বাংলাদেশে মেয়েদের শিক্ষায় গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সক্ষমতা এখনো বড় বাধা। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের অনেক শিক্ষার্থী মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিকের পর অর্থনৈতিক চাপের কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে না। এমন বাস্তবতায় কিশোরগঞ্জে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদে মাছের পোনা অবমুক্ত, স্থানীয় জেলেদের মধ্যে মাছের পোনা বিতরণ ও স্থানীয় মানুষের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়কালে বড় এক সুসংবাদ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, নারীদের শিক্ষার সুযোগ আরও বিস্তৃত করতে অনার্স পর্যন্ত তাদের শিক্ষা ফ্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার সব খরচ বহন করবে সরকার।
রোববার (১৬ আগস্ট) দুপুর ১২টার দিকে কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলায় স্থানীয় জেলেদের মধ্যে মাছের পোনা বিতরণ ও স্থানীয় মানুষের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘দেশনেত্রী খালেদা জিয়া যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন, তখন নারীদের শিক্ষা ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত ফ্রি করে দিয়েছিলেন। দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। এই নারী সমাজকে যদি আমরা পিছিয়ে রাখি, তাহলে দেশকে সামনে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। সে কারণেই বর্তমান সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, নারীদের অনার্স পর্যন্ত শিক্ষা ফ্রি করে দেওয়া হবে। সব খরচ বহন করবে সরকার।’
- নারীর ক্ষমতায়নে নতুন দিগন্ত
- অনার্স পর্যন্ত নারীশিক্ষা ফ্রি
- বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে কঠোরভাবে প্রতিরোধ
- ১৭ বছরের জনগণের আন্দোলনে তাদের রাজপথে দেখা যায়নি
- অব্যবহৃত জলাশয় লিজ পাবে তরুণরা
- নতুন উদ্যোক্তাদের ৫ কোটি পর্যন্ত অনুদান
বিশ্লেষকরা মনে করেন, নারীশিক্ষায় সরকারি এই বিনিয়োগকে শুধু ব্যয় হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব অনুধাবণ করা সম্ভব নয়। একে দেখতে হবে দীর্ঘমেয়াদি মানবসম্পদ বিনিয়োগ হিসেবেই। কারণ, একটি মেয়ের উচ্চশিক্ষায় সরকারি বিনিয়োগের সুফল শুধু সেই শিক্ষার্থীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা পরিবার, সমাজ এবং অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের নারীশিক্ষা নীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘এখানে অনেক বোন ও সন্তানতুল্য মেয়েরা আছে। তোমাদের ভালোভাবে মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া করতে হবে, যাতে বড় হয়ে তোমরা এই দেশের হাল ধরতে পারো। শুধু তাই নয়, যেসব মেয়েরা ভালো ফলাফল করবে, তাদের জন্য সরকার থেকে উপবৃত্তিরও ব্যবস্থা করা হবে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে থাকা হাজার হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গরিব পরিবারের শিশুদের আমরা সরকারের পক্ষ থেকে বছরে একবার স্কুল ড্রেস দিতে চাই। শুধু স্কুল ড্রেস নয়, প্রায় এক কোটি ২০ লাখ শিশুর হাতে স্কুল ব্যাগও পৌঁছে দিতে চাই। প্রতিবছর নতুন বই দেওয়ার পাশাপাশি তাদের নতুন স্কুল ব্যাগ ও স্কুল ড্রেসও আমরা ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে চাই। নারীদের স্বাবলম্বী করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের নারী সমাজকে যেমন শিক্ষায় সামনে এগিয়ে নিতে চাই, একইভাবে তাদের স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে চাই। নির্বাচনের আগে আমরা বলেছিলাম, বাংলাদেশের চার কোটি পরিবারের মধ্যে যে নারী পরিবারের প্রধান ও সংসার পরিচালনা করেন, পর্যায়ক্রমে তার হাতে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়া হবে। আল্লাহর রহমতে ফ্যামিলি কার্ডের কাজও শুরু হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি ঘরে এই কার্ড পৌঁছে দেওয়া হবে। এরই অংশ হিসেবে আজ কিশোরগঞ্জ জেলায় ফ্যামিলি কার্ডের কার্যক্রম উদ্বোধন করা হচ্ছে।
