নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের সঙ্গে তাল মেলাতে সংসারের বাজেট নতুন করে সাজাতে হচ্ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে। চাল, ডাল, তেল, সবজি ও মাছ-মাংসের মতো প্রয়োজনীয় পণ্যে আয়ের বড় অংশ ব্যয় হওয়ায় শিক্ষা, চিকিৎসা, যাতায়াত ও সঞ্চয়ের মতো অন্যান্য খাতে খরচের পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে হচ্ছে অনেককে। মূল্যস্ফীতির ওঠানামার মধ্যেও বাজারে পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখার প্রত্যাশা বাড়ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতির প্রভাব শুধু বাজারের কেনাকাটায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি পরিবারের সামগ্রিক ব্যয় পরিকল্পনা ও জীবনযাত্রার ওপরও প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে যেসব পরিবারের আয়ের বড় অংশ খাদ্যপণ্যে ব্যয় হয়, তাদের ক্ষেত্রে নিত্যপণ্যের দামের পরিবর্তনও মাসিক বাজেটে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।
- আয়ের তুলনায় ব্যয়ের চাপ বেশি
- সঞ্চয় ও প্রয়োজন মেটাতে হিসাব কষছেন পরিবারগুলো
ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এক চাকরিজীবী জানান, কয়েক মাস আগেও মাসের বাজার করতে আট থেকে ১০ হাজার টাকা খরচ হতো। এখন একই ধরনের কেনাকাটায় ব্যয় হচ্ছে ১৩ থেকে ১৪ হাজার টাকা। অথচ গত দুই বছরে বেতন বাড়েনি। এর সঙ্গে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে যাতায়াত ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে সংসারের প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে প্রতি মাসেই নতুন করে হিসাব করতে হচ্ছে।
শহরের পাশাপাশি গ্রামেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় নিয়ে ভাবতে হচ্ছে পরিবারগুলোকে। আয় ও ব্যয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য রাখতে অনেকেই কেনাকাটার অগ্রাধিকার নির্ধারণ করছেন। একই সঙ্গে দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয়ের সুযোগ ধরে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মূল্যস্ফীতির হারে ওঠানামা
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত জুনে দেশে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.১৬ শতাংশ। জুলাইয়ে তা কমে ৮.৩২ শতাংশ এবং আগস্টে ৮.২৬ শতাংশে দাঁড়ায়। সেপ্টেম্বরে আবার সামান্য বেড়ে হয় ৮.৩৪ শতাংশ। অর্থাৎ, আগের দুই মাসে মূল্যস্ফীতির হার কমার পর সেপ্টেম্বরে তাতে কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে।
খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে। বিবিএসের তথ্যমতে, আগস্টে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭.০২ শতাংশ, সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭.২২ শতাংশে। অন্যদিকে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি আগস্টের ৯.৩২ শতাংশ থেকে কমে সেপ্টেম্বরে ৯.৩০ শতাংশ হয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মূল্যস্ফীতির হার কমার অর্থ বাজারে পণ্যের দাম আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া নয়। বরং দাম বাড়ার গতি কমলেও পণ্যের মূল্য আগের তুলনায় বেশি থাকতে পারে। ফলে মূল্যস্ফীতি কমার পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় থাকাও সাধারণ মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
মজুরি বৃদ্ধির সঙ্গে ব্যয়ের সমন্বয়
বিবিএসের তথ্যানুযায়ী, সেপ্টেম্বরে সাধারণ মজুরি সূচকের বার্ষিক বৃদ্ধির হার ছিল ৭.৯০ শতাংশ। আগের মাসে তা ছিল ৮.০৫ শতাংশ এবং জুলাইয়ে ৮.২২ শতাংশ। একই সময়ে সেপ্টেম্বরে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৩৪ শতাংশ। অর্থাৎ, মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে ০.৪৪ শতাংশীয় পয়েন্ট কম ছিল।
এই ব্যবধান পরিবারের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। আয় যে হারে বাড়ছে, তার তুলনায় পণ্য ও সেবার ব্যয় বেশি বাড়লে একই আয় দিয়ে আগের মতো কেনাকাটা করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে পরিবারগুলোকে প্রয়োজনীয় খাতগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে ব্যয় পরিকল্পনা করতে হচ্ছে। জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়ও পণ্যের দামের সঙ্গে সম্পর্কিত। পরিবহন ব্যয় বাড়লে কৃষিপণ্যসহ বিভিন্ন পণ্য বাজারে পৌঁছানোর খরচ বাড়তে পারে। পাশাপাশি উৎপাদন, সংরক্ষণ ও সরবরাহব্যবস্থার ব্যয় এবং আমদানি পণ্যের ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়হার ও বন্দর ব্যয়ও বাজারদরে প্রভাব ফেলতে পারে।
সঞ্চয় ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ
মূল্যস্ফীতির প্রভাবে পরিবারের নিয়মিত ব্যয়ের পাশাপাশি জরুরি চিকিৎসা, সন্তানের শিক্ষা এবং ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তার জন্য সঞ্চয় ধরে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে মাসিক খরচ বাড়লে সঞ্চয়ের সুযোগ সংকুচিত হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে মূল্যস্ফীতি মজুরি বৃদ্ধির হারকে ছাড়িয়ে গেলে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা চাপে পড়তে পারে। তাই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষার সুযোগ বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ।
সামগ্রিকভাবে, মূল্যস্ফীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে পরিবারের বাজেট ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি বাজারে পণ্যের নিয়মিত সরবরাহ ও মূল্যস্থিতির বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতি হলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ব্যয় পরিকল্পনা সহজ হবে এবং শিক্ষা, চিকিৎসা ও সঞ্চয়ের মতো প্রয়োজনীয় খাতে অর্থ বরাদ্দের সুযোগ বাড়তে পারে।
সন্ধানী বার্তা এমএসএএকে/এমকে