জাতীয়

সিএস মানচিত্র অনুযায়ী নদ-নদী ও জলাধার পুনরুদ্ধারসহ ১৪ সুপারিশ বাপার

সরকারের কাছে সিএস মানচিত্র অনুযায়ী নদ-নদী ও জলাধার পুনরুদ্ধারসহ ১৪ দফা সুপারিশসংবলিত একটি স্মারকলিপি পেশ করেছে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)।

সোমবার (২৭ জুলাই) বিকেলে সচিবালয়ে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানির কাছে স্মারকলিপিটি পেশ করেন বাপার নেতারা। এ সময় প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদও উপস্থিত ছিলেন। বাপার সভাপতি অধ্যাপক ড. নুর মোহাম্মদ তালুকদার, সহসভাপতি খুশি কবির, মহিদুল হক খান ও অধ্যাপক ড. এম. শহীদুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির, সাংগঠনিক সম্পাদক মিহির বিশ্বাস, যুগ্ম সম্পাদক ড. হালিম দাদ খান, এস এম মিজানুর রহমান এবং খন্দকার আজিজুল হক মনিও উপস্থিত ছিলেন।

এ সময় মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে বাপার নেতাদের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বাপার পক্ষ থেকে দেশের নদ-নদীতে মেগা প্রকল্পের ফলে নদীর আকার-প্রকৃতির পরিবর্তন, স্লুইসগেটের কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা, ফুলজোড় ও করতোয়া নদীর বর্তমান বাস্তব চিত্র, বুড়িগঙ্গা নদীর দখল ও দূষণ, বড়াল নদী ও চলনবিলের মাছ, জলজ প্রাণী ও জীববৈচিত্র্যের সমস্যা, বিল হরিণা ও ভবদহের দুর্ভোগ, নদ-নদীতে বাঁধ বা পোল্ডারের অপ্রয়োজনীয়তা, দেশের হাওরগুলোর সমস্যা এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্প বিষয়ে বক্তব্য তুলে ধরেন বাপার নেতারা।

মন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী বলেন, সরকারের একার পক্ষে কোনোভাবেই পরিবেশ ও নদী রক্ষা করা সম্ভব নয়। তিনি তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও গঙ্গা ব্যারাজ বিষয়ে সরকারের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে বাপার বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনায় বসার আগ্রহ প্রকাশ করেন। এ সময় চলনবিলের পদ্মা-যমুনা ও অভ্যন্তরীণ নদীপথের একমাত্র পতিতমুখ বন্ধ করে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের পরিবর্তে অন্যত্র করার বিষয়ে চিন্তা করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন মন্ত্রী।

মন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করা স্মারকলিপিতে যেসব সুপারিশ করা হয়—

১) নদ-নদীর প্রতি উন্মুক্ত নীতিকে সরকারি নীতি হিসেবে ঘোষণা করবেন; প্লাবনভূমিতে নদ-নদীর আসা-যাওয়ার পথে ইতিমধ্যে সৃষ্ট প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করার জন্য পদক্ষেপ নেবেন; এবং ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের নতুন কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না হয়, তা নিশ্চিত করবেন।

২) উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন প্রকল্পের (সিইআইপি) অধীনে উপকূলের পোল্ডারগুলোর বাঁধ আরও নিশ্ছিদ্র করার পরিবর্তে সেগুলোকে অষ্টমাসী বাঁধে রূপান্তরের নির্দেশ দেবেন, যাতে পোল্ডারের মধ্যে বর্ষাকালে পলিযুক্ত পানি প্রবেশ করতে পারে এবং পলিপতনের মাধ্যমে ভূমির উচ্চতা বৃদ্ধি পায় ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিজনিত নিমজ্জনের ঝুঁকি থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

৩) দেশের অভ্যন্তরে যেসব পোল্ডার নির্মিত হয়েছে, সেগুলোর বাঁধও ক্রমান্বয়ে অষ্টমাসী বাঁধে রূপান্তরের নির্দেশ দেবেন, যাতে বর্ষাকালে নদীর পানি পোল্ডারের ভেতরে প্রবেশ করতে পারে এবং বর্ষা শেষে আবার নদীতে ফিরে যেতে পারে। এর ফলে পোল্ডারের ভেতরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হবে না। এ ধারায় অগ্রসর হয়ে ভবদহসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জলাবদ্ধতা কার্যকরভাবে নিরসন করবেন।

৪) পোল্ডারের সঙ্গে সম্পর্কহীনভাবে দেশের নদ-নদীর ওপর যেসব প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে, যেমন—স্লুইসগেট, ফ্ল্যাপগেট, রেগুলেটর, প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত সংকীর্ণ সেতু ও কালভার্ট—সেগুলো অপসারণ করে নদ-নদীর প্রবাহ বাধাহীন করার নির্দেশ দেবেন।

