জাতীয়

এফডিসির গণ্ডি পেরিয়ে পুরো চলচ্চিত্র শিল্পের আধুনিকায়ন, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-উপদেষ্টার বক্তব্যে এক সুর

একসময় বাংলাদেশের সিনেমা শুধু বিনোদন দেয়নি। কথা বলেছে সমাজের কথা। জায়গা করে নিয়েছে মানুষের হৃদয়ে। সেই ঐতিহ্যের স্মৃতিচারণ চলতি বছরের ‘ফিল্ম ডিরেক্টরস ডে’-এর মঞ্চে। চলচ্চিত্র শিল্পের বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কীভাবে ভবিষ্যতের পথ তৈরি করা যায়, সে বিষয়েও মিলেছে স্পষ্ট বার্তা। একই মঞ্চে বক্তব্য রেখেছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান এমপি, তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী এমপি এবং প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।

  • আধুনিক অবকাঠামো ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় সরকারের 
  • মানসম্মত নির্মাণ থেকে পূর্ণাঙ্গ উন্নয়ন পরিকল্পনা—তিন নীতিনির্ধারকের বক্তব্যে অভিন্ন প্রত্যয়

তিন নীতিনির্ধারকের বক্তব্যে চলচ্চিত্র উন্নয়নের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে। মানসম্মত ও অর্থবহ চলচ্চিত্র নির্মাণ, এফডিসির গণ্ডি পেরিয়ে পুরো শিল্পের উন্নয়ন এবং আধুনিক অবকাঠামো ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা—তাঁদের বক্তব্যের মূল সুর ছিল এসব বিষয়কে কেন্দ্র করেই। প্রয়োজনীয় সহযোগিতার কথাও জানিয়েছেন তাঁরা। বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) বিকেলে বিএফডিসি অডিটোরিয়ামে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি আয়োজিত ‘ফিল্ম ডিরেক্টরস ডে ২০২৬’ অনুষ্ঠানে মূলত দেশের চলচ্চিত্র শিল্পকে নতুনভাবে বিকশিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে সরকার।

একটি সময় সিনেমার বার্তা হৃদয়ে গেঁথে যেত
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান বলেন, ‘একটি সময় সিনেমা যে বার্তা দিতো, তা আমরা হয়তো চোখ দিয়ে দেখতাম কিন্তু তা আমাদের হৃদয়ে গেঁথে যেত। প্রতিটি সিনেমায় নিজস্ব চরিত্র ও স্পষ্ট বার্তা থাকা উচিত। প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার আমজাদ হোসেনসহ গুণী নির্মাতাদের প্রতিটি সিনেমায় সামাজিক ও মানবিক বার্তা ছিল।’ আগামী দিনে মানসম্পন্ন চলচ্চিত্র নির্মাণের আহ্বান জানিয়ে তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা চাই সবাই মিলে আগামীতে এমন কাজ করতে, যাতে আমাদের চলচ্চিত্রগুলো আবার কথা বলে।

সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে সমাজের বাস্তবতা বদলেছে। বর্তমানে বহু তরুণ মাদকের ভয়াবহতায় জড়িয়ে পড়ছে, যা সমাজের জন্য বিশাল ক্ষতি। এর পাশাপাশি সমাজে নানাবিধ বৈষম্য রয়েছে। এই সংকট থেকে সমাজকে পথ দেখাতে শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে আমাদের চলচ্চিত্র নির্মাতারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করবেন।’ চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নয়নে বর্তমান সরকারের আন্তরিকতার কথা উল্লেখ করে আন্দালিভ রহমান বলেন, ‘আমরা সবাই একসাথে কাজ করলে বাংলাদেশের সিনেমাকে আবারো তার পুরোনো ও গৌরবোজ্জ্বল জায়গায় নিয়ে যেতে পারবো, ইনশাআল্লাহ।’

চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নয়নে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
দেশের চলচ্চিত্র শিল্পকে নতুনভাবে বিকশিত করতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করছে সরকার বলে জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নয়নে একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা প্রণয়নের নির্দেশনা দিয়েছেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নয়নে করণীয়, বাস্তবায়ন কৌশল এবং প্রয়োজনীয় সরকারি সহযোগিতাসহ একটি সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করে উপস্থাপন করা হবে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘সরকার শুধু এফডিসির উন্নয়ন নয়, বরং সামগ্রিক চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। অতীতে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে যেসব গুণী পরিচালক, প্রযোজক, অভিনেতা ও অভিনেত্রী অসাধারণ কাজ করেছেন, সেই ঐতিহ্যকে সামনে রেখে চলচ্চিত্রের মান ও শিল্পের সক্ষমতা আরও বাড়াতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা এমন একটি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছি, যার মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ গ্রহণ করে চলচ্চিত্র শিল্পের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও দপ্তরকে আরও কার্যকর করা যাবে। এফডিসিও এ পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।’

চলচ্চিত্রের গুণীজনদের উদ্দেশে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নয়নে নেতৃত্ব দেবেন এ শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ ও গুণী ব্যক্তিরাই। সরকার তাদের পাশে থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে।’ চলচ্চিত্র অঙ্গনের মানুষদের সঙ্গে সাক্ষাতের আগ্রহ থেকেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছেন উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, তিনি অতীতেও এফডিসিতে এসেছেন এবং ভবিষ্যতেও চলচ্চিত্র শিল্পের মানুষদের সঙ্গে নিয়ে ও তাদের পাশে থেকে কাজ করবেন।

আধুনিক অবকাঠামো ও পূর্ণাঙ্গ রূপরেখার প্রত্যয়
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, বর্তমান সরকার ও প্রধানমন্ত্রী দেশের চলচ্চিত্রের স্বকীয়তা ও গৌরব ফিরিয়ে আনতে আগ্রহী। চলচ্চিত্র খাতের বর্তমান সংকট কাটিয়ে আধুনিক পরিকাঠামো গড়ে তুলতে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা তৈরি করা হবে। তিনি জানান, চলচ্চিত্র ও এফডিসির উন্নয়নে কী কী করা প্রয়োজন, সে বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট চাওয়া হয়েছে এবং শিগগিরই প্রয়োজনীয় উদ্যোগ বাস্তবায়নের দিকে এগোনো হবে। নিজের চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহের কথাও জানিয়ে জাহেদ উর রহমান বলেন, একসময় তিনিও ফিল্মমেকার হতে চেয়েছিলেন।

সম্মাননায় গুণীজন, গানে সাবিনা
‘ফিল্ম ডিরেক্টরস ডে ২০২৬’ উপলক্ষে চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতি অঙ্গনে অবদানের জন্য বরেণ্য কণ্ঠশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন ও বিশিষ্ট মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ফরিদুর রেজা সাগরকে বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হয়। এছাড়া চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মাসুদ পারভেজ (সোহেল রানা), প্রখ্যাত পরিচালক এ জে মিন্টু, প্রযোজক ও অভিনেতা কাজী হায়াৎ, চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব ও বীর মুক্তিযোদ্ধা দেলোয়ার জাহান ঝন্টু, পরিচালক ড. মতিন রহমান এবং মশিউদ্দীন শাকেরসহ চলচ্চিত্র অঙ্গনের গুণীজনদের সম্মাননা জানানো হয়।

অনুষ্ঠানে অনুভূতি প্রকাশ করে সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘ছোটবেলায় তিনি প্রতিদিন এফডিসিতে রেকর্ডিং করতেন। এই প্রাঙ্গণ থেকে হাজার হাজার কালজয়ী গান সৃষ্টি হয়েছে। চলচ্চিত্র পরিচালকদের কারণেই তিনি আজ সাবিনা ইয়াসমিন হতে পেরেছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। পরে অতিথি ও দর্শকদের অনুরোধে গান পরিবেশন করেন বরেণ্য এই শিল্পী।

এর আগে শান্তির প্রতীক পায়রা উড়িয়ে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করা হয়। স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সভাপতি শাহীন সুমন। অনুষ্ঠানে সমিতির মহাসচিব শাহীন কবির টুটুল, বিএফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুমা তানিসহ চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক, অভিনয়শিল্পী, কলাকুশলী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।

এমএএএমকে


সম্পর্কিত খবর