মাছের পোনা অবমুক্ত প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজ এখানে যে মাছের পোনা অবমুক্ত করা হলো, এসব মাছ যখন বড় হবে, ডিম পাড়বে এবং বিভিন্ন খাল-বিলে ছড়িয়ে পড়বে, তখন এর উপকার কারা পাবেন? লন্ডনের মানুষ, নাকি জাপানের মানুষ? বাংলাদেশের মানুষই এর উপকার পাবে।’ অনুষ্ঠানে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম, মৎস্যজীবী ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রী মির্জাপুর চেয়ারম্যান বাড়িঘাট এলাকায় পৌঁছালে স্থানীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ তাকে স্বাগত জানান। পরে তিনি পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদে মাছের পোনা অবমুক্ত করেন।
বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে কঠোরভাবে প্রতিরোধ
যারা রাজপথে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করতে চাইবে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তাদের কঠোরভাবে প্রতিরোধ করা হবে বলে হুঁশিয়ার করেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ‘জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬’ উপলক্ষে রোববার (১৬ আগস্ট) দুপুরে কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ায় মির্জাপুর চেয়ারম্যান বাড়ি ঘাট এলাকায় পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদে মাছের পোনা অবমুক্তকরণ ও বিতরণ কার্যক্রম শেষে আয়োজিত সমাবেশে তিনি এ কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, পতিত স্বৈরাচারের রেখে যাওয়া ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশ পুনর্গঠনের কাজ চলছে। এ অবস্থায় যারা রাজপথে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করতে চাইবে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তাদের কঠোরভাবে প্রতিরোধ করা হবে। যেকোনো সংকট মোকাবিলায় দেশবাসীকে ধৈর্য ধারণের আহ্বান জানিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, সংকটের সুযোগ নিয়ে কিছু ব্যক্তি রাজপথে বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করছে। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ও ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যারা দেশের মানুষের বিরুদ্ধে কথা বলবে, জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপে বাধা সৃষ্টি করবে, তাদের ব্যাপারে সতর্ক থেকে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। তারেক রহমান বলেন, এখন সময় রাষ্ট্র মেরামতের, দেশ পুনর্গঠনের। আপনারা নির্বাচনের সময় যে সমর্থন দিয়েছেন, সেই আস্থার ওপর ভরসা রাখুন। আপনাদের নির্বাচিত দল বিএনপি অতীত ও বর্তমানে জনগণের স্বার্থে কাজ করেছে এবং ভবিষ্যতেও দেশ ও জনগণের স্বার্থের বাইরে কোনো কাজ করবে না।
দেশে চলমান বিদ্যুৎ সংকট প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বৈরাচার সরকার দেশের অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ সব ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে পালিয়েছে। তাদের অপরিকল্পিত মেগা প্ল্যানের কারণেই আজ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে এই চরম সংকট। তবে আগামী ২৭ তারিখে শুরু হতে যাওয়া জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সরকারের পক্ষ থেকে আগামী ১০ বছরে কীভাবে দেশের বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করা হবে, তার একটি মাস্টারপ্ল্যান জাতির সামনে উপস্থাপন করা হবে।
‘বিভ্রান্তকারী ও রটনাকারীদের’ বিষয়ে জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান
এদিন বিকেলে কিশোরগঞ্জের পুরাতন স্টেডিয়ামে আয়োজিত এক বিশাল সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশ পুনর্গঠন ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখতে ‘বিভ্রান্তকারী ও রটনাকারীদের’ বিষয়ে জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেছেন, যারা বিগত ১৭ বছরের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে মাঠে ছিল না, তারাই এখন বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে এবং সংস্কারের বড় বড় কথা বলছে। অনুষ্ঠান থেকে প্রধানমন্ত্রী দেশব্যাপী ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণ, মেধাবী শিক্ষার্থী, অসুস্থ, দুস্থ ও শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অনুদান এবং মসজিদের ইমাম, মন্দিরের পুরোহিতসহ অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ের