
বাংলাদেশ তার দীর্ঘ ইতিহাসে বহু গণআন্দোলন এবং গৌরবোজ্জ্বল ছাত্র-জনতার বিপ্লব প্রত্যক্ষ করেছে। ২০২৪ সালের রক্তাক্ত জুলাই-আগস্টে এদেশের ছাত্র সমাজ যে নজিরবিহীন সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিল, তা ছিল মূলত একটি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তীব্র নৈতিক ক্ষোভ এবং মানবিক মর্যাদার লড়াই। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষামন্ত্রীর একটি ঘরোয়া, অনানুষ্ঠানিক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে যেভাবে রাজধানী জুড়ে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হলো, তা যেকোনো সচেতন নাগরিককে ভাবিয়ে তুলতে বাধ্য। ঘটনার গভীরে প্রবেশ করলে এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, এই আন্দোলনের নেপথ্যে আর সাধারণ শিক্ষার্থীদের শুদ্ধ নৈতিক প্রতিবাদ সক্রিয় নেই; বরং এর সুড়ঙ্গ বেয়ে ভেতরে প্রবেশ করেছে পতিত স্বৈরাচারের প্রেতাত্মা এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে অচল করে দেওয়ার এক গভীর রাজনৈতিক ব্ল্যাকমেইল।
সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিও ক্লিপ এই আন্দোলনের আসল রূপ আমাদের সামনে উন্মোচিত করে দিয়েছে। একটি মিছিলে এক তরুণী শিক্ষার্থীকে চিৎকার করে বলতে শোনা গেছে, “আমরা হাসিনাকে ব্যাক চাই। আগের সরকারই ভালো ছিল।”
এই একটি মাত্র বাক্যই প্রমাণ করে যে, এই তথাকথিত আন্দোলনের গভীর ভেতর থেকে কোন পক্ষের এজেন্ডা বাস্তবায়িত হচ্ছে। এই মেয়েটি কাগজে-কলমে শিক্ষার্থী হতে পারে, কিন্তু রাজপথে দাঁড়িয়ে তার এই চিৎকার কোনো নৈতিক অধিকারের দাবি নয়; বরং এটি হলো সাড়ে ১৫ বছর ধরে এদেশের বুকের ওপর জেঁকে বসা এক খুনি, রক্তপিপাসু ও পতিত ফ্যাসিবাদের পুনর্বাসনের এক নগ্ন রাজনৈতিক প্রচেষ্টা। জনমনে অসন্তোষ তৈরি করে একটি গণতান্ত্রিক সরকারকে বিপদে ফেলাই এই অনুপ্রবেশকারীদের মূল লক্ষ্য। অন্যদিকে, আরেকজন শিক্ষার্থীকে বলতে শোনা যায়, “হাসিনাকে পালাতে হয়েছে, শিক্ষামন্ত্রীকেও পালাতে হবে।”
এই তুলনাটি শুধু হাস্যকরই নয়, বরং চরম কাণ্ডজ্ঞানহীন। শেখ হাসিনা বিগত দেড় দশকে এদেশের হাজার হাজার মানুষকে গুম করেছে, আয়নাঘর বানিয়েছে, রাজপথে শত শত তরুণের বুকে গুলি চালিয়েছে, গণতন্ত্রকে নির্বাসনে পাঠিয়েছে এবং দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাত লুটে নিয়ে লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে। একটি আস্ত দেশকে যিনি কার্যত কারাগারে পরিণত করেছিলেন, তার সেই ভয়াবহ অপরাধের সাথে বর্তমান শিক্ষামন্ত্রীর একটি অনানুষ্ঠানিক বক্তব্যের তুলনা করা কতটা যুক্তিযুক্ত?
