ছয় বছরে পুলিশের দেড় শতাধিক সদস্যের ডোপ টেস্টে মাদকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। এত দিন সেই তালিকায় ছিলেন কনস্টেবল থেকে পরিদর্শক পর্যায়ের সদস্যরা। এবার প্রথমবারের মতো তালিকায় যুক্ত হলেন একজন পুলিশ সুপার (এসপি)। পুলিশ সুপার (টিআর) আ ফ ম নিজাম উদ্দিনের মূত্রের নমুনায় বেনজোডায়াজেপিন (বিজেডও) এবং অ্যামফিটামিন/মেথঅ্যামফিটামিন শনাক্ত হওয়ার পর তাঁকে সরকারি চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
গত ১০ সেপ্টেম্বর জননিরাপত্তা বিভাগের পুলিশ-১ শাখা থেকে এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। একজন এসপি পর্যায়ের কর্মকর্তার ডোপ টেস্টে মাদকের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার ঘটনা পুলিশের মাদকবিরোধী ব্যবস্থাপনায় নতুন নজির তৈরি করেছে। একই সঙ্গে সামনে এনেছে দীর্ঘদিনের একটি প্রশ্ন-ডোপ টেস্ট কি কেবল মাঠপর্যায়ের সদস্যদের জন্য, নাকি পদমর্যাদা নির্বিশেষে পুরো বাহিনীর জন্য একই নিয়ম কার্যকর হবে?
১২০ থেকে দেড় শতাধিক
পুলিশে ডোপ টেস্টের মাধ্যমে মাদক শনাক্তকরণ কার্যক্রম শুরু হয় ২০২০ সালে। ঢাকা মহানগর পুলিশ সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জুলাই পর্যন্ত ১২০ সদস্যের শরীরে মাদকের উপস্থিতি পাওয়া যায়। ২০২৪ সাল পর্যন্ত সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৩৪ জনে। তাঁদের মধ্যে ৯৮ জনই ছিলেন কনস্টেবল।
অন্যদের মধ্যে ছিলেন নায়েক, এসএসআই, এসআই, ট্রাফিক সার্জেন্ট ও পরিদর্শক। পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে, ২০২০ সাল থেকে এ পর্যন্ত ডোপ টেস্টে মাদক শনাক্ত হওয়া সদস্যের সংখ্যা দেড় শতাধিক। কিন্তু এত দিন এএসপি বা তার ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের কোনো কর্মকর্তার নাম সেই তালিকায় ছিল না।
আ ফ ম নিজাম উদ্দিনের ঘটনায় সেই চিত্র বদলেছে। ফলে পুলিশের ডোপ টেস্ট কার্যক্রমে শুধু শনাক্ত সদস্যের সংখ্যা নয়, পরীক্ষার আওতা ও নীতির সমতা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
কোর্সের মধ্যেই শনাক্ত
সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ডিএসসিএসসি-২০২৬ কোর্সে অংশ নিতে গত ৮ জানুয়ারি পুলিশ অধিদপ্তর থেকে মিরপুর সেনানিবাসে যান আ ফ ম নিজাম উদ্দিন। কোর্স চলাকালে গত ৭ জুন অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নেওয়া হয়।
সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার অংশ হিসেবে তাঁর ডোপ টেস্ট করা হয়। পরীক্ষায় তাঁর মূত্রের নমুনায় বেনজোডায়াজেপিন এবং অ্যামফিটামিন/মেথঅ্যামফিটামিন পজিটিভ পাওয়া যায়।
সরকারি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, পরীক্ষার ফলাফল সামরিক বাহিনী কমান্ড ও স্টাফ কলেজের চলমান কোর্সের শৃঙ্খলার পরিপন্থী। ঘটনাটিকে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর বিধি ৩(খ) অনুযায়ী ‘অসদাচরণ’ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে একই বিধিমালার ১২(১) অনুযায়ী তাঁকে সরকারি চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। আদেশের কার্যকারিতা ধরা হয়েছে ৩১ আগস্ট ২০২৬ থেকে। সাময়িক বরখাস্তকালীন তিনি বিধি অনুযায়ী খোরপোষ ভাতা পাবেন।
এত দিন কেন নিচের পদগুলোতে?