প্রতিনিধিদের সম্মানী প্রদান কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে অনেক বিভ্রান্তকারী ও রটনাকারী আছে। তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। দেখতে হবে, অতীতে তাদের ভূমিকা কী ছিল। ’৭১, ’৮৬ কিংবা ’৯৬ সালে তারা কী করেছে। বিগত ১৭ বছরের জনগণের আন্দোলনে তাদের রাজপথে দেখা যায়নি। গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে বিএনপি ও তার মিত্ররা। আর এখন তারা সংস্কারের কথা বলছে। অথচ দেশে সবচেয়ে আগে সংস্কারের প্রস্তাব বিএনপি তথা খালেদা জিয়ার নেতৃত্বেই ২০২২ সালে উপস্থাপন করা হয়েছিল। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নে দেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, কোনো বিভ্রান্তকারীর কথায় কান দেওয়া যাবে না। তারা বিভ্রান্ত করতে এলে তাদের সমুচিত জবাব দিতে হবে।
স্বাস্থ্যসেবা প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, গ্রামের মানুষকে যাতে সামান্য অসুখেই জেলা শহর বা ঢাকায় ছুটতে না হয়, সেজন্য বর্তমান সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে-আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের ৫৫৩টি উপজেলার প্রতিটি ৫০ শয্যার হাসপাতালকে ১৫১ শয্যার হাসপাতালে উন্নীত করা হবে। শিগগিরই এর কাজ শুরু হবে। শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের রূপরেখা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা সিলেবাস এমনভাবে তৈরি করতে চাই, যেন একজন শিক্ষার্থী দ্বাদশ শ্রেণি পাস করার পরই আত্মনির্ভরশীল হতে পারে। পড়ালেখার পাশাপাশি তারা যেন দুটি বিদেশি ভাষায় কথা বলতে পারে এবং যেকোনো একটি খেলা বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে পারদর্শী হয়। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের চালু করা ‘নতুন কুঁড়ি’ আমরা আবার শুরু করেছি। আমাদের লক্ষ্য, ক্রীড়াও যাতে একটি পেশা হতে পারে, সেভাবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তোলা।
তিনি জানান, সম্প্রতি সরকারের আয়োজনে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ২২ লাখ ছেলে-মেয়ে দেশব্যাপী ফুটবল প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে। বিগত সরকারের সমালোচনা করে তারেক রহমান বলেন, গত চার বছর ধরে (২০২২ সালের পর থেকে) ১ লাখ ২৩ হাজার শিক্ষক অবসর ভাতা পাচ্ছিলেন না। স্বৈরাচারের আমলে সেই টাকা নয়-ছয় করে আত্মসাৎ করা হয়েছিল। আপনাদের নির্বাচিত বিএনপি সরকার গতকালই সেই শিক্ষকদের পেনশনের ব্যবস্থা করেছে এবং ভাতার বড় অংশ তাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছে।

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাজেটে সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় ৬০টি পণ্যের ওপর ট্যাক্স কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে কেউ সুযোগ নিয়ে দাম বাড়াতে না পারে। আল্লাহর রহমতে, অতীতের মতো এবার বাজেট দেওয়ার পর জিনিসপত্রের দাম বাড়েনি। জনগণের স্বস্তির কথা মাথায় রেখেই সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
কৃষকদের সেচ সুবিধা ও গ্রামীণ মানুষের পানিসংকট দূর করতে খাল খনন কর্মসূচির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সারা দেশে আগামী ২০ বছরে আমরা ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করব। পাশাপাশি ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে আমরা দেশের মানুষকে অর্থনৈতিকভাবে আত্মনির্ভরশীল করতে চাই। বিদেশি বিনিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি জানান, চীনের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে চট্টগ্রামে অনেক নতুন কলকারখানা তৈরি হবে। সেখানে দেশের বেকার তরুণ-তরুণীদের ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বিএনপির রাজনীতি দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের রাজনীতি-এমন মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, কয়েকটি রাস্তা বা বিল্ডিং তৈরি করে আমরা বলতে চাই না যে দেশ বানিয়ে ফেলেছি। আমাদের রাজনীতি দেশের মানুষকে ঘিরে। সবার আগে বাংলাদেশ এবং সবার জন্য বাংলাদেশ-এটাই আমাদের লক্ষ্য।
অব্যবহৃত জলাশয় লিজ পাবে তরুণরা, নতুন উদ্যোক্তাদের ৫ কোটি পর্যন্ত অনুদান
