ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সরকারি বাহিনীর সংঘাত নতুন করে তীব্র হয়েছে। গত এক সপ্তাহে হুতিরা সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন কয়েকটি এলাকায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। এর মধ্যে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে মারিব ও তাইজ—দুই কৌশলগত অঞ্চল।
সৌদি আরব-সমর্থিত ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে। একই সময়ে হুতিদের নিয়ন্ত্রণ বিস্তারের কারণে সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্বার্থ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
মারিব কেন গুরুত্বপূর্ণ
উত্তর ইয়েমেনে হুতিবিরোধী বাহিনীর অন্যতম প্রধান ঘাঁটি মারিব। অঞ্চলটি দেশটির গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাসসম্পদের কেন্দ্র হওয়ায় এর সামরিক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে।
হুতিরা দীর্ঘদিন ধরে মারিব দখলের চেষ্টা করছে। তাদের হাতে অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ চলে গেলে উত্তর ইয়েমেনে সরকারি বাহিনীর অবস্থান আরও দুর্বল হতে পারে। একই সঙ্গে তেল-গ্যাস অবকাঠামোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ পেতে পারে হুতিরা।
ইয়েমেনের রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাদ্দাম আল-হুরাইবি মনে করেন, মারিবের নিয়ন্ত্রণ পাওয়া হুতিদের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক আলোচনায় প্রভাব বাড়াতে পারে। তাঁর মতে, বড় ধরনের সামরিক পরাজয় ছাড়া হুতিরা অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রাখবে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান নিউ আমেরিকার ফেলো অ্যাডাম ব্যারনের মতে, মারিব হুতিদের দখলে গেলে ইয়েমেনের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতিতে তা গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে।
মারিবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর ভৌগোলিক অবস্থান। উত্তরাঞ্চল থেকে শাবওয়া ও আল-মাহরা প্রদেশের দিকে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ স্থলপথ এই অঞ্চলের মধ্য দিয়ে গেছে। ফলে মারিবের নিয়ন্ত্রণ দক্ষিণ ও পূর্ব ইয়েমেনের দিকে সামরিক ও রসদ পরিবহনের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে।
তাইজেও সংঘাত তীব্র
মারিবের পাশাপাশি পশ্চিমাঞ্চলের তাইজে নতুন করে লড়াই শুরু হয়েছে। গত সপ্তাহে হুতিরা তাইজের পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি এলাকা দখল করেছে বলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো জানিয়েছে। সেগুলো পুনর্দখলে সৌদি-সমর্থিত বাহিনী পাল্টা অভিযান চালাচ্ছে।
তাইজের গুরুত্ব মূলত এর অবস্থানের কারণে। অঞ্চলটি হুতিদের নিয়ন্ত্রণাধীন উত্তরাঞ্চল, সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন দক্ষিণাঞ্চল এবং লোহিত সাগর উপকূলের মধ্যবর্তী গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল।
তাইজের নিয়ন্ত্রণ কোনো পক্ষের হাতে থাকলে দক্ষিণের বন্দরনগরী এডেনের সঙ্গে দেশের অন্যান্য অংশের যোগাযোগ ও রসদ সরবরাহে কৌশলগত সুবিধা তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া ইয়েমেনের অন্যতম বড় জনবসতিপূর্ণ অঞ্চল হওয়ায় তাইজের রাজনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে। ২০১৪ সালে হুতিরা রাজধানী সানা দখলের পর তাইজ তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।
বাব আল-মানদেব নিয়ে উদ্বেগ
তাইজের পশ্চিমে লোহিত সাগরের উপকূল ধরে রয়েছে মোখা বন্দর এবং আরও দক্ষিণে বাব আল-মানদেব প্রণালি। সম্প্রতি এসব এলাকার ওপর হুতিদের নিয়ন্ত্রণ বিস্তারের দাবি নতুন করে আন্তর্জাতিক মনোযোগ তৈরি করেছে।
বাব আল-মানদেব লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। বিশ্ব বাণিজ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ঐতিহাসিকভাবে এই জলপথ ব্যবহার করে আসছে। ফলে সেখানে সংঘাত বা জাহাজ চলাচলে বাধা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব পড়তে পারে।
ইয়েমেনি বিশ্লেষক ও লেখক ফুয়াদ মুসেদের মতে, হুতিরা সমুদ্রপথের কাছাকাছি নিজেদের অবস্থান শক্ত করার মাধ্যমে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর ওপর চাপ তৈরির সুযোগ পেতে পারে।
তবে এসব বক্তব্য বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন; হুতিদের নির্দিষ্ট কৌশল বা উদ্দেশ্য সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও তথ্য প্রয়োজন।
বাড়ছে মানবিক সংকট
নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগও বাড়ছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে ইয়েমেনে ৮৫ হাজারের বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে। তাঁদের মধ্যে দুই হাজারের বেশি মানুষ জিবুতির উত্তর উপকূলে আশ্রয় নিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মারিবের মানবিক গুরুত্বও অনেক। ইয়েমেনের দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বাস্তুচ্যুত বহু মানুষ বছরের পর বছর মারিবে আশ্রয় নিয়েছেন।
ফলে মারিব ও তাইজে সামরিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াই যত বাড়ছে, ততই বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর নতুন করে বাস্তুচ্যুতি ও মানবিক সংকটের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে মারিব ও তাইজ—দুই ফ্রন্টেই হুতিদের অগ্রগতি ইয়েমেনের সামরিক ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেবের কাছাকাছি তাদের অবস্থান শক্ত হলে সংঘাতের প্রভাব ইয়েমেনের সীমানা ছাড়িয়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বাণিজ্যপথেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সূত্র: আল-জাজিরা
সন্ধানী বার্তা/এসএ