সময়কে আরও নিখুঁতভাবে পরিমাপের ক্ষেত্রে নতুন মাইলফলক তৈরি করেছেন সিঙ্গাপুরের গবেষকেরা। দেশটির ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর (NUS) ও Centre for Quantum Technologies (CQT)-এর গবেষকেরা লুটেসিয়াম আয়ন ব্যবহার করে এমন একটি অপটিক্যাল পারমাণবিক ঘড়ি তৈরি করেছেন, যেটিকে তাঁরা বিশ্বের সবচেয়ে নির্ভুল ঘড়ি হিসেবে দাবি করছেন। গবেষণার ফলাফল ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ Nature সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষকদের হিসাবে, ঘড়িটির নির্ভুলতা দশমিকের পর ১৯তম ঘর পর্যন্ত যাচাই করা সম্ভব হয়েছে। এতটাই স্থিতিশীল এই ঘড়ি যে এক সেকেন্ড পিছিয়ে যেতে এর ২৬০ বিলিয়ন বছরেরও বেশি সময় লাগবে। গবেষকেরা দুটি লুটেসিয়াম ঘড়ির সময়ের সংকেত পরস্পরের সঙ্গে তুলনা করে এই নির্ভুলতা যাচাই করেছেন।
গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন NUS-এর পদার্থবিদ ও CQT-এর প্রধান গবেষক মারে ব্যারেট। তাঁর ভাষ্য, বর্তমান ফলাফলের ভিত্তিতে তিনি আত্মবিশ্বাসী যে তাঁদের তৈরি ঘড়িই এখন বিশ্বের সবচেয়ে নির্ভুল ঘড়ি। এই সাফল্যের পেছনে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে লুটেসিয়াম নিয়ে গবেষণা ও সূক্ষ্ম প্রকৌশলগত কাজ করেছে দলটি।
কীভাবে কাজ করে এই ঘড়ি?
পারমাণবিক ঘড়িতে পরমাণুর শক্তিস্তরের পরিবর্তনকে সময়ের অত্যন্ত নির্ভুল মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করা হয়। নতুন এই ঘড়িতে ব্যবহার করা হয়েছে একটি একক চার্জযুক্ত লুটেসিয়াম-১৭৬ আয়ন। নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের লেজার দিয়ে আয়নটির ইলেকট্রনের শক্তিস্তর পরিবর্তনের সঙ্গে লেজারের কম্পাঙ্ককে মিলিয়ে নেওয়া হয়। সেই লেজারের অত্যন্ত স্থির দোলনই ঘড়ির ‘টিক’ হিসেবে কাজ করে।
লুটেসিয়ামকে বেছে নেওয়ার অন্যতম কারণ এর বিশেষ পারমাণবিক বৈশিষ্ট্য। তাপমাত্রা ও চৌম্বক ক্ষেত্রের পরিবর্তনের মতো পরিবেশগত প্রভাবের প্রতি এটি অন্যান্য অনেক ব্যবহৃত পরমাণুর তুলনায় কম সংবেদনশীল। ফলে বিভিন্ন পরিবেশেও এর ঘড়ির কম্পাঙ্ককে অত্যন্ত স্থিতিশীল রাখা সম্ভব।
গবেষকদের দাবি, এই বৈশিষ্ট্যের কারণে লুটেসিয়ামভিত্তিক ঘড়ি ভবিষ্যতে গবেষণাগারের বাইরেও ব্যবহারযোগ্য হতে পারে। মারে ব্যারেটের দল জানিয়েছে, পৃথিবীর অত্যন্ত উষ্ণ পরিবেশ থেকে অ্যান্টার্কটিকার অত্যন্ত ঠান্ডা পরিবেশ—বিস্তৃত তাপমাত্রার পরিসরেও ঘড়িটি নির্ভুলতা ধরে রাখার সম্ভাবনা রয়েছে।
শুধু সময় মাপাই নয়
অতি-নির্ভুল পারমাণবিক ঘড়ির ব্যবহার শুধু সময় গণনায় সীমাবদ্ধ নয়। বিজ্ঞানীরা এগুলো ব্যবহার করে পৃথিবীর মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের অত্যন্ত ক্ষুদ্র পরিবর্তন শনাক্ত করতে পারেন। কারণ উচ্চতার সামান্য পার্থক্যও অত্যন্ত নির্ভুল ঘড়ির চলার গতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
এ ধরনের প্রযুক্তি ভবিষ্যতে পৃথিবীর ভূত্বকের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ, উন্নত নেভিগেশন এবং মৌলিক পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে অজানা কণা, ডার্ক ম্যাটার কিংবা বর্তমান পদার্থবিজ্ঞানের তত্ত্বের বাইরে থাকা নতুন কোনো প্রভাব খুঁজে দেখার ক্ষেত্রেও অতি-নির্ভুল ঘড়ি কাজে লাগতে পারে।
গবেষকদের সামনে এখন আরেকটি লক্ষ্য—ল্যাবরেটরিতে থাকা বড় আকারের এই ঘড়িকে আরও ছোট করে বহনযোগ্য করা। গবেষক মাইকেল লি জানিয়েছেন, পরবর্তী ধাপে তাঁরা ঘড়িটিকে এমনভাবে ক্ষুদ্র করতে চান, যাতে এর নির্ভুলতা বজায় রেখেই এটিকে গবেষণাগারের বাইরে নেওয়া যায়।
বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, লুটেসিয়ামভিত্তিক এই প্রযুক্তির আরও উন্নয়ন হলে ভবিষ্যতে ‘এক সেকেন্ড’ কীভাবে সংজ্ঞায়িত হবে, সেই আন্তর্জাতিক মানদণ্ডেও পরিবর্তনের পথ খুলে যেতে পারে।
সূত্র: Centre for Quantum Technologies, Nature
সন্ধানী বার্তা/এসএ