রাজধানীর রামপুরায় দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী মো. আল-আমিন ওরফে ‘পিচ্চি আল-আমিন’-এর বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান চালিয়েছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। ধারাবাহিক অভিযানে আল-আমিনসহ তার ছয় সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অভিযানে উদ্ধার হয়েছে বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি ও দেশীয় অস্ত্র। এসআরবির দাবি, আল-আমিনকে গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদ এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তার সহযোগীদের অবস্থান শনাক্ত করা হয়। এরপর একের পর এক অভিযানে বেরিয়ে আসে আরও অস্ত্রের সন্ধান।
- তিন দফা অভিযানে আল-আমিনসহ গ্রেপ্তার ৬
- উদ্ধার দুই বিদেশি রিভলবার, পিস্তল, ম্যাগাজিন ও ১৪ রাউন্ড গুলি
এক অভিযানে ‘মূল টার্গেট’, পরের অভিযানে সহযোগীরা
এসআরবি-৩ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন জানান, গত ১ অক্টোবর দুপুর সাড়ে ১টার দিকে রামপুরা থানার টিভি রোড এলাকায় অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে পিচ্চি আল-আমিন, তার দুই সহযোগী কামাল উদ্দিন ও খাইরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে একটি বিদেশি রিভলবার ও পাঁচ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়।
আল-আমিনকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একই দিন সন্ধ্যায় রামপুরার কুঞ্জবন এলাকায় অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে গ্রেপ্তার করা হয় তার আরও দুই সহযোগী মো. সোহাগ হাওলাদার ওরফে মামুন এবং মো. রিফাত ইসলামকে। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় লোহার তৈরি দুটি দেশীয় ছুরি।
তথ্যপ্রযুক্তিতে শনাক্ত কাওছার, এরপরই মিলল অস্ত্রের বড় চালান
অভিযানের তৃতীয় ধাপে সামনে আসে আল-আমিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী মো. কাওছার খানের নাম। এসআরবির ভাষ্য অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদ ও গোয়েন্দা তথ্য থেকে কাওছারের কাছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র থাকার তথ্য পাওয়া যায়। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তার অবস্থান শনাক্ত করে ৩ অক্টোবর সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে কুঞ্জবন এলাকায় অভিযান চালিয়ে কাওছারকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এরপর কাওছারের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একই রাতে খিলগাঁও থানার ভূঁইয়াপাড়ায় একটি টিনশেড ঘরে অভিযান চালায় এসআরবি। সেখান থেকেই উদ্ধার করা হয় একটি বিদেশি রিভলবার, একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন ও নয় রাউন্ড গুলি। অর্থাৎ ধারাবাহিক অভিযানে উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের পরিমাণ দাঁড়ায় দুইটি বিদেশি রিভলবার, একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন এবং মোট ১৪ রাউন্ড গুলি। এর সঙ্গে উদ্ধার হয়েছে দুটি দেশীয় ছুরিও।
‘গ্যাংপ্রধান’ না হলেও অপরাধী জড়ো করতেন ঢাকায়
আল-আমিন কোনো গ্যাংয়ের প্রধান কি না—সংবাদ সম্মেলনে এমন প্রশ্নও ওঠে। জবাবে এসআরবি-৩ এর অধিনায়ক বলেন, তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আল-আমিন তার সমমনা এবং নিজের কাজের উপযোগী মনে করা ব্যক্তিদের বরগুনা ও ঝালকাঠি অঞ্চল থেকে ঢাকায় এনে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন। আল-আমিনের বাড়ি ঝালকাঠিতে। তার পাঁচ সহযোগীর মধ্যে চারজনের বাড়িও একই জেলায় এবং একজনের বাড়ি বরগুনায় বলে জানিয়েছে এসআরবি।
রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রশ্নেও এসআরবির ‘অপরাধী’ তকমা
আল-আমিনের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় রয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে এসআরবি-৩ এর অধিনায়ক বলেন, ২০১১ সাল থেকে বিভিন্ন সরকারের আমলে তার বিরুদ্ধে মামলা পাওয়া গেছে। এসআরবির ভাষ্য, আল-আমিন ‘স্বভাবগত অপরাধী’। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকার সময় কেউ তার মাধ্যমে সুযোগ নিয়ে থাকতে পারে; তবে আল-আমিন নিজেই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন বলে দাবি সংস্থাটির।
২৭ মামলা, হত্যা মামলারও আসামি
এসআরবির আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী জানান, গ্রেপ্তার আল-আমিন সন্ত্রাসী ইয়াছিন খান পলাশ ওরফে ‘কাইল্লা পলাশ’ হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে রাজধানীর খিলগাঁও, রামপুরা, হাতিরঝিল ও গুলশান থানায় বিস্ফোরকদ্রব্য আইন, হত্যা ও অস্ত্র আইনে করা মামলাসহ মোট ২৭টি মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে এসআরবি।
রামপুরায় স্বস্তি, এখন নজর সহযোগীদের নেটওয়ার্কে
আল-আমিন গ্রেপ্তারের পর রামপুরা এলাকার মানুষ খুশি হয়েছেন বলে জানিয়েছেন এসআরবি-৩ এর অধিনায়ক। তবে ছয়জনকে গ্রেপ্তার ও বিপুল অস্ত্র উদ্ধারের পরও তদন্তের বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে—এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে আরও কারা জড়িত এবং অস্ত্রগুলো কোথা থেকে এসেছে। এসআরবির ধারাবাহিক অভিযানে যে তথ্য ও অস্ত্রের সন্ধান মিলেছে, তা এখন তদন্তে নতুন দিক উন্মোচন করতে পারে। বিশেষ করে ঢাকার বাইরে থেকে লোক এনে রাজধানীতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগটি যাচাই করে দেখাই হবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
কালের আলো/এমএসআইপি/এমকে