বিনোদন

‘দৃশ্যম’-এর মূল গল্পের স্রষ্টা কিংবদন্তি জাপানি ঔপন্যাসিক কেইগো হিগাশিনো আর নেই

বিশ্বজুড়ে রহস্য ও গোয়েন্দা সাহিত্যের পাঠকদের জন্য গভীর শোকের খবর। জনপ্রিয় জাপানি রহস্য ঔপন্যাসিক কেইগো হিগাশিনো আর নেই। কোলোরেক্টাল ক্যান্সারের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই শেষে বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) ভোরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৮ বছর।

সোমবার (২৭ জুলাই) লেখকের অফিসিয়াল এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট থেকে তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়। খবরটি প্রকাশের পরপরই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি পাঠক, সাহিত্যপ্রেমী এবং চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভক্তরা স্মরণ করছেন এমন একজন লেখককে, যিনি রহস্য, মনস্তত্ত্ব এবং মানবিক সম্পর্ককে অনন্য দক্ষতায় তুলে এনে বিশ্বসাহিত্যে নিজের জন্য তৈরি করেছিলেন এক আলাদা আসন।

সাহিত্যজীবনের শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না হিগাশিনোর। লেখক হওয়ার আগে তিনি একটি মোটরগাড়ির যন্ত্রাংশ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানে প্রকৌশলী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। চাকরির ব্যস্ততার মধ্যেও লেখালেখির প্রতি ভালোবাসা কখনো কমেনি। অবসর সময়েই লিখতেন গল্প ও উপন্যাস।

তাঁর সেই পরিশ্রমের স্বীকৃতি আসে ১৯৮৫ সালে। ওই বছর প্রকাশিত তাঁর উপন্যাস ‘আফটার স্কুল’ জাপানের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ এদোগাওয়া রাম্পো পুরস্কার অর্জন করে। এই সাফল্যের পর প্রকৌশলীর চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন তিনি।

দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে কেইগো হিগাশিনো প্রকাশ করেছেন ১০৬টি বই। শুধু জাপানেই তাঁর বই বিক্রি হয়েছে ১০ কোটিরও বেশি কপি, যা তাঁকে দেশটির সর্বাধিক জনপ্রিয় ও সফল লেখকদের একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

তাঁর বই বিশ্বের বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং রহস্যসাহিত্যের পাঠকদের কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক নির্ভরযোগ্য নাম। সূক্ষ্ম প্লট, অপ্রত্যাশিত মোড়, মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং মানবিক সম্পর্কের গভীরতা ছিল তাঁর লেখার প্রধান বৈশিষ্ট্য।

ভারতীয় সিনেমাপ্রেমীদের কাছেও কেইগো হিগাশিনো একটি পরিচিত নাম। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য ডিভোশন অব সাসপেক্ট এক্স’-এর মূল ভাবনা ও রহস্য নির্মাণশৈলী থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি হয়েছে বলিউডের বহুল আলোচিত ব্লকবাস্টার ‘দৃশ্যম’। একই উপন্যাসের প্রভাব দেখা যায় নেটফ্লিক্সের জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ‘জানে জান’-এও।

এছাড়া বলিউডের আরেক আলোচিত ছবি ‘মনিকা, ও মাই ডার্লিং’ নির্মিত হয়েছে তাঁর ‘হার্ট অব ব্রুটাস’ গল্প থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে।

হিগাশিনোর গল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল সাধারণ মানুষের জীবনকে ঘিরে অসাধারণ রহস্য তৈরি করা। সেই কারণেই তাঁর গল্প বারবার চলচ্চিত্র নির্মাতাদের আকৃষ্ট করেছে।

কেইগো হিগাশিনোর সৃষ্ট দুটি চরিত্র বিশ্বজুড়ে বিশেষ জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

এর একটি হলো পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও অসাধারণ বিশ্লেষণী ক্ষমতার অধিকারী ডিটেকটিভ গ্যালিলিও (মানাবু ইউকাওয়া)। অন্যটি টোকিও পুলিশের মানবিক ও বুদ্ধিদীপ্ত তদন্ত কর্মকর্তা ইনস্পেক্টর কাগা।

এই দুই চরিত্রকে কেন্দ্র করে অসংখ্য উপন্যাস, টেলিভিশন সিরিজ এবং চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে, যা জাপানের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক দর্শকদের কাছেও ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।

সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য জীবদ্দশায় বহু সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন কেইগো হিগাশিনো।

২০০৬ সালে তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘দ্য ডিভোশন অব সাসপেক্ট এক্স’ অর্জন করে মর্যাদাপূর্ণ নাওকি পুরস্কার।

এরপর ২০১৪ সালে ‘দ্য ফাইনাল কার্টেন’ উপন্যাসের জন্য তিনি লাভ করেন ইয়োশিকাওয়া এইজি সাহিত্য পুরস্কার।

এই দুটি পুরস্কারই জাপানি সাহিত্যের অন্যতম সর্বোচ্চ স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হয়।

কেইগো হিগাশিনোর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বিশ্বসাহিত্য হারাল রহস্যকাহিনির এক অনন্য নির্মাতাকে। তবে তাঁর পাঠকদের জন্য রয়েছে শেষ একটি উপহার।

আগামী আগস্ট মাসে প্রকাশিত হওয়ার কথা রয়েছে তাঁর নতুন উপন্যাস ‘ইটার্নাল মেমোরি’। এটি হবে তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত শেষ নতুন বই, যা ইতোমধ্যেই বিশ্বজুড়ে পাঠকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

হিগাশিনোর মৃত্যুর খবর প্রকাশের পর লেখক, প্রকাশক, পাঠক ও চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গভীর শোক প্রকাশ করছেন। অনেকেই তাঁকে আধুনিক রহস্যসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গল্পকার হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

রহস্য, মনস্তত্ত্ব এবং মানবিক আবেগকে একসূত্রে গেঁথে যেভাবে তিনি বিশ্বসাহিত্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছিলেন, তা পাঠকদের মনে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবে। তাঁর লেখা বই, সৃষ্টি করা চরিত্র এবং সেই গল্প থেকে নির্মিত অসংখ্য চলচ্চিত্রই আগামী প্রজন্মের কাছে তাঁকে অমর করে রাখবে।

সন্ধানী বার্তা/এসএ 


সম্পর্কিত খবর