পুলিশে ডোপ টেস্ট শুরু হওয়ার পর শনাক্তদের বড় অংশই কনস্টেবল। ২০২২ সালের জুলাই পর্যন্ত শনাক্ত ১২০ জনের মধ্যে ৮৪ জন কনস্টেবল ছিলেন। পরবর্তী সময়েও কনস্টেবলদের সংখ্যাই ছিল বেশি। অন্যদের মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ের অধস্তন কর্মকর্তা ও পরিদর্শক ছিলেন।
এতে প্রশ্ন উঠেছে, ডোপ টেস্টের আওতা কি বাস্তবে বাহিনীর সব স্তরে সমান ছিল? মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের একটি অংশ বলছেন, ডোপ টেস্ট নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। তবে এএসপি থেকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এত দিন নিয়মিত পরীক্ষার আওতায় না থাকায় বাহিনীর ভেতরে সবার জন্য সমান নিয়মের দাবি ছিল।
তাঁদের যুক্তি, মাদক ব্যবহারের ঝুঁকি পদমর্যাদার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় না। ফলে কনস্টেবলকে পরীক্ষা করে এসপি বা তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে পরীক্ষার বাইরে রাখলে মাদকমুক্ত বাহিনী গড়ার নীতি পুরোপুরি কার্যকর হবে না।
২০২৪-এর পর কমেছে তৎপরতা
ডোপ টেস্টের ধারাবাহিকতা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ২০২৪ সালের পর পুলিশের ডোপ টেস্ট নিয়ে আগের মতো তৎপরতা নেই। ফলে নিয়মিতভাবে সব সদস্যের পরীক্ষা হচ্ছে, নাকি সন্দেহের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট সদস্যদের পরীক্ষা করা হচ্ছে-তা স্পষ্ট নয়।
এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সন্দেহভাজন সদস্যকে পরীক্ষা করলে নির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে শনাক্ত করা সম্ভব হলেও পুরো বাহিনীর মধ্যে মাদক ব্যবহারের প্রকৃত চিত্র পাওয়া কঠিন। নিয়মিত ও আকস্মিক ডোপ টেস্ট চালু থাকলে পদমর্যাদা বা ব্যক্তিগত পরিচয়ের প্রভাব ছাড়াই ঝুঁকিপূর্ণ সদস্য শনাক্ত করা সম্ভব।
২০২২ সালের জুলাইয়ে ১২০ জন শনাক্ত হওয়ার পর ২০২৪ সালে সংখ্যাটি ১৩৪-এ পৌঁছায়। এরপর পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে তা দেড় শতাধিক হয়েছে। কিন্তু মাঝের সময়ের পরীক্ষার ধরন ও ব্যাপ্তি নিয়ে স্পষ্ট তথ্য না থাকায় ডোপ টেস্ট কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
শুধু শাস্তি নয়, প্রতিরোধও জরুরি
পুলিশে মাদক শনাক্ত হলে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তবে ডোপ টেস্টকে শুধু শাস্তি দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে দেখলে এর মূল উদ্দেশ্য পূরণ হবে না। মাদক ব্যবহারকারী সদস্যদের শনাক্ত করার পাশাপাশি তাঁদের চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনের সুযোগও থাকা দরকার।
একই সঙ্গে ডোপ টেস্টের ফল নিশ্চিত করার বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া কঠোর হওয়া জরুরি। কোনো সদস্য চিকিৎসকের পরামর্শে নির্দিষ্ট ওষুধ গ্রহণ করেছেন কি না, সেটিও যাচাইয়ের আওতায় থাকা প্রয়োজন। এতে পরীক্ষার ফলের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়বে এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাও হবে আরও নির্ভুল।
পুলিশ বাহিনীর ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পুলিশ সদস্যদের হাতে আইন প্রয়োগের ক্ষমতা রয়েছে। তাঁরা মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করেন, মাদক কারবারিদের গ্রেপ্তার করেন এবং মাদকসংক্রান্ত মামলার তদন্ত করেন। ফলে বাহিনীর ভেতরে মাদক ব্যবহারের ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত শৃঙ্খলার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জনআস্থা ও আইন প্রয়োগের বিশ্বাসযোগ্যতাও জড়িত।
সবার জন্য একই পরীক্ষা?
এসপি পর্যায়ের একজন কর্মকর্তার ডোপ টেস্টে মাদকের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার পর সব পর্যায়ের কর্মকর্তাকে পরীক্ষার আওতায় আনার দাবি আরও জোরালো হতে পারে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ভবিষ্যতে এএসপি থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও ডোপ টেস্টের আওতায় আনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
এ ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর হলে পুলিশের মাদকবিরোধী নীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে। তবে শুধু ঘোষণা নয়, নিয়মিত পরীক্ষা, আকস্মিক নমুনা সংগ্রহ, নির্ভরযোগ্য পরীক্ষাগার এবং ফলাফল যাচাইয়ের একটি স্বচ্ছ কাঠামো প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো-পরীক্ষার ক্ষেত্রে পদমর্যাদা যেন কোনোভাবেই বিবেচ্য না হয়। কনস্টেবল থেকে এসপি, সবার জন্য একই নীতি কার্যকর হলেই ডোপ টেস্টের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে।
প্রথম এসপি, সামনে বড় পরীক্ষা
২০২০ সালে শুরু হওয়া ডোপ টেস্টে দেড় শতাধিক পুলিশ সদস্যের শরীরে মাদকের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার পর এবার প্রথম এসপি পর্যায়ের কর্মকর্তা সেই তালিকায় যুক্ত হলেন। ঘটনাটি তাই কেবল একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নেওয়া প্রশাসনিক ব্যবস্থা নয়; এটি পুলিশের মাদকবিরোধী নীতির কার্যকারিতা যাচাইয়েরও একটি বড় মুহূর্ত। এখন দেখার বিষয়, আ ফ ম নিজাম উদ্দিনের ঘটনায় বিষয়টি সাময়িক আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি পুলিশ বাহিনীর ডোপ টেস্ট ব্যবস্থায় স্থায়ী পরিবর্তন আনে।
এম/এএইচ