মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে লক্ষ্য করে সরাসরি গুলি চালিয়েছিলেন বিপথগামী সেনা সদস্য মেজর মো.মোজাফফর হোসেন। হত্যাকাণ্ড নিশ্চিত করার পর তিনি চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ২৪ পদাতিক ডিভিশনের তৎকালীন জেনারেল অফিসার কমান্ডিং (জিওসি) মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরকে টেলিফোন করে জানান, ‘দ্য প্রেসিডেন্ট হ্যাজ বিন কিলড’। হত্যাকাণ্ডের পর সেনাবাহিনীর অভিযানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং পরবর্তীতে মঞ্জুর নিহত হন। ১৩ জন সেনা কর্মকর্তার ফাঁসি কার্যকর হয়। ক্যাপ্টেন মোসলেহ উদ্দিন গ্রেপ্তার হয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন।
তখন মেজর মোজাফফর হোসেন ও মেজর এস এম খালেদ পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। এরপর প্রায় দু’ বছর আত্মগোপনে ছিলেন ভারতে। পরবর্তীসময়ে তিনি ছদ্মনাম ব্যবহার করে সীমান্ত অতিক্রম করে বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করতেন। কিন্তু এবার আর এই খুনির শেষ রক্ষা হয়নি। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যায় জড়িত ৪৫ বছর ধরে পলাতক মেজর মো. মোজাফফর হোসেনকে (৭৭) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রাজধানীর বনানী ডিওএইচএস এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) বিকেলে ডিবির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম জানান, মেজর মোজাফফর হোসেন দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে পলাতক ছিলেন। তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া শেষে কোর্ট মার্শাল সম্পন্ন করার জন্য তাকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
- রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে প্রথম শনাক্ত ও সরাসরি গুলি করেন মোজাফফর
- দু’বছর আত্মগোপনে ছিলেন ভারতে
- ছদ্মনাম ব্যবহার করে সীমান্ত অতিক্রম করে বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত
মহান স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের ষষ্ঠ রাষ্ট্রপতি। তিনি ছিলেন সাবেক সেনাপ্রধান এবং বীর উত্তম খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। বগুড়ার গাবতলীর এই কৃতি সন্তান ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। চট্টগ্রাম সফরকালে ১৯৮১ সালের ৩০ মে জেলা সার্কিট হাউজে গভীর রাতে একদল বিপথগামী সেনাসদস্য তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। তিন দিন পর তাঁর মরদেহ ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। লাখ লাখ শোকার্ত মানুষ তার জানাজার নামাজে শরিক হয়। পরে জাতীয় সংসদ ভবন চত্বরে জিয়া উদ্যানে তাকে সমাহিত করা হয়।
- কোর্ট মার্শাল সম্পন্ন করার জন্য তাকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর
মো. শফিকুল ইসলাম
অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্র ও বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও মামলাসংক্রান্ত বিবরণ অনুযায়ী, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যার পর মোজাফফর পালিয়ে যান। তিনিই প্রথম চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে প্রথম সনাক্ত করেন এবং গুলি করেন। তাঁকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল। তিনি ভারতে আত্মগোপনে ছিলেন। একপর্যায়ে তিনি ছদ্মনাম ব্যবহার করে সীমান্ত অতিক্রম করে যাতায়াত করতেন।
জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড নিয়ে ৮ পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের সারমর্ম
জিয়াউর রহমান হত্যা নিয়ে ১৯৯৪ সালের মে মাসে প্রোবনিউজের প্রধান সম্পাদক ইরতিজা নাসিম আলীর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন দৈনিক ভোরের কাগজে ধারাবাহিক আট কিস্তিতে ছাপা হয়েছিল। ওই প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, চট্টগ্রাম সেনানিবাস থেকে ২৯ ও ৩০ মে তারিখের মধ্যবর্তী রাত সাড়ে ৩টায় তিনটি গাড়ি নিয়ে ১৬ জন সেনা কর্মকর্তা রওনা হন। প্রেসিডেন্ট জিয়া তখন সার্কিট হাউসে ঘুমিয়ে। গুলি করতে করতে তাদের একটি দল দোতলায় উঠে যায়। গোলাগুলির শব্দ শুনে বাইরে কী হচ্ছে দরজা ফাঁক করে দেখার চেষ্টা করলেন জিয়া। তখন গর্জে ওঠে আততায়ীর হাতের অস্ত্র। ৯ মিনিটেই অপারেশন শেষ। ভোর সাড়ে ৪টার কিছু পরে মেজর মোজাফফর হোসেন চট্টগ্রাম সেনানিবাসে ২৪ ডিভিশনের কমান্ডার মেজর জেনারেল আবুল মনজুরকে ফোন করে জানালেন, ‘দ্য প্রেসিডেন্ট হ্যাজ বিন কিলড।’ জিয়াউর রহমানের সঙ্গে ওইদিন সার্কিট হাউসে গুলিতে নিহত হয়েছিলেন আরও দুই সেনা কর্মকর্তাু লে. কর্নেল আহসান এবং ক্যাপ্টেন আশরাফুল হাফিজ খান। এরা ছিলেন রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা বাহিনী বা প্রেসিডেন্টস গার্ড রেজিমেন্টের সদস্য।
এমএএএমকে