অর্থনীতি

ব্যাংক খাতে খেলাপির ‘দুই মেরু’

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের চিত্র এখন যেন একই মানচিত্রে আঁকা দুই বিপরীত বাস্তবতা। একদিকে এমন ব্যাংক রয়েছে, যেখানে ঋণের খুব সামান্য অংশ অনাদায়ী; অন্যদিকে কয়েকটি ব্যাংকের প্রায় পুরো ঋণপোর্টফোলিওই খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গত জুনের তথ্য বলছে, দেশের ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। বিতরণ করা মোট ঋণের বিপরীতে এর হার ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ।

  • একদিকে ০.৩৩%, অন্যদিকে ৯৭ শতাংশ
  • কম খেলাপির তালিকায়
  • এগিয়ে নতুন প্রজন্মের ব্যাংক
  • মোট খেলাপি ঋণের ৭২ শতাংশই ১০ ব্যাংকে

সবচেয়ে কম খেলাপি কমিউনিটি ব্যাংকে
শতকরা হারে সবচেয়ে কম খেলাপি ঋণ রয়েছে নতুন প্রজন্মের কমিউনিটি ব্যাংকে। গত জুন শেষে ব্যাংকটির মোট বিতরণ করা ঋণ ছিল ১ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়েছে মাত্র ৫ কোটি টাকা। ফলে মোট ঋণের বিপরীতে খেলাপির হার দাঁড়িয়েছে শূন্য দশমিক ৩৩ শতাংশ।

তবে কমিউনিটি ব্যাংকের এই হার বিশ্লেষণের সময় ঋণপোর্টফোলিওর আকারও বিবেচনায় নিতে হয়। কারণ তুলনামূলক কম ঋণ বিতরণ করা প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের অনুপাত বড় ব্যাংকের তুলনায় ভিন্ন বাস্তবতা তৈরি করতে পারে। তাই শুধু শতাংশের ভিত্তিতে ব্যাংকের সামগ্রিক ঋণমান বিচার করলে চিত্রটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

বড় ঋণপোর্টফোলিওতেও ব্র্যাকের খেলাপি কম
কম খেলাপি ঋণের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ব্র্যাক ব্যাংকের চিত্রটি তুলনামূলকভাবে আলাদা। গত জুন শেষে ব্যাংকটির বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ৭৫ হাজার ৬২১ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ ১ হাজার ৫৪৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ খেলাপির হার ২ দশমিক ০৫ শতাংশ।

ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খান বলেন, ঋণঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং অনুমোদনের ক্ষেত্রে সুশাসন ও যথাযথ ঝুঁকি মূল্যায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, গ্রাহকের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা যাচাই করে নিরপেক্ষভাবে ঋণ দেওয়ার কারণেই খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে। সম্প্রতি ফোর্বসের বিশ্বের সেরা পারফর্মিং ৫০০ ব্যাংকের তালিকায় ব্র্যাক ব্যাংকের স্থান পাওয়াও প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক পারফরম্যান্সের আরেকটি দিক সামনে এনেছে।

পূবালীর ঋণে প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া
কম খেলাপি ঋণের হারে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে পূবালী ব্যাংক। গত জুন শেষে ব্যাংকটির মোট ঋণ ছিল ৭২ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ ১ হাজার ৭৮৯ কোটি টাকা। খেলাপির হার ২ দশমিক ৪৬ শতাংশ। ব্যাংকটির এমডি মোহাম্মদ আলী জানিয়েছেন, ঋণ অনুমোদনে কোনো ব্যক্তি বা শীর্ষ কর্মকর্তার একক সুপারিশের ওপর নির্ভর করা হয় না। নিয়মতান্ত্রিক মূল্যায়নের মধ্য দিয়েই ঋণ অনুমোদন করা হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে গ্রাহকের ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক পরিচয়ও বিবেচনায় নেওয়া হয় না।

পূবালীর বড় ঋণের উল্লেখযোগ্য অংশ খাদ্য ও খাদ্যসামগ্রী, শিক্ষা, চিকিৎসা, আবাসন এবং পোশাকের মতো প্রয়োজনীয় খাতে গেছে। ব্যাংকটির মতে, খাতভিত্তিক এই ঋণবণ্টন খেলাপি কম থাকার একটি কারণ।

