বয়স ৪৬ পেরিয়েছে। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে একের পর এক চরিত্রে দর্শকের মন জয় করেছেন। কিন্তু ব্যক্তিজীবনে এখনও বিয়ের পিঁড়িতে বসেননি রাইমা সেন। শুধু তাই নয়, নিজেকে এখনও সিঙ্গেল বলেই পরিচয় দেন এই অভিনেত্রী। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিয়ে নিয়ে যেখানে অনেকের চিন্তা বদলে যায়, সেখানে রাইমার ভাবনাটা যেন একেবারেই আলাদা।
বিয়ে করবেন কি না—এই প্রশ্নটি বহু বছর ধরেই শুনে আসছেন রাইমা। কখনো মজার ছলে, কখনো খোলামেলা আড্ডায় সেই প্রশ্নের উত্তরও দিয়েছেন। তবে এবার বিয়ে ও মাতৃত্ব নিয়ে এমন কিছু কথা বলেছেন, যা নতুন করে আলোচনায় এনেছে তাকে।
সম্প্রতি ভারতীয় গণমাধ্যমের এক সাক্ষাৎকারে ব্যক্তিজীবনের নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেন রাইমা। সেখানে বিয়ে, একা থাকা, মা হওয়ার ইচ্ছা এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নিয়ে রাখেন নিজের অবস্থান বেশ স্পষ্টভাবেই।

‘এই বয়সে বিয়ে করার তাগিদ অনুভব করি না’
সাক্ষাৎকারে রাইমাকে মজার ছলে প্রশ্ন করা হয়—টম ক্রুজকে না পাওয়ার কারণেই কি সারাজীবন একা থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন?
হেসে সেই প্রসঙ্গের উত্তর দিতে গিয়ে রাইমা বলেন, “আমার বোনও এটা নিয়ে মজা করে। কলকাতায় তেমন কেউ নেই। আর আমি শহরের বাইরে খুব একটা যাই না। সত্যি কথা বলতে, এই বয়সে দাঁড়িয়ে বিয়ে করার তাগিদটাও অনুভব করি না। অ্যাটাচমেন্ট নিয়েও চিন্তা হয়।”
অর্থাৎ বয়সের কারণে বিয়ে করে ফেলতেই হবে—এমন কোনো চাপ নিজের ওপর রাখছেন না অভিনেত্রী। বরং সম্পর্কের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আবেগ, দায়িত্ব ও দীর্ঘমেয়াদি বন্ধন নিয়েও তিনি যথেষ্ট ভেবেচিন্তেই এগোতে চান।
বিয়ে নিয়ে মায়ের ভাবনাও বদলেছে
রাইমার একা থাকার সিদ্ধান্ত নিয়ে তার মা কী ভাবেন—সাক্ষাৎকারে এমন প্রশ্নও করা হয়। এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে অভিনেত্রী জানান, একসময় তার মা বিয়ে নিয়ে চিন্তা করলেও এখন সেই অবস্থান অনেকটাই বদলে গেছে।
রাইমার ভাষায়, “আগে করতেন, এখন দেশ-দুনিয়ার অবস্থা দেখে উল্টো বিয়ে করতে বারণ করেন। মা বলেন, ‘জোর করে কিছু করো না। পরে কখনো একাকিত্বে ভুগলে অনেকগুলো পোষ্য দত্তক নিও।’”
মায়ের এমন পরামর্শ যে রাইমার সঙ্গে তার পরিবারের সম্পর্কের সহজ ও বন্ধুত্বপূর্ণ দিকটিও তুলে ধরে, তা বলাই যায়। বিয়ে নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার বদলে নিজের মতো করে জীবন বেছে নেওয়ার সুযোগই যেন পাচ্ছেন তিনি।

‘আমি বাচ্চাদের ভীষণ ভালোবাসি’
বিয়ের প্রশ্নের পর স্বাভাবিকভাবেই আসে মাতৃত্বের প্রসঙ্গ। রাইমা কি মা হতে চান? এই প্রশ্নের উত্তরেও চমক রয়েছে।
অভিনেত্রী বলেন, “আমি বাচ্চাদের ভীষণ ভালোবাসি। ভয় লাগে, কী জানি সবটা ম্যানেজ করতে পারব কি না ভেবে দেখিনি। তবে মনের কথা তো বলা যায় না। আজ মনে হচ্ছে না, কাল ইচ্ছে হতেই পারে।”
অর্থাৎ বর্তমানে মা হওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্ত না থাকলেও ভবিষ্যতের সম্ভাবনাটি একেবারে বন্ধ করে দিচ্ছেন না তিনি।
আর সেই কারণেই অনেক আগেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছেন রাইমা।
ভবিষ্যতের কথা ভেবে ‘এগ ফ্রিজ’ করে রেখেছেন
মাতৃত্ব নিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ ভাবনার কথা বলতে গিয়ে রাইমা জানান, অনেক আগেই নিজের ডিম্বাণু সংরক্ষণ বা ‘এগ ফ্রিজ’ করিয়ে রেখেছেন।
তার ভাষায়, “সেই সব সাত-পাঁচ ভেবে আমি অনেক কাল আগেই ডিম্বাণু সংরক্ষণ (এগ ফ্রিজ) করিয়ে রেখেছি।”
তবে এর সঙ্গে নিজের একটি অবস্থানও স্পষ্ট করে দিয়েছেন অভিনেত্রী। রাইমার কথায়, “তবে একটা বিষয় আমার কাছে ভীষণ পরিষ্কার। শুধু মা হওয়ার জন্য বিয়ে নিষ্প্রয়োজন।”
তার এই বক্তব্যই সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে আলোচিত অংশগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। কারণ বিয়ে ও মাতৃত্বকে একই সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবে না দেখে দুটিকে আলাদা বিষয় হিসেবে দেখার কথা বলেছেন তিনি।
‘চল্লিশের পরই জীবন শুরু হয়’
বিয়ে না করার কারণে নিজের জীবন নিয়ে কোনো আফসোস আছে কি না—এমন প্রশ্নের উত্তরও আগেই দিয়েছেন রাইমা।
এক সাক্ষাৎকারে নিজের ৪০-পরবর্তী জীবন সম্পর্কে অভিনেত্রী বলেছিলেন, “দারুণ। আমার মনে হয়, চল্লিশের পরই জীবন শুরু হয়। সত্যি বলতে, নিজেকে এখন অনেক বেশি স্বাধীন লাগে।”
নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যাও দিয়েছিলেন তিনি। রাইমার কথায়, “মাঝে জীবনে অনেক কিছুই দেখা হয়ে গিয়েছে। এখন তো মনে হয়, বিশ বা ত্রিশের কোঠায় জীবন সেভাবে ছন্দে ছিল না। তবে যে শিক্ষাগুলো পেয়েছি, তাতে চল্লিশের পরে জীবন অনেক সহজ হয়েছে। আর সিঙ্গেল হওয়ার সুবাদে মুক্ত পাখির মতো জীবনযাপন করতে পারি।”
তার এই কথায় স্পষ্ট, বয়সকে জীবনের কোনো সীমারেখা হিসেবে দেখতে চান না তিনি। বরং সময়ের সঙ্গে পাওয়া অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নিজের মতো করে জীবন উপভোগ করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।

