
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে আজ বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) ও আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি অফিসসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে সরকার। নির্বাচনের ছুটি পেয়ে দীর্ঘদিনের চেনা ব্যস্ততা, যানজট ও কোলাহল হঠাৎ করেই অনেকটাই নিস্তব্ধ মনে হচ্ছে। ভোট দেওয়ার উদ্দেশে গ্রামে নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় ছুটে যাচ্ছেন রাজধানীতে বসবাসরত লাখো ভোটার। রাজধানীর মহাখালী, গাবতলীসহ বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ডসহ কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন ঘুরে দেখা গেলো ঈদের মতো উৎসবমুখর পরিবেশ। অবশ্য এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে রাজধানীর জনজীবনে। ঢাকা এখন আগের তুলনায় অনেকটাই ফাঁকা।
মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) ভোর থেকেই কমলাপুর স্টেশনে দেখা যায় যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড়। ট্রেন ধরতে আসা মানুষজনের চোখেমুখে ছিল আনন্দ ও প্রত্যাশার ছাপ। বন্ধু-বান্ধব ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে হাসি-ঠাট্টা আর হই-হুল্লোড় করে বাড়ি ফিরছেন তারা। অনেকের কাছে এই যাত্রা যেন ঈদে বাড়ি ফেরার মতো।
বাসের টিকিট না পাওয়ায় অধিকাংশ যাত্রী ট্রেন যাত্রা বেছে নিয়েছেন। তবে ট্রেনে আসন সংকট থাকায় অনেক যাত্রী দাঁড়িয়ে কিংবা ছাদে উঠে গন্তব্যে রওয়ানা হচ্ছেন। অতিরিক্ত যাত্রীর চাপে হিমশিম খাচ্ছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। স্টেশনে দেখা গেছে, বেশ কয়েকটি ট্রেন আসন পূর্ণ থাকার পরও অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে ছাড়ছে। অনেকে ভেতরে জায়গা না পেয়ে ট্রেনের ছাদে উঠছেন। এতে ঝুঁকি থাকলেও ভোটের টানে বাড়ি ফেরার আগ্রহই বেশি বলে জানান যাত্রীরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলওয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, আমরা যাত্রীদের ছাদে উঠতে নিষেধ করছি। কিন্তু অতিরিক্ত চাপের কারণে সবাইকে নামানো সম্ভব হচ্ছে না। অনেকেই ভোটের কথা বলে ঝুঁকি নিয়েই যাত্রা করছেন। মানবিক দিক বিবেচনায় আমাদেরও কিছুটা ছাড় দিতে হচ্ছে।
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে ভোট দিতে যাচ্ছেন আরিফা দম্পতি। রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে তাদের একটি ফার্মেসি রয়েছে। আরিফা বলেন, দীর্ঘদিন পর এমন উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন হচ্ছে। দোকানের বেচাকেনাও কম, তাই গ্রামে যাচ্ছি। এবার প্রথমবার ভোট দেবো, এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। কমলাপুরে এসে দেখি আমার মতো শত শত মানুষ ভোট দিতে যাচ্ছে, ঈদের মতো লাগছে।
কুষ্টিয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছেন শহিদুল ইসলাম ও তার তিন বন্ধু। তিনি বলেন, এবারের নির্বাচন শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন। আমরা সবাই প্রথমবার ভোট দিতে যাচ্ছি। তরুণ প্রজন্মের জন্য এটা বড় সুযোগ।
খুলনায় যাচ্ছেন বিথীকা মজুমদার। স্বামী-সন্তান নিয়ে ভোট দিতে বাড়ি ফিরছেন তিনি। বিথীকা বলেন, শুনেছি প্রতিটি কেন্দ্রে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও বিজিবি থাকবে। এতে ভোট সুষ্ঠু হবে বলে আশা করছি। আগে নানা কারণে ভোট দিতে পারিনি। এবার আর সুযোগ ছাড়তে চাই না। তিনি আরও জানান, ভোট দিয়ে ১৩ ফেব্রুয়ারি আবার ঢাকায় ফিরে আসবেন।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, নির্বাচন উপলক্ষে যাত্রীদের চাপ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কয়েকগুণ বেড়েছে। অতিরিক্ত কোচ সংযোজন ও বিশেষ ব্যবস্থার চেষ্টা করা হলেও ভিড় সামাল দিতে বেগ পেতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে ভোটের টানে গ্রামে ফেরা মানুষের ঢল রাজধানীতে তৈরি করেছে এক ভিন্ন আবহ। রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও ভোটাধিকার প্রয়োগের আগ্রহ ও উৎসাহে মুখর হয়ে উঠেছে কমলাপুরসহ দেশের বিভিন্ন টার্মিনাল। গত কয়েকদিনে দূরপাল্লার পরিবহনে নিজ নিজ এলাকায় যাওয়ার চাপ দেখা যায়। টার্মিনালগুলোতে ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। সদরঘাট, কমলাপুর রেলস্টেশন, গাবতলী ও সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ঢাকা ছেড়েছেন।
ভোটারদের ঢাকা ছাড়ার সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়েছে রাজধানীর সড়কে। যেখানে প্রতিদিন যানজট ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী, সেখানে এখন যান চলাচল তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়গুলোতে গাড়ির চাপ কমে যাওয়ায় নগরবাসীরা কিছুটা স্বস্তিতে চলাচল করছেন। রাজধানীতে অবস্থানকারী অনেক নগরবাসী বলছেন, নির্বাচন এলেই ঢাকা যেন অন্য রূপ নেয়। যানজট কম, শব্দদূষণ কম, চলাচলে স্বস্তি-এই চিত্র সাময়িক হলেও অনেকের কাছে স্বস্তিদায়ক।
সন্ধানী বার্তা/এমএএইচ/এএইচ