নিয়ন্ত্রিত খেলাপির তালিকায় আরও সাত ব্যাংক
কম খেলাপি ঋণের তালিকায় এরপর রয়েছে সিটিজেনস ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, সিটি ব্যাংক ও ইস্টার্ন ব্যাংক। গত জুন শেষে সিটিজেনস ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ছিল ২ দশমিক ৬৫ শতাংশ, প্রাইম ব্যাংকের ২ দশমিক ৭৪ শতাংশ এবং সিটি ব্যাংকের প্রায় ৩ শতাংশ। ইস্টার্ন ব্যাংকে এই হার ৩ দশমিক ২৮ শতাংশ। সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিন বলেন, স্বাধীন ঋণ অনুমোদন ব্যবস্থা এবং ঋণের বৈচিত্র্য খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করেছে। বিশেষ করে এসএমই ও ভোক্তা ঋণের ওপর গুরুত্ব দেওয়াকে তিনি ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।

অষ্টম থেকে ১৩তম অবস্থানে রয়েছে যমুনা ব্যাংক, বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক, শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক ও সীমান্ত ব্যাংক। এসব ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার যথাক্রমে ৩ দশমিক ৩৫, ৪ দশমিক ০৭, ৪ দশমিক ১৯, ৪ দশমিক ৩৬, ৪ দশমিক ৮২ ও ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ।

বিপরীত প্রান্তে একীভূত ব্যাংকগুলো
খেলাপি ঋণের হারের বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে কয়েকটি একীভূত ব্যাংকে। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের মোট ঋণের ৯৭ দশমিক ০৮ শতাংশই খেলাপি। ইউনিয়ন ব্যাংকে খেলাপির হার ৯৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে ৭৮ দশমিক ১৫ শতাংশ এবং এক্সিম ব্যাংকে ৭০ দশমিক ৮১ শতাংশ ঋণ খেলাপি। এ ছাড়া ন্যাশনাল ব্যাংকের ৬৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ, আইএফআইসি ব্যাংকের ৬৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ এবং এবি ব্যাংকের ৫৬ দশমিক ৪ শতাংশ ঋণ খেলাপি হয়ে আছে। রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকেও খেলাপি ঋণের হার ৪৩ দশমিক ৯৮ শতাংশ।

এই পরিসংখ্যানগুলো শুধু কয়েকটি ব্যাংকের দুর্বল ঋণমানের চিত্র নয়; ব্যাংকিং খাতে ঋণ অনুমোদন, ঝুঁকি মূল্যায়ন ও পুনরুদ্ধার ব্যবস্থার বড় পার্থক্যও সামনে আনে।

১০ ব্যাংকেই আটকে ৪ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকা
মোট খেলাপি ঋণের কেন্দ্রীভবন সমস্যাটিকে আরও স্পষ্ট করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, গত জুনে মাত্র ১০ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ পুরো ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের প্রায় ৭২ শতাংশই রয়েছে এই ১০ প্রতিষ্ঠানে।

পরিমাণের হিসাবে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ ইসলামী ব্যাংকে—৯৮ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা। ব্যাংকটির মোট ঋণের ৫২ দশমিক ১৫ শতাংশ এখন খেলাপি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণ রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকে, ৭৫ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা। সেখানে মোট ঋণের ৭৫ দশমিক ০৫ শতাংশ খেলাপি। ফলে খেলাপি ঋণের সমস্যা যে ব্যাংকভেদে ব্যাপকভাবে অসম, তা স্পষ্ট। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিপুল খেলাপি পুরো খাতের গড় হারকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করছে।

পুনরুদ্ধারই বড় পরীক্ষা
ব্যাংকভেদে খেলাপি ঋণের এই বিস্তর ব্যবধান থেকে অন্তত একটি বিষয় পরিষ্কার—ঋণ বিতরণের পরিমাণের পাশাপাশি ঋণ অনুমোদনের মান, গ্রাহক যাচাই, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং পুনরুদ্ধার কাঠামোও ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। ফলে খেলাপি ঋণের হার কমানোই শেষ কথা নয়; বরং যেসব ঋণ ইতিমধ্যে অনাদায়ী হয়ে পড়েছে, সেগুলো কতটা দ্রুত ও কার্যকরভাবে আদায় করা যায়, সেটিই এখন বড় পরীক্ষা। একই সঙ্গে নতুন করে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ সৃষ্টি ঠেকাতে কঠোর যাচাই ও জবাবদিহির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ খেলাপি ঋণের পাহাড় কমানো না গেলে ব্যাংকের তারল্য, মূলধন ও ঋণ দেওয়ার সক্ষমতার ওপর চাপ আরও বাড়বে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত পুরো অর্থনীতিতেই পড়বে।

এম/এএইচ


সম্পর্কিত খবর