দেশের আনাচে-কানাচে পড়ে থাকা অব্যবহৃত খাল-বিল ও জলাশয়গুলো সংস্কার করে মাছ চাষের জন্য স্থানীয় তরুণদের মাঝে বরাদ্দ দেওয়া হবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একইসঙ্গে নতুন শিল্প উদ্যোক্তা তৈরিতে সরকার ৫০০ কোটি টাকার স্টার্ট-আপ ফান্ড গঠন করেছে, যেখান থেকে সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাদের ৫ লাখ থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত অনুদান (ঋণ নয়) দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। রোববার (১৬ আগস্ট) কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে ‘জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন এবং জাতীয় মৎস্য পুরস্কার-২০২৬ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

তারেক রহমান বলেন, সমগ্র বাংলাদেশে অনেক হাওর, বিল ও পুকুর বিনা কারণে পড়ে রয়েছে। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি এগুলো সংস্কার করে সরকারের পক্ষ থেকে মাছের পোনা ছাড়ব। এরপর যে এলাকায় জলাশয়টি অবস্থিত, সেই এলাকার তরুণদের মাঝে তা সুন্দরভাবে বণ্টন করা হবে যাতে তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, প্রযুক্তি নির্ভর কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে বর্তমান সরকার ৫০০ কোটি টাকার স্টার্ট-আপ ফান্ড গঠন করেছে। সম্ভাবনাময় নতুন উদ্যোক্তাদের এই ফান্ড থেকে ৫ লাখ থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত অনুদান দেওয়া হবে। এটি ঋণ নয়, গ্রান্ট। আমি নতুন উদ্যোক্তাদের এই সুযোগ গ্রহণ করার আহ্বান জানাই।
মৎস্য খাতের অভাবনীয় সফলতার চিত্র তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিশ্বের ৫২টি দেশে মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে। গত জুনে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) রিপোর্ট অনুযায়ী, জলজ প্রাণী উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম এবং অভ্যন্তরীণ জলাশয় থেকে মাছ আহরণে দ্বিতীয়।
তিনি জানান, খুলনায় ৩০০টি ক্লাস্টার গঠনের মাধ্যমে চিংড়ির উৎপাদন দ্বিগুণ করা হয়েছে। পাশাপাশি কক্সবাজারের চকরিয়ায় ৭ হাজার একর জমিতে ‘শ্রিম্প সিটি মাস্টার প্ল্যান’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এছাড়া দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনে জিআই পণ্য ইলিশের অবদান প্রায় ১০ শতাংশ, যা জিডিপির ১ শতাংশেরও বেশি। মূলত ২০০৩-০৪ সালে বিএনপি সরকারের সময় নেওয়া ‘ইলসা ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট অ্যাকশন প্ল্যান’-এর কারণেই ইলিশের ব্যাপক উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে।
মৎস্যচাষি ও জেলেদের জীবনমান উন্নয়নের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের প্রায় ২ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মৎস্য খাতের ওপর নির্ভরশীল। মৎস্যচাষিদের কৃষক কার্ডের আওতায় আনা হচ্ছে। জেলেদের পরিচয়পত্র প্রদান ও নিবন্ধন চলছে। এছাড়া প্রথমবারের মতো ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সুন্দরবন ও হাওর অঞ্চলে মাছ ধরা নিষিদ্ধকালীন জেলেদের ভিজিএফের আওতায় আনা হয়েছে। নিত্যনতুন বাজার খোঁজার অংশ হিসেবে গত জুনে প্রথমবারের মতো নাইজেরিয়াতে হ্যাচিং ডিম রপ্তানি করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
জলাশয় দূষণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের ব্যবহৃত আবর্জনা, টিস্যু পেপার ও প্লাস্টিকের বোতলের কারণে জলাশয়গুলোর পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। মাছকে বাঁচাতে হলে পরিবেশ রক্ষায় সবাইকে সচেতন হতে হবে। সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলেই আগামী প্রজন্ম এবং প্রাণিসম্পদ রক্ষা পাবে। ‘রুপালী মৎস্য স্বনির্ভর দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ এবারের মৎস্য পক্ষের এই প্রতিপাদ্য তুলে ধরে ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাতকে কাজে লাগিয়ে একটি পুষ্টিসমৃদ্ধ, আত্মনির্ভরশীল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানিয়ে ‘জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬’ এর শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
কালের আলো/এএএন/এমডিএইচ