ধর্ম

বেনামাজি বন্ধুকে ‘জাহান্নামি’ বলা যাবে? যা বললেন শায়খ আহমাদুল্লাহ

নামাজ পড়েন না—এমন কোনো বন্ধুকে কি সরাসরি ‘জাহান্নামি’ বলা জায়েজ? কে জান্নাতে যাবেন আর কে জাহান্নামে, তা কি দুনিয়ায় বসে নির্ধারণ করা সম্ভব? এমন প্রশ্নের উত্তরে ইসলামি আলোচক শায়খ আহমাদুল্লাহ গুরুত্ব দিয়েছেন মানুষের ভালো গুণের স্বীকৃতি, সুন্দর আচরণ এবং দাওয়াতের কৌশলের ওপর। তাঁর মতে, কেউ নামাজ নিয়মিত আদায় না করলেও তার সততা, সত্যবাদিতা, সুন্দর ব্যবহার ও পরোপকারের মতো গুণগুলোকে অস্বীকার করা উচিত নয়।

সম্প্রতি একটি ইসলামি আলোচনা অনুষ্ঠানে এক তরুণ নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে এ বিষয়ে পরামর্শ চান। তিনি জানান, ক্যাম্পাসে তাঁর কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু রয়েছেন, যাঁরা নিয়মিত নামাজ আদায় করেন না। তবে মানুষ হিসেবে তাঁরা ভালো। তাঁদের একজন একদিন তাঁকে প্রশ্ন করেন, ‘তুই এত ধর্ম মানিস, তাহলে কি আমি জাহান্নামে যাব?’ বন্ধুর এমন প্রশ্নের জবাবে কীভাবে ইসলামের বক্তব্য তুলে ধরা যায়, তা জানতে চান তিনি।

ভালো গুণের স্বীকৃতি দেওয়ার পরামর্শ
জবাবে শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, কোনো ব্যক্তির মধ্যে ভালো গুণ থাকলে তার স্বীকৃতি দেওয়া উচিত। কেউ নিয়মিত ধর্মীয় অনুশীলন না করলেও তিনি সৎ, সত্যবাদী, সুন্দর আচরণের অধিকারী ও পরোপকারী হতে পারেন। এসব গুণের প্রশংসা করতে কার্পণ্য করা উচিত নয়।

তিনি কোরআনের শিক্ষার প্রসঙ্গ তুলে বলেন, মানুষের মধ্যে সততা ও আমানতদারির মতো গুণ থাকলে তা স্বীকার করতে হবে। কেউ বেনামাজি বা ধর্মীয় অনুশীলনে পিছিয়ে থাকলেও তার ভালো কাজের স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি। কারণ, মানুষের ভালো গুণকে সম্মান করার মধ্য দিয়েই তার সঙ্গে সুন্দর সম্পর্ক বজায় রাখা এবং দ্বীনের পথে আহ্বান জানানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

কে জান্নাতে যাবেন, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না
শায়খ আহমাদুল্লাহর বক্তব্য অনুযায়ী, কেউ নামাজ পড়েন বলেই নিশ্চিতভাবে জান্নাতে যাবেন—এমন নিশ্চয়তা নেই। একইভাবে কোনো ব্যক্তি নামাজ আদায় করেন না বলে তাঁকে নিশ্চিতভাবে জাহান্নামি বলাও উচিত নয়। শেষ পর্যন্ত কে জান্নাতে যাবেন আর কে জাহান্নামে যাবেন, সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আল্লাহর।

তিনি বোঝান, মানুষের জীবনের শেষ পরিণতি সম্পর্কে দুনিয়ায় বসে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না। কেউ দীর্ঘদিন ভালো কাজ করলেও শেষ পর্যন্ত পথভ্রষ্ট হতে পারেন; আবার কেউ পাপের জীবন থেকে ফিরে এসে তওবা করে সৎপথে চলতে পারেন। তাই নিজের ইবাদত নিয়ে আত্মতুষ্টিতে ভোগা কিংবা অন্যের পরিণতি সম্পর্কে চূড়ান্ত মন্তব্য করা সমীচীন নয়।

শুধু নামাজ নয়, মানুষের সঙ্গে আচরণও গুরুত্বপূর্ণ
আলোচনায় শায়খ আহমাদুল্লাহ আরও বলেন, নামাজ-রোজার পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে আচরণ, লেনদেনে সততা এবং নৈতিকতার বিষয়গুলোও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেউ নামাজ আদায় করেও যদি মানুষকে ঠকান, মিথ্যা বলেন, প্রতারণা করেন কিংবা অবৈধ উপার্জনে জড়িত থাকেন, তাহলে শুধু নামাজ আদায় করাকেই জান্নাতের নিশ্চয়তা হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না।

অন্যদিকে, ধর্মীয় অনুশীলনে পিছিয়ে থাকা কোনো ব্যক্তির মধ্যে সততা, ভালো ব্যবহার ও পরোপকারের মতো গুণ থাকলে সেগুলোর প্রশংসা করা উচিত। তবে ভালো মানুষ হওয়ার এসব গুণকে নামাজের বিকল্প হিসেবে দেখারও সুযোগ নেই। বরং ভালো কাজের স্বীকৃতি দিয়ে তাঁকে ধর্মীয় দায়িত্ব পালনে উৎসাহিত করা যেতে পারে।

সম্পর্ক বজায় রেখেই দাওয়াত দেওয়ার আহ্বান
বেনামাজি বন্ধুর সঙ্গে কীভাবে কথা বলা উচিত, সে বিষয়ে শায়খ আহমাদুল্লাহ সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণের ওপর জোর দেন। তাঁর পরামর্শ, বন্ধুকে অপমান বা তিরস্কার না করে সুন্দরভাবে বোঝানো যেতে পারে যে, তার মধ্যে ভালো গুণ রয়েছে; ধর্মীয় অনুশীলনের ক্ষেত্রেও সে আরও এগিয়ে যেতে পারে।

কেউ নামাজ পড়েন না বলে তাঁর সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করা কিংবা সৌজন্য না দেখানোই ইসলামের শিক্ষা—এমন ধারণা থেকেও বিরত থাকা প্রয়োজন। আদর্শের জায়গায় নিজের বিশ্বাস অটুট রেখে আচরণে সৌন্দর্য প্রকাশ করতে হবে। এতে অন্যকে ইসলামের পথে আহ্বান জানানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

শায়খ আহমাদুল্লাহর বক্তব্যের মূল কথা হলো, কারও ধর্মীয় অনুশীলনের ঘাটতি দেখে তার চূড়ান্ত পরিণতি নির্ধারণ না করে ভালো গুণের স্বীকৃতি দেওয়া, নিজের আমল নিয়ে সচেতন থাকা এবং সুন্দর আচরণের মাধ্যমে অন্যকে সৎপথে আহ্বান জানানোই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সন্ধানী বার্তা/এএএন/জেএন


সম্পর্কিত খবর