসেবে এ ব্যবস্থা নগরবাসীর কাছে আরও কার্যকর হয়ে উঠতে পারে। মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হলে কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার যাত্রীদের যাতায়াতের সুযোগ বাড়বে। যাতায়াতে সময় সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হলে মানুষ কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা, ব্যবসা ও পারিবারিক জীবনে সময় আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারবেন। একই সঙ্গে নির্ভরযোগ্য গণপরিবহনব্যবস্থা নগরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল রাখতেও সহায়তা করতে পারে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, চারটি নির্মাণ প্যাকেজের চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে এমআরটি লাইন-১ ও এমআরটি লাইন-৫-এর উত্তরাংশের অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম আরও এগিয়ে গেল। দুটি প্রকল্পের আওতায় উড়াল রেলপথ, আটটি স্টেশন এবং আধুনিক ডিপো অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ রাজধানীর গণপরিবহনব্যবস্থাকে সম্প্রসারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। প্রকল্পগুলোর পরিকল্পিত বাস্তবায়ন ঢাকার যাতায়াতব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি করবে। নতুন স্টেশন ও রেলপথের সঙ্গে বিদ্যমান পরিবহনব্যবস্থার সংযোগ বাড়ানো গেলে যাত্রীদের চলাচল আরও সহজ হবে।

সন্ধানী বার্তা/এমএএএমকে


সম্পর্কিত খবর