প্রিয় পাঠকআসুন খতিয়ে দেখা যাক শিক্ষামন্ত্রীর সেই বহুল আলোচিত মন্তব্যটি আসলে কী ছিল। তিনি তার এক পরিচিত পরিমণ্ডলে ঘরোয়া আলাপে বলেছিলেন: “এরা তো ফার্মের মুরগি… আমার মেয়েও তো আছে না, সে-ও তো ফার্মের মুরগির মতো। সামান্য বৃষ্টিতে ভিজলেই তো জ্বর চলে আসে।”
আমাদের বাঙালি পরিবারগুলোতে, মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত সমাজব্যবস্থায় বাবা-মা বা অভিভাবকরা অতি আদরে বেড়ে ওঠা আজকের প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের শারীরিক সহনশীলতা বোঝাতে প্রায়শই এ ধরনের রসাত্মক ও ঘরোয়া শব্দ ব্যবহার করে থাকেন। এটি একটি অত্যন্ত সাধারণ ও স্বাভাবিক পারিবারিক অভিব্যক্তি। হ্যাঁ, বিষয়টি তখনই ঘোর আপত্তিজনক এবং নিন্দনীয় হতো যদি শিক্ষামন্ত্রী কোনো আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে, জাতীয় সংসদে বা কোনো দাপ্তরিক প্রজ্ঞাপনে শিক্ষার্থীদের অবমাননা করে এই পরিভাষা ব্যবহার করতেন। কিন্তু একটি ঘরোয়া ব্যক্তিগত টেলিফোন আলাপে অনানুষ্ঠানিক কথাকে সুকৌশলে ধারণ করে, সেটিকে জনসমক্ষে এনে যারা তিলকে তাল বানালো—তাদের মোটিভ বা উদ্দেশ্য যে মোটেও সৎ ছিল না, তা আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট। এখানে আরেকটি অপ্রিয় সত্য হলো, নকলবাজ শিক্ষার্থীরা বর্তমান নকলবিরোধী মন্ত্রীকে সহজে গ্রহণ করতে চাইবে না এটাই স্বাভাবিক।
তাছাড়া, শিক্ষামন্ত্রী আহসানুল হক মিলনের পূর্বতন ট্র্যাক রেকর্ড এদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারে অনন্য। বিগত বিএনপি সরকারের আমলে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি যেভাবে শিক্ষাঙ্গন থেকে নকল প্রথা ও সন্ত্রাস দূর করেছিলেন, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বৈপ্লবিক পদক্ষেপ ছিল। বর্তমান সরকারে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেও তিনি শিক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্নীতিমুক্ত ও স্বচ্ছ করার জন্য নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। বহু বছর ধরে যারা শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষা বোর্ড এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির অভয়ারণ্য গড়ে তুলেছিল, যারা অনিয়মে অভ্যস্ত ছিল—বর্তমান মন্ত্রীর কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপে তাদের পায়ের তলার মাটি সরে গেছে। আর ঠিক এই সুযোগটিই দুর্নীতিগ্রস্ত চক্রটি লুফে নিয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখা দরকার। তাদের একটি অংশ হয়তো পর্দার আড়াল থেকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ইন্ধন দিচ্ছে এবং অর্থায়ন করছে, যাতে এই সরকারের শিক্ষামন্ত্রীকে বিতর্কিত করে নিজেদের আখের গোছানো যায় এবং সংস্কার প্রক্রিয়া নস্যাৎ করা যায়।
শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক প্রতিবাদের একটা গণতান্ত্রিক অধিকার অবশ্যই সংবিধানে রয়েছে। কিন্তু সেই প্রতিবাদের নামে পরীক্ষার হল থেকে বের হয়েই রাজপথ অবরোধ করা, অ্যাম্বুলেন্স আটকে দেওয়া, অফিসগামী সাধারণ মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দুর্ভোগে ফেলা এবং জনজীবনকে স্থবির করে দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এই তথাকথিত বিতর্কের পর শিক্ষামন্ত্রী স্বয়ং দেশের পবিত্র জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে তার বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং বিষয়টির একটি সম্মানজনক ও বিনীত পরিসমাপ্তি টেনেছেন। এরপরও যারা “লংমার্চের” মতো চরম কর্মসূচি ঘোষণা করে, তাদের উদ্দেশ্য খুব পরিষ্কার—তারা সংকটের সমাধান চায় না, তারা চায় বিশৃঙ্খলা।
বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দা সূত্র এবং গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে এটি নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, এই আন্দোলনের সামনের সারিতে থাকা অনেকেই আসলে কোনো নিয়মিত শিক্ষার্থীই নয়। এরা বহিরাগত এবং পতিত স্বৈরাচারের বেতনভুক্ত ক্যাডার, যাদের কাজই হলো পরিস্থিতিকে ঘোলাটে করে একটি অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করা।
এই পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও দৃঢ় কৌশল অবলম্বন করতে হবে। শিক্ষার্থীদের প্রতি সংবেদনশীলতা দেখানোর অর্থ এই নয় যে, আন্দোলনের নামে রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা নষ্ট করার লাইসেন্স দেওয়া হবে। এখনই কিছু পদক্ষেপ নেয়া জরুরি বলে আমি মনে করি:
১.অবিলম্বে গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে আন্দোলনের নামে অনুপ্রবেশকারী পতিত ফ্যাসিবাদের দোসর এবং রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চাওয়া চক্রটিকে আলাদা করতে হবে।
২.যারা সাধারণ মানুষের চলাচলের পথ রুদ্ধ করে অরাজকতা সৃষ্টি করছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো অবস্থাতেই রাষ্ট্রকে জিম্মি করতে দেওয়া যাবে না।
৩.সাধারণ শিক্ষার্থীদের বুঝতে হবে যে, তাদের কাঁধে বন্দুক রেখে কারা রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করার ছক কষছে।
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশ আজ এক নতুন ভোরের সন্ধানে এগোচ্ছে। লাখো শহীদের রক্ত এবং ছাত্র-জনতার ত্যাগ বৃথা যেতে দেওয়া যাবে না। “ফার্মের মুরগি” বিতর্কের আড়ালে যে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ও প্রশাসনিক নাশকতা চলছে, দেশপ্রেমিক জনগণ তা ধরে ফেলেছে। ক্ষোভ প্রকাশের অনেক গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ পথ খোলা রয়েছে; কিন্তু সেই পথকে পরিহার করে যারা পতিত স্বৈরাচারের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে রাজপথে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে, তাদের কঠোর হস্তে দমন করার কোনো বিকল্প নেই।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।