৫) সিএস মানচিত্র অনুযায়ী দেশের সব নদ-নদী ও জলাধার পুনরুদ্ধার করবেন এবং দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবেন।

৬) গঙ্গা ও যমুনার মধ্যে সংযোগ রক্ষাকারী চলনবিলের প্রধান নদী বড়ালকে অবমুক্ত করার অর্ধসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করতে আশু পদক্ষেপ নেবেন।

৭) বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে যেসব নদী ধ্বংস হয়েছে, যার মধ্যে মহেশখালীর কোহেলিয়া অন্যতম, সেগুলো পুনরুদ্ধারে যথাযথ পদক্ষেপ নেবেন।

৮) নদ-নদী ও জলাশয়কে আবর্জনা ফেলার স্থানে পরিণত করার বর্তমান প্রবণতা রোধ করবেন এবং হবিগঞ্জের সুতাং, ঢাকার বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ, কক্সবাজারের বাঁকখালী, খুলনার ময়ূরসহ দেশের সব নদ-নদীকে দূষণমুক্ত করবেন।

৯) নদীর তীরে বাঁধ নির্মাণের পরিবর্তে নদ-নদীর পাড়ভাঙন রোধ এবং পাড় স্থিতিশীল করাকে সবচেয়ে জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ করণীয় হিসেবে গ্রহণ করবেন। সে লক্ষ্যে জিওব্যাগ পদ্ধতিসহ দেশীয় বিভিন্ন পদ্ধতির ব্যবহারের ভিত্তিতে অগ্রসর হবেন।

১০) জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে শক্তিশালী করবেন এবং নদ-নদীকে দখল ও দূষণের হাত থেকে রক্ষার জন্য কমিশনকে প্রয়োজনীয় নির্বাহী ক্ষমতা দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন।

১১) আন্তর্জাতিক নদ-নদীর ওপর বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা ও অধিকার আদায়ে জোরালো পদক্ষেপ নেবেন এবং গঙ্গা চুক্তির নবায়ন নিয়ে ভারতের সঙ্গে আলোচনার উপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। এ লক্ষ্যে ৫ ও ৬ জুন প্রথম আলোতে প্রকাশিত যথাক্রমে গঙ্গা চুক্তি নবায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ কীভাবে প্রস্তুত হতে পারে এবং সফল চুক্তির লক্ষ্যে বাংলাদেশকে যা করতে হবে শীর্ষক নিবন্ধে উপস্থাপিত বিভিন্ন পরামর্শ বিবেচনায় নিতে পারেন।

১২) তিস্তা নদীর সংকট সমাধানে বিদেশি কোম্পানির প্রস্তুত করা প্রকল্পের পরিবর্তে দেশীয় পারদর্শিতা, দেশীয় প্রযুক্তি, দেশীয় অর্থায়ন ও উন্মুক্ত আলোচনার ভিত্তিতে একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করবেন এবং তিস্তাপাড়ের মানুষ ও দেশবাসীর সহযোগিতা এবং সক্রিয় অংশগ্রহণের ভিত্তিতে তা বাস্তবায়ন করবেন।

১৩) গঙ্গা/পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প নিয়ে তাড়াহুড়ো না করে জাতীয় পর্যায়ে আরও আলোচনার সুযোগ দেবেন এবং বিভিন্ন মহল থেকে দেওয়া পরামর্শ বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। ইতিমধ্যে বর্ষাকালে গঙ্গার পানি হার্ডিঞ্জ সেতুর নিচে ১২ থেকে ১৪ মিটার উচ্চতায় পৌঁছানো সত্ত্বেও কেন তা গড়াই-মধুমতি, বড়াল ও অন্যান্য শাখানদীতে প্রবেশ করছে না, তা অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেবেন। এ ক্ষেত্রে যেসব প্রতিবন্ধকতা বাধা হিসেবে কাজ করছে, সেগুলো অপসারণে পাউবোকে নির্দেশ দেবেন। কয়েক বছর ধরে বর্ষাকালে গঙ্গার পানি শাখানদীগুলোতে নিয়মিতভাবে প্রবাহিত হওয়ার অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হলে প্রস্তাবিত গঙ্গা/পদ্মা ব্যারাজ সম্পর্কে আরও সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করবে।

১৪) উপর্যুক্ত ধারায় আপনার ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের প্রতি বাপার সমর্থন থাকবে এবং বাপা সাধ্যমতো প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদানে প্রস্তুত থাকবে।

সন্ধানী বার্তা/আরডি/এমডিএইচ


সম্পর্কিত খবর