বিয়ে নিয়ে ভাবনা বদলেছে সময়ের সঙ্গে
রাইমা সেনের বিয়ে নিয়ে ভাবনা অবশ্য সবসময় একই ছিল না। পুরোনো সাক্ষাৎকারগুলোতেও তিনি বিয়ে নিয়ে নানা সময়ে ভিন্ন ভিন্ন কথা বলেছেন। একসময় তিনি জানিয়েছিলেন, বিয়ে করলে এমন একজন সঙ্গী চান, যিনি তার ক্যারিয়ার ও ব্যক্তিত্বকে গ্রহণ করবেন এবং তার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলবেন।
২০২০ সালের এক সাক্ষাৎকারে আবার তিনি বলেছিলেন, শুধু বিয়ে করার জন্য বিয়ে করতে চান না; বরং সত্যিকারের ভালোবাসা এলে তবেই বিষয়টি নিয়ে ভাববেন।
অর্থাৎ সময়ের সঙ্গে তার ভাবনায় পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু একটি বিষয় বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ থেকেছে—নিজের ইচ্ছা ও স্বাধীনতা।
সুচিত্রা সেনের নাতনি, নিজের পরিচয়ে রাইমা
রাইমা সেন শুধু একজন অভিনেত্রী নন, তিনি কিংবদন্তি অভিনেত্রী সুচিত্রা সেনের নাতনি। তার মা মুনমুন সেনও বাংলা চলচ্চিত্রের পরিচিত মুখ। বোন রিয়া সেনও অভিনয় করেছেন বাংলা ও হিন্দি সিনেমায়।
এমন একটি তারকা পরিবার থেকে উঠে এলেও রাইমা নিজের অভিনয়গুণে আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছেন। ১৯৯৯ সালে ‘গডমাদার’ সিনেমার মাধ্যমে অভিনয়জগতে পা রাখেন তিনি। পরবর্তী সময়ে বাংলা ও হিন্দি—দুই ভাষার সিনেমাতেই কাজ করেছেন।
‘হাওয়া বদল’, ‘২২শে শ্রাবণ’, ‘মি আমোর’, ‘বাস্তুশাপ’, ‘দ্বিতীয় পুরুষ’, ‘চিত্রাঙ্গদা’সহ বিভিন্ন সিনেমায় তার অভিনয় দর্শকদের নজর কেড়েছে।

সিঙ্গেল জীবনেই আপাতত স্বচ্ছন্দ
রাইমার জীবনে বিয়ের প্রশ্নটি নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরে সাক্ষাৎকারে, আড্ডায় কিংবা গণমাধ্যমের আলোচনায় বারবার ফিরে এসেছে একই প্রসঙ্গ। কিন্তু ৪৬ বছর বয়সে দাঁড়িয়েও নিজের জীবন নিয়ে তার বক্তব্য বেশ পরিষ্কার—জোর করে কোনো সম্পর্ক বা বিয়েতে যেতে চান না তিনি।
বরং নিজের কাজ, স্বাধীনতা, ভ্রমণ এবং ব্যক্তিগত পছন্দকে গুরুত্ব দিয়েই এগিয়ে যেতে চান।
আর ভবিষ্যতে যদি কখনো মা হওয়ার ইচ্ছা জাগে, সেই সম্ভাবনার দরজাটিও তিনি খোলা রেখেছেন। ডিম্বাণু সংরক্ষণ করে রাখার সিদ্ধান্ত তারই ইঙ্গিত দেয়।
সব মিলিয়ে রাইমা সেনের গল্পটা যেন প্রচলিত ‘বিয়ে করলেই জীবন পূর্ণ’—এই ধারণার বাইরে গিয়ে নিজের মতো করে জীবন বেছে নেওয়ার গল্প। আজ বিয়ের তাগিদ অনুভব করছেন না, আগামীকাল কী হবে তা নিয়েও কোনো চূড়ান্ত ঘোষণা নেই। তার নিজের ভাষাতেই—“আজ মনে হচ্ছে না, কাল ইচ্ছে হতেই পারে।”
আর সেই অনিশ্চয়তাকেই ভয় না পেয়ে নিজের মতো করে বাঁচার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এই অভিনেত্রী।
সন্ধানী বার্তা